ঐতিহাসিক নাকবা : ৭৭ বছরের শরণার্থী জীবনে নতুন ‘ধ্বংসযজ্ঞের’ মুখে ফিলিস্তিন

মারিয়া হাসিবা

আন্তর্জাতিক

ফিলিস্তিনের ইতিহাসে ‘নাকবা’ কেবল অতীত কোনো ঘটনা নয়— বরং এমন এক দীর্ঘস্থায়ী বাস্তবতা, যেন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নতুন রূপে বারবার

2026-05-15T21:38:58+00:00
2026-05-15T21:39:59+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
আন্তর্জাতিক
ঐতিহাসিক নাকবা : ৭৭ বছরের শরণার্থী জীবনে নতুন ‘ধ্বংসযজ্ঞের’ মুখে ফিলিস্তিন
মারিয়া হাসিবা
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৫ মে, ২০২৬, ৯:৩৮ পিএম  আপডেট: ১৫.০৫.২০২৬ ৯:৩৯ পিএম
ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সময় ফিলিস্তিনিদের জীবনে যে বিপর্যয় নেমে আসে, তাকেই মূলত নাকবা বলা হয়। গ্রাফিক : সময়ের আলো
ফিলিস্তিনের ইতিহাসে ‘নাকবা’ কেবল অতীত কোনো ঘটনা নয়— বরং এমন এক দীর্ঘস্থায়ী বাস্তবতা, যেন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নতুন রূপে বারবার ফিরে আসছে। ১৯৪৮ সালের সেই ভয়াবহ বিপর্যয় আজও গাজাবাসীর জীবনে গেঁথে আছে। এরপর নতুন করে ২০২৩ সালের গাজায় যুদ্ধ, ফিলিস্তিনিদের জীবনে বাস্তুচ্যুতি, ধ্বংস ও বেঁচে থাকার সংগ্রাম যেন এক অবিরাম অধ্যায়ের সূচনা করেছে। ১৫ মে ঐতিহাসিক নাকবা দিবস পালনের সময় প্রশ্নটি আরও তীব্র হয়ে ওঠে— নাকবা কি সত্যিই শেষ হয়েছে, নাকি এটি আবারও নতুন করে ঘটছে? 

পুরাতন নাকবা : ১৯৪৮ সালের জাতিগত উচ্ছেদ 

১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সময় ফিলিস্তিনিদের জীবনে যে বিপর্যয় নেমে আসে, তাকেই মূলত নাকবা বলা হয়। এই সময় ৭ লক্ষাধিক ফিলিস্তিনিকে তাদের নিজ ভূমি থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করা হয়। শত শত গ্রাম ও শহর জনশূন্য করে দেওয়া হয়। অনেক জায়গায় ভয়, সহিংসতা ও সামরিক অভিযান চালিয়ে মানুষকে পালাতে বাধ্য করা হয়েছে।

এই ঘটনার পেছনে ১৯৪৭ সালে জাতিসংঘের ১৮১ নম্বর বিভাজন পরিকল্পনা একটি বড় ভূমিকা রাখে। পরিকল্পনাটি ফিলিস্তিনকে আরব ও ইহুদি রাষ্ট্রে ভাগ করার প্রস্তাব দেয়, যা ফিলিস্তিনি জনগণ ও আরব দেশগুলো প্রত্যাখ্যান করে। এরপর পরিস্থিতি দ্রুত সহিংসতায় রূপ নেয়।

১৯৪৮ সালের শুরুর দিকে জায়নবাদী আধাসামরিক সংগঠনগুলো, বিশেষ করে হাগানাহ, ‘প্ল্যান ডালেত’ নামে একটি কৌশল গ্রহণ করে। অনেক গবেষকের মতে, সে কৌশলে ফিলিস্তিনি জনগণকে এলাকা থেকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। এই সময় দেইর ইয়াসিনসহ বহু গ্রামে গণহত্যা সংঘটিত হয়, যা পুরো ফিলিস্তিনে ভয় ও আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়।

ফলে, ফিলিস্তিনিদের একটি বড় অংশ শরণার্থী হয়ে আশপাশে দেশগুলোতে আশ্রয় নেয়। এই ঘটনাই তাদের ইতিহাস, পরিচয় এবং রাজনৈতিক দাবির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়— বিশেষ করে নিজ ঘরে ‘ফিরে যাওয়ার অধিকার’ প্রশ্নে তারা আন্দোলন শুরু করে। 

১৯৪৮ সালের পর ফিলিস্তিন প্রশ্ন কীভাবে বিকশিত হয়েছে  

১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর ফিলিস্তিন সমস্যার শুরু হয়, যখন লাখ লাখ ফিলিস্তিনি তাদের নিজ ভূমি ও ঘরবাড়ি হারিয়ে শরণার্থী হয়ে বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। এরপর ফিলিস্তিন রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে ভেঙে পড়ে এবং দীর্ঘমেয়াদি সংকট তৈরি হয়। এই সময় থেকে ‘ফিলিস্তিন’ প্রশ্ন ধাপে ধাপে বিভিন্ন রূপে বিকশিত হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু অমীমাংসিত ইস্যু হিসেবে থেকে গেছে।  

প্রথম পর্যায় (১৯৪৮–১৯৬৭) ছিল মূলত শরণার্থীদের জীবনসংগ্রামের সময়। এই সময় ফিলিস্তিনিরা নিজেদের দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় জর্ডান, লেবানন, সিরিয়া এবং অন্যান্য আরব দেশে আশ্রয় নেয়। তাদের প্রধান লক্ষ ছিল নিজেদের ঘরে ফিরে যাওয়া এবং হারানো ভূমির অধিকার পুনরুদ্ধার করা। তবে এই সময়ে কোনো শক্তিশালী রাজনৈতিক সংগঠন না থাকায় তাদের আন্দোলন ছিল বিচ্ছিন্ন। 

১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের পর পরিস্থিতি আরও পরিবর্তিত হয়। এই সময় (১৯৬৭–১৯৭২) ফিলিস্তিনিরা বুঝতে পারে যে আরব রাষ্ট্রগুলোর ওপর নির্ভর করে তাদের সমস্যার সমাধান হবে না। ফলে তারা নিজেদের রাজনৈতিক ও সামরিকভাবে সংগঠিত করে ‘ফিলিস্তিন মুক্তি সংস্থা’ (পিএলও) গঠন করে। এই পর্যায়ে তাদের লক্ষ ছিল স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং ইসরায়েলি দখলের বিরুদ্ধে সংগ্রাম। 

পরবর্তী পর্যায়ে (১৯৭৩–১৯৮৭) ফিলিস্তিনি আন্দোলন ধীরে ধীরে রাজনৈতিকভাবে আরও বাস্তববাদী হয়ে ওঠে। এই সময় আন্তর্জাতিক মহলে ‘দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান’ ধারণা গুরুত্ব পেতে শুরু করে, যেখানে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন আলাদা দুটি রাষ্ট্র হিসেবে থাকার কথা বলা হয়। তবে একই সময়ে ইসরায়েলি দখল ও সংঘাত অব্যাহত থাকে। এবং ১৯৮৭ সালে প্রথম ইন্তিফাদা বা গণঅভ্যুত্থান শুরু হয়, যা ছিল পশ্চিম তীর ও গাজার ফিলিস্তিনিদের ব্যাপক জনআন্দোলন। 

এরপর (১৯৮৮–১৯৯৩) শান্তি প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় শুরু হয়, যার ফলস্বরূপ ‘অসলো চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির মাধ্যমে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের আশা তৈরি হয় এবং ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সমঝোতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টাও চলে। তবে বাস্তবে এই চুক্তি দীর্ঘমেয়াদে প্রত্যাশিত সমাধান দিতে ব্যর্থ হয় এবং উভয়পক্ষের মধ্যে অবিশ্বাস বজায় থাকে।

১৯৯৪ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ গঠিত হয়, যা পশ্চিম তীর ও গাজার কিছু অংশে সীমিত স্বশাসন পায়। তবে এই কর্তৃপক্ষ পূর্ণস্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে কাজ করতে পারেনি, কারণ নিরাপত্তা ও ভূখণ্ডের অনেক অংশ ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে থেকে যায়। ফলে ফিলিস্তিনিদের জাতীয় আকাঙ্ক্ষা আংশিকভাবে পূরণ হলেও বাস্তব স্বাধীনতা অর্জিত হয়নি।

২০০০ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত সময়কে অনেক বিশ্লেষক স্থবিরতার যুগ হিসেবে বর্ণনা করেন। এ সময় শান্তি আলোচনা বারবার ব্যর্থ হয়, ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ বাড়ে এবং দখলদারিত্ব আরও গভীর হয়। ফলে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের সম্ভাবনা দুর্বল হয়ে পড়ে, একইসঙ্গে রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। পাশাপাশি ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক বিভাজনও বেড়ে যায়, যা তাদের অবস্থানকে আরও দুর্বল করে।  

শান্তি প্রক্রিয়া ব্যর্থ হওয়ার পর অনেক ফিলিস্তিনি ও বিশ্লেষক মনে করেন যে, পুরনো অসলো-ভিত্তিক সমাধান আর কার্যকর নয়। বরং এটি সমস্যাকে সমাধান না করে আরও দীর্ঘায়িত করেছে। তাই এখন কিছু মানুষ আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার আন্দোলন, বয়কট এবং বৈশ্বিক চাপের মাধ্যমে অধিকার আদায়ের পক্ষে বেশি জোর দিচ্ছেন।

বর্তমানে ফিলিস্তিন–ইসরায়েল সংঘাতের প্রধান অমীমাংসিত বিষয়গুলো হলো জেরুজালেমের ভবিষ্যৎ, সীমান্ত নির্ধারণ, শরণার্থীদের প্রত্যাবর্তনের অধিকার, ইসরায়েলি বসতি, পানি সম্পদ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা। এ বিষয়গুলোই দীর্ঘদিন ধরে আলোচনার কেন্দ্রে থাকলেও এখনও কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি। একই সঙ্গে আরব দেশগুলোর আগের তুলনায় রাজনৈতিক সমর্থন কমে যাওয়ায় ফিলিস্তিন প্রশ্ন আরও জটিল এবং অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। 


কেমন ছিল নাকবার দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি 

নাকবা বিশ্বের দীর্ঘতম অমীমাংসিত শরণার্থী সংকটের জন্ম দিয়েছে। বর্তমানে ৬০ লক্ষাধিক ফিলিস্তিনি শরণার্থী রয়েছে। এদের বেশিরভাগই জর্ডান, লেবানন এবং সিরিয়াসহ আশপাশের দেশে বসবাস করে। কিছু ক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্যে ফিলিস্তিনি শরণার্থীরা যুদ্ধ এবং আশ্রয়দানকারী দেশগুলোর ভেতর আরও বাস্তুচ্যুতির শিকার হয়েছে।

নাকবার ফলে ভূখণ্ড হারানোর বিভীষিকা আজও ফিলিস্তিনিদের দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলছে। অনেক মূল্যবান সম্পদ এখন ইসরায়েল নিয়ন্ত্রিত ভূমিতে অবস্থিত, ফলে ফিলিস্তিনিরা সেগুলো ব্যবহার করতে পারে না এবং তাদের অর্থনীতি সম্ভাব্যভাবে উন্নত করার সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন।  

আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, অবৈধ বলে বিবেচিত ইসরায়েলি দখলদারিত্ব ফিলিস্তিনিদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলে। এটি তাদের মৌলিক মানবাধিকার ক্ষুণ্ণ, মর্যাদা নষ্ট এবং দরিদ্র্যতাকে স্থায়ী করেছে। এর ফলে ফিলিস্তিনিদের চলাচল, বাণিজ্য, পানি, সেবা, কৃষিজমি, বাজার এবং ধর্মীয় স্থানে প্রবেশাধিকার সীমিত হয়ে যায়। এমনকি গাজা, পূর্ব জেরুজালেম এবং পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনিরা একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, পরিবার ও বন্ধুরা আলাদা হয়ে যায়।

গাজা ২০০৭ সাল থেকে ইসরায়েলি অবরোধের মধ্যে রয়েছে। এই অবরোধ গাজা উপত্যকায় পণ্য ও মানুষের চলাচলকে সীমিত করেছে। অর্থনীতি ও মানুষের ভবিষ্যতকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। একইসঙ্গে, মানবিক ত্রাণ-সহায়তা কার্যক্রম ব্যাহত করেছে। বহু বছর ধরে হাজারো প্রয়োজনীয় পণ্যের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে, কারণ ইসরায়েল এগুলোকে ‘দ্বৈত ব্যবহারযোগ্য’ হিসেবে বিবেচনা করে। অর্থাৎ যেগুলো বেসামরিক ও সামরিক উভয় কাজে ব্যবহৃত হতে পারে। বাস্তবে এর মধ্যে মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় প্রায় সবকিছুই থাকতে পারে। যেমন- জ্বালানি, পানির ফিল্টার, সোলার পাম্প এবং অস্ত্রোপচারের কাঁচি পর্যন্ত প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়েছে। 

২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইসরায়েল অবরোধ আরও কঠোর করেছে, খাদ্য, ওষুধ, জ্বালানি এবং অন্যান্য জরুরি পণ্যের প্রবেশ আরও সীমিত করেছে। ২০২৫ সালের নভেম্বরের যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর কিছু সাহায্য ও বাণিজ্যিক পণ্য প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছে, তবে তা এখনও প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। 

নতুন নাকবা : ২০২৩ সালের গাজা যুদ্ধ ও ধ্বংসযজ্ঞ

২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় যে যুদ্ধ শুরু হয়, অনেক বিশ্লেষক ও প্রত্যক্ষদর্শীর মতে তা ফিলিস্তিনিদের জন্য ‘নতুন নাকবা’ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। এই যুদ্ধকে কেন্দ্র করে গাজায় ব্যাপক বিমান হামলা, স্থল অভিযান এবং অবকাঠামো ধ্বংসের ঘটনা ঘটে।

এই সময় হাজার হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হন এবং লাখ লাখ মানুষ আবারও বাস্তুচ্যুত হন। পুরো পরিবার একসঙ্গে ধ্বংস হয়ে যাওয়া, হাসপাতাল ও স্কুল ধ্বংস, এবং মৌলিক জীবনযাত্রার সংকট; পরিস্থিতিকে ভয়াবহ করে তুলেছে। অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থা এই পরিস্থিতিকে মানবিক বিপর্যয় হিসেবে বর্ণনা করেছে, কেউ কেউ এটিকে গণহত্যা হিসেবেও আখ্যা দিয়েছেন।  

এই যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ইসরায়েলের কিছু বক্তব্যে ফিলিস্তিনিদের স্থানান্তরের কথা বলা হয়, যা অনেকের কাছে ১৯৪৮ সালের নাকবার স্মৃতি ফিরিয়ে আনে। গাজার মানুষদের বারবার দক্ষিণে সরে যেতে বাধ্য করা, খাদ্য ও পানির সংকট এবং অবরোধ পরিস্থিতি; সব মিলিয়ে অনেকেই মনে করেন— ইতিহাস যেন আবারও নিজেকে পুনরাবৃত্তি করছে।  

বেঁচে থাকা মানুষের গল্প : হারানো ইতিহাস, টিকে থাকার লড়াই

নাকবার বাস্তবতা শুধু ইতিহাসে সীমাবদ্ধ নয়— এটি গাজায় ও বিভিন্ন দেশে শরণার্থী হয়ে বেঁচে থাকা প্রতিটি মানুষের স্মৃতিতে গভীরভাবে উপস্থিত।

মিডল ইস্ট আইয়ের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ফাতেমা ওবায়েদ নামে গাজার এক বৃদ্ধার কথা। যিনি ১৯৪৮ সালের নাকবার সময়ও বাস্তুচ্যুত হয়েছিলেন, ২০২৩ সালের যুদ্ধেও আবার একই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন। তিনি পরিবারের বহু সদস্যকে হারিয়েছেন, খোয়া গেছে ঘরবাড়ি ও জীবনের সঞ্চয়। তবুও তিনি গাজা ছাড়তে রাজি হননি। তার ভাষায়, দ্বিতীয়বার বাস্তুচ্যুতি মানে ছিল ‘আরও বড় এক নাকবার পুনরাবৃত্তি’।  

তার মতো আরও হাজারো মানুষ আজ গাজার ধ্বংসস্তূপে বেঁচে আছেন— কেউ তাঁবুতে, কেউ অস্থায়ী আশ্রয়ে। অনেক পরিবার বারবার স্থানান্তরিত হয়েও মেলেনি নিরাপদ আশ্রয়। খাবার, পানি, চিকিৎসা সবকিছুই অনিশ্চিত থেকে গেছে।

আরেকটি বড় বাস্তবতা হলো প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধারাবাহিকভাবে এই অপূরণীয় ক্ষতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। অনেক পরিবারে শিশুদের পুরো জীবনটাই যুদ্ধের মধ্যে কেটেছে। কেউ তার বাবা-মা হারিয়েছে, কেউ পুরো পরিবার। এই ক্ষতি শুধু শারীরিক নয়, এটি মানসিক ও সামাজিকভাবেও গভীরভাবে প্রভাব ফেলছে। 

সিলওয়ান ও জেরুজালেম : নতুন উচ্ছেদের ছায়া 

পূর্ব জেরুজালেমের সিলওয়ান এলাকায় ঘরবাড়ি ভাঙা এবং উচ্ছেদ অভিযানও ‘নতুন নাকবা’র ধারণাকে আরও শক্তিশালী করছে। আল-বুস্তান এলাকায় বহু বাড়ি ধ্বংস করা হয়েছে এবং আরও শতাধিক বাড়ি ভাঙার ঝুঁকিতে রয়েছে। 

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, তাদের জীবন, স্মৃতি ও পরিবার একে একে ভেঙে যাচ্ছে। কেউ কেউ বাধ্য হয়ে নিজেরাই বাড়ি ভেঙে ফেলছেন, না হলে জরিমানা বা জোরপূর্বক উচ্ছেদের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। অনেক পরিবার এলাকা ছেড়ে চলে যাচ্ছে, ফলে সামাজিক কাঠামো ভেঙে পড়ছে।


নাকবার ধারাবাহিকতা : ইতিহাস নাকি চলমান বাস্তবতা 

১৯৪৮ সালের নাকবা এবং ২০২৩ সালের গাজা যুদ্ধের মধ্যে অনেকেই ধারাবাহিকতা খুঁজে পান। উভয় ক্ষেত্রেই দেখা যায়— বাস্তুচ্যুতি, ভূমি হারানো, এবং জনগণের ওপর ভয়াবহ চাপ। 

অনেক বিশ্লেষকের মতে, ফিলিস্তিন সংকট কেবল অতীতের একটি ঘটনা নয়, বরং একটি চলমান প্রক্রিয়া। দখলদারিত্ব, বসতি সম্প্রসারণ এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা এই বাস্তবতাকে আরও জটিল করে তুলছে। 

ধ্বংসস্তূপের বুকে দাঁড়িয়ে পুরো জাতি  

১৯৪৮ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত এই দীর্ঘ সময়জুড়ে ফিলিস্তিনিরা বারবার তাদের ঘর, পরিবার এবং নিরাপত্তা থেকে বিতাড়িত হয়েছেন। সব হারিয়েও টিকে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। ফিলিস্তিনের ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও মানুষ বেঁচে আছে, স্মৃতি আঁকড়ে পড়ে আছে। এই বেঁচে থাকাটাকে তাদের সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ বলে বিবেচনা করা হচ্ছে। 

আজ নাকবা দিবসে তাই প্রশ্নটা আরও তীব্র হয়ে দাঁড়ায়— বিভীষিকার ইতিহাস কি সত্যিই শেষ হয়েছে, নাকি এটি আবারও নতুন করে লেখা হচ্ছে ফিলিস্তিনের মাটিতে?




/ইউএমএইচ


  বিষয়:   নাকবা  ফিলিস্তিন  শরণার্থী 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: