ইরানকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়তে থাকায় ভারত ও সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) প্রতিরক্ষা, জ্বালানি ও জাহাজ পরিবহণসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আবুধাবি সফরের সময় এই চুক্তিগুলো সম্পন্ন হয়।
শুক্রবার (১৫ মে) আবুধাবিতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বৈঠকে দুই দেশ কৌশলগত সম্পর্ক আরও গভীর করার ওপর জোর দেয়।
নতুন প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্ব চুক্তিতে সামুদ্রিক নিরাপত্তা, সাইবার প্রতিরক্ষা, নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থা, তথ্য আদান-প্রদান, সামরিক প্রশিক্ষণ ও যৌথ মহড়ার মতো বিষয়গুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এছাড়া উন্নত প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও দুই দেশ একমত হয়েছে।
চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল জ্বালানি নিরাপত্তা। এতে বলা হয়েছে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ এলাকায় সংরক্ষিত অপরিশোধিত তেলের একটি অংশ ভারতের কৌশলগত পেট্রোলিয়াম মজুদের অংশ হিসেবে বিবেচিত হবে। পাশাপাশি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ নিয়েও সমঝোতা হয়েছে।
ইরানকে কেন্দ্র করে যখন পুরো অঞ্চলে নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়ছে, তখন এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হলো। সংযুক্ত আরব আমিরাত অভিযোগ করেছে, তাদের পূর্ব উপকূলীয় এলাকা ফুজাইরাহ ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। এতে একটি তেল শোধনাগারে আগুন লাগে এবং তিন ভারতীয় শ্রমিক আহত হন।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে এই হামলার নিন্দা জানান। বৈঠকেও তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাতকে লক্ষ্য করে হামলার তীব্র সমালোচনা করেছেন বলে জানান।
বর্তমানে সংযুক্ত আরব আমিরাতে প্রায় ৪৩ লাখ ভারতীয় বসবাস ও কাজ করছেন। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি ভারতের জন্য শুধু কূটনৈতিক নয়, মানবিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই নতুন চুক্তি শুধু দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার কৌশলগত প্রচেষ্টার অংশ।
‘অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর’ করার প্রতিশ্রুতি
সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে জানান, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠকে জ্বালানি, প্রযুক্তি এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতে সহযোগিতা আরও বাড়ানোর উপায় নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
তিনি বলেন, দুই দেশই পারস্পরিক সহযোগিতাকে নতুন গতি দিতে চায় এবং বিশেষ করে কৌশলগত খাতগুলোতে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার বিষয়ে একমত হয়েছে।
নরেন্দ্র মোদিও জানিয়েছেন, প্রতিরক্ষা ও জ্বালানি চুক্তির পাশাপাশি সংযুক্ত আরব আমিরাত ভারতের সঙ্গে ‘অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর’ করতে আগ্রহী। তার মতে, ইউএই ভারতে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত নতুন বিনিয়োগ করতে পারে।
এদিকে ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান মার্কিন-ইসরায়েল সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালীর অব্যাহত অস্থিরতা ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তার ওপর বড় চাপ তৈরি করেছে।
বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল আমদানিকারক দেশ ভারত তার মোট তেলের প্রায় ৯০ শতাংশ বিদেশ থেকে আমদানি করে। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেক তেল হরমুজ প্রণালী হয়ে আসে। ফলে ওই অঞ্চলে উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ায় ভারত সরাসরি জ্বালানি সংকটের প্রভাব অনুভব করছে।
পরিস্থিতির কারণে সম্প্রতি ভারত সরকার জ্বালানির দাম প্রায় ৩ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াতে বাধ্য হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে ভারতের অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারের ওপর আরও চাপ তৈরি হতে পারে।
/ইউএমএইচ