বিশ্ববাণিজ্যে নতুন সমীকরণ : আধিপত্যের লড়াইয়ে মুখোমুখি চীন-যুক্তরাষ্ট্র

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

বেইজিংয়ে ১৪ ও ১৫ মে বৈঠকে বসছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। এই সফরের মূল আলোচ্য

2026-05-13T23:38:52+00:00
2026-05-13T23:41:35+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
আন্তর্জাতিক
বিশ্ববাণিজ্যে নতুন সমীকরণ : আধিপত্যের লড়াইয়ে মুখোমুখি চীন-যুক্তরাষ্ট্র
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ১৩ মে, ২০২৬, ১১:৩৮ পিএম  আপডেট: ১৩.০৫.২০২৬ ১১:৪১ পিএম
এই সফরের মূল আলোচ্য বিষয় হবে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক। গ্রাফিক : সময়ের আলো
বেইজিংয়ে ১৪ ও ১৫ মে বৈঠকে বসছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। এই সফরের মূল আলোচ্য বিষয় হবে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক। প্রায় এক দশকের মধ্যে এই প্রথম কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট চীন সফর করতে যাচ্ছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

গত কয়েক দশকে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন বিশ্বের দুই প্রধান পরাশক্তি হিসেবে উঠে এসেছে। আন্তর্জাতিক প্রভাব ও নেতৃত্বের প্রশ্নে দুই দেশকে প্রায়ই প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু মাত্র ২৫ বছর আগে পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তখন প্রায় সব প্রধান সূচকে যুক্তরাষ্ট্র চীনের চেয়ে অনেক এগিয়ে ছিল। বর্তমানে চীনকে বিশ্বের কারখানা বলা হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে তারা পশ্চিমা প্রতিদ্বন্দ্বীদেরও ছাড়িয়ে যাচ্ছে। 

এই প্রতিবেদনের তুলনামূলক বিশ্লেষণে অর্থনীতি, সামরিক শক্তি, সম্পদ ও প্রযুক্তির দিক থেকে দুই দেশকে পরিমাপ করা হয়েছে।

বিশ্বের শীর্ষ বাণিজ্য শক্তি কে 

বিশ্বব্যাংকের ওয়ার্ল্ড ইন্টিগ্রেটেড ট্রেড সলিউশন (ডাব্লুউআইটিএস)–এর তথ্য অনুযায়ী, ২৫ বছর আগে যুক্তরাষ্ট্র ছিল বিশ্বের সবচেয়ে বড় রফতানিকারক দেশ। ২০০১ সালে দেশটি ৭২৯ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রফতানি করেছিল। 

অন্যদিকে, একই সময়ে চীন ছিল চতুর্থ অবস্থানে। দেশটির রফতানির পরিমাণ ছিল ২৬৬ বিলিয়ন ডলার, যা যুক্তরাষ্ট্রের রফতানির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। তখন বিশ্বের মাত্র ৩০টি অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় চীনের সঙ্গে বেশি বাণিজ্য করত। 

বর্তমানে চীন বিশ্বের সবচেয়ে বড় রফতানিকারক দেশ। দেশটি বছরে প্রায় ৩.৫৯ ট্রিলিয়ন ডলারের পণ্য রফতানি করে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের রফতানি প্রায় ১.৯ ট্রিলিয়ন ডলার। এখন বিশ্বের ১৪৫টি অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় চীনের সঙ্গে বেশি বাণিজ্য করে।   


কে সবচেয়ে বড় রফতানিকারক 

২০২৪ সালে চীন বিশ্বের সবচেয়ে বড় রফতানিকারক দেশ হিসেবে ৩.৫৯ ট্রিলিয়ন ডলারের পণ্য রফতানি করেছে এবং ২.৫৮ ট্রিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। এর ফলে দেশটির বাণিজ্য উদ্বৃত্ত দাঁড়িয়েছে ১ ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি, যা বিশ্বের যেকোনো দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ। 

চীনের প্রধান রফতানি পণ্যের মধ্যে রয়েছে– যন্ত্রপাতি ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম (১.৬৮ ট্রিলিয়ন ডলার)। যেমন মোবাইল ফোন ও কম্পিউটার— যা দেশটির মোট রফতানির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। এছাড়া ২৮৬ বিলিয়ন ডলারের ধাতু ও ধাতবজাত পণ্য এবং ২৬৮ বিলিয়ন ডলারের বস্ত্র ও টেক্সটাইল পণ্য।

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম রফতানিকারক দেশ।  ২০২৪ সালে দেশটি ১.৯ ট্রিলিয়ন ডলারের পণ্য রফতানি করেছে এবং ৩.১২ ট্রিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বড় ধরনের বাণিজ্য ঘাটতি তৈরি হয়েছে। 
 
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত বছরের জানুয়ারিতে হোয়াইট হাউসে ফিরে আসার পর থেকে বিভিন্ন দেশের ওপর আরোপিত বাণিজ্য শুল্কের পক্ষে যুক্তি দিতে এই বাণিজ্য ঘাটতির বিষয়টি তুলে ধরছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান রফতানি পণ্যের মধ্যে রয়েছে– যন্ত্রপাতি ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম (৪৪৭ বিলিয়ন ডলার)। খনিজজাত পণ্য, যার মধ্যে ৩৬৪ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি তেল, মোম ও সংশ্লিষ্ট উপপণ্য রয়েছে; যা মোট রফতানির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এবং ২৪৫ বিলিয়ন ডলারের রাসায়নিক পণ্য রয়েছে।


যুক্তরাষ্ট্র ও চীন একে অপরের কাছ থেকে কী কিনছে 

যুক্তরাষ্ট্র ও চীন বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার। ২০২৫ সালে দুই দেশের মধ্যে ৫০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি মূল্যের পণ্য লেনদেন হয়েছে। তবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শুরু থেকে উভয় দেশ পাল্টাপাল্টি শুল্ক আরোপ করায় এই বাণিজ্যের পরিমাণ কিছুটা কমেছে।

পেন ওয়ার্টন বাজেট মডেলের তথ্য অনুযায়ী, চীন থেকে আমদানি পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের গড় শুল্ক প্রায় ৩১.৬ শতাংশ।

অন্যদিকে, চীনও যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি ও কৃষিপণ্যের ওপর বিভিন্ন ধরনের শুল্ক আরোপ করেছে। এর মধ্যে সব মার্কিন আমদানির ওপর ১০ শতাংশ সাধারণ শুল্ক রয়েছে, পাশাপাশি কিছু নির্দিষ্ট পণ্যের ওপর অতিরিক্ত সারচার্জও যোগ করা হয়েছে। 

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, এসব অতিরিক্ত শুল্কের হার প্রোপেন ও ইথেনের ক্ষেত্রে ১১ শতাংশ থেকে শুরু করে গরুর মাংসের ওপর ৭৭ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে।

তবুও, যুক্তরাষ্ট্র এখনও চীনের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার। অন্যদিকে, মেক্সিকো ও কানাডার পর চীন যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার।

২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র চীন থেকে ৪৫৩ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। এর মধ্যে প্রধান পণ্যগুলো হলো– ২১২ বিলিয়ন ডলারের যন্ত্রপাতি ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম; ৫৭.৯ বিলিয়ন ডলারের খেলনা, বিছানাপত্র ও আসবাবপত্রসহ বিভিন্ন ভোক্তা পণ্য; ৩১.৯ বিলিয়ন ডলারের টেক্সটাইল ও বস্ত্রপণ্য। 

একই বছরে চীন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১৪৫ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য আমদানি করেছে। এর মধ্যে প্রধান পণ্যগুলো ছিল– ৩০.৮ বিলিয়ন ডলারের যন্ত্রপাতি ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ; খনিজজাত পণ্য রয়েছে ২৪.১ বিলিয়ন ডলারের, যার মধ্যে জ্বালানি তেল, মোম ও সংশ্লিষ্ট উপপণ্য রয়েছে; আরও রয়েছে ১৮.২ বিলিয়ন ডলারের রাসায়নিক পণ্য। 


কার ঋণ বেশি 

যুক্তরাষ্ট্র ও চীন উভয় দেশই বিপুল পরিমাণ সরকারি ঋণের বোঝা বহন করছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ঋণ দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১১৫ শতাংশ, আর চীনের সরকারি ঋণ প্রায় ৯৪ শতাংশ। তবে বিশ্লেষকদের মতে, চীনের প্রকৃত ঋণের পরিমাণ সরকারি হিসাবের তুলনায় আরও বেশি হতে পারে।

২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকট যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি বড় মোড় ঘোরানো ঘটনা ছিল। সে সময় সরকার ব্যাংকগুলোকে উদ্ধার এবং অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে বিশাল অঙ্কের প্রণোদনা দেয়, ফলে দেশটির ঋণ দ্রুত বেড়ে যায়। 

চীনের ঋণও বাড়ছে, তবে তুলনামূলকভাবে ধীরগতিতে। ২০০০ সালে চীনের সরকারি ঋণ ছিল জিডিপির প্রায় ২২ শতাংশ, যা ২০০৯ সালে বেড়ে প্রায় ৩৪ শতাংশে পৌঁছায়। এরপর অবকাঠামো খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ এবং স্থানীয় সরকারগুলোর ঋণের কারণে ঋণের পরিমাণ আরও দ্রুত বাড়তে থাকে। 

কোভিড-১৯ মহামারির সময় দুই দেশেই ঋণের পরিমাণ নাটকীয়ভাবে বেড়ে যায়। অর্থনীতিকে সচল রাখতে যুক্তরাষ্ট্র ব্যবসায়িক ঋণ ও বেকারত্ব ভাতাসহ বিভিন্ন খাতে ট্রিলিয়ন ডলারের প্রণোদনা দেয়। অন্যদিকে, চীন অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ আরও বাড়ায়।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ ৩৯ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা দেশটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ। অন্যদিকে, চীনের প্রকৃত সরকারি ঋণের সঠিক পরিমাণ নির্ধারণ করা তুলনামূলকভাবে কঠিন।

যুক্তরাষ্ট্র নাকি চীন কারা সেনাবাহিনীতে বেশি খরচ করে 

সামরিক ব্যয়ের দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র এখনও বিশ্বের শীর্ষ দেশ। ডলারের হিসেবে দেশটির সামরিক ব্যয় চীনের তুলনায় প্রায় তিনগুণ বেশি।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান এসআইপিআরআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র তার সামরিক খাতে ৯৫৪ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে, যা দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৩.১ শতাংশ।

অন্যদিকে, চীন একই বছরে আনুমানিক ৩৩৬ বিলিয়ন ডলার সামরিক ব্যয় করেছে, যা তার জিডিপির প্রায় ১.৭ শতাংশ।

যুক্তরাষ্ট্র ও চীন মিলিয়ে বিশ্বের মোট সামরিক ব্যয়ের অর্ধেকেরও বেশি ব্যয় করে।

সামরিক সক্ষমতার ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্রের উল্লেখযোগ্য সুবিধা রয়েছে। বিমান শক্তির দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে চীনের তুলনায় প্রায় তিনগুণ বেশি যুদ্ধবিমান রয়েছে, পাশাপাশি তাদের সহায়ক সামরিক অবকাঠামোও অনেক উন্নত।

সমুদ্র শক্তির ক্ষেত্রে চীনের জাহাজের সংখ্যা বেশি হলেও, যুক্তরাষ্ট্র এখনও অগ্নিশক্তি, সাবমেরিন এবং বিমানবাহী রণতরীর সক্ষমতায় গুণগত দিক থেকে এগিয়ে রয়েছে। 

কে বেশি জ্বালানি ব্যবহার করে 

এই শতাব্দীর শুরু থেকেই চীনের জ্বালানি ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। দেশটি তার উৎপাদনশিল্প সম্প্রসারণ এবং অর্থনীতির দ্রুত শিল্পায়নের ফলে বিপুল পরিমাণ জ্বালানির চাহিদা তৈরি করেছে। 

বর্তমানে চীন বিশ্বের সবচেয়ে বড় জ্বালানি ব্যবহারকারী দেশ। ২০২৪ সালে ১৪০ কোটির বেশি মানুষের এই দেশটি মোট ৪৮ হাজার ৪৭৭ টেরাওয়াট (ঘণ্টা)(টিডাব্লুএইচ) জ্বালানি ব্যবহার করেছে। এর প্রায় ৮০ শতাংশ এসেছে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে, যার বেশিরভাগই কয়লাভিত্তিক।

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম জ্বালানি ব্যবহারকারী দেশ। প্রায় ৩৫ কোটি মানুষের এই দেশটি ২০২৪ সালে ২৬ হাজার ৩৪৯ টেরাওয়াট (ঘণ্টা) জ্বালানি ব্যবহার করেছে। এখানেও প্রায় ৮০ শতাংশ জ্বালানি এসেছে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে, বিশেষ করে তেল থেকে।

তবে সবুজ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে চীন স্পষ্টভাবে এগিয়ে রয়েছে।

২০২৪ সালে চীন সবুজ জ্বালানি খাতে ২৯০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ ছিল ৯৭ বিলিয়ন ডলার।

প্রযুক্তিগত দিক কে এগিয়ে 

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই), রোবটিক্স থেকে শুরু করে বৈদ্যুতিক যানবাহন (ইভি) পর্যন্ত উদীয়মান প্রযুক্তির ক্ষেত্রে চীন দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। তবে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে এখনো যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব স্পষ্ট। 

মরগান স্ট্যানলির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে কর্পোরেট ব্যয়ের হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র এআই খাতে প্রায় ১০৯ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে, যা প্রায় বিশ্বের বাকি অংশের সমান।

এআই উন্নয়নের ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্র এগিয়ে আছে। ওপেনএআই-এর চ্যাটজিপিটি, গুগলের জেমিনি এবং মেটার লামার মতো বড় এআই মডেলগুলো যুক্তরাষ্ট্র থেকেই এসেছে, যা চীনের তুলনায় সংখ্যায়ও বেশি। চীনের উল্লেখযোগ্য মডেলগুলোর মধ্যে ডিপসিক অন্যতম হলেও সামগ্রিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র এখনও এগিয়ে।

সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্রের শক্ত অবস্থান রয়েছে। বিশেষ করে এনভিডিয়ার সিইউডিএ সফটওয়্যার প্ল্যাটফর্ম মার্কিন চিপগুলোকে চীনা বিকল্পগুলোর তুলনায় বড় সুবিধা দিয়ে থাকে। তবে এই খাতে দুই দেশই তাইওয়ানের উপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল, যেখানে বিশ্বের প্রায় ৯০ শতাংশ উন্নত এআই চিপ তৈরি হয়। 

অন্যদিকে, বৈদ্যুতিক যানবাহন (ইভি) খাতে চীন স্পষ্টভাবে এগিয়ে রয়েছে। ২০২৪ সালে চীনে বিক্রি হওয়া নতুন গাড়ির প্রায় অর্ধেকই ছিল বৈদ্যুতিক গাড়ি, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রে এই হার ছিল প্রায় ১০ শতাংশ। 

২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে চীন এই খাতে প্রায় ২৩০ বিলিয়ন ডলার সরকারি ভর্তুকি দিয়েছে, যা তাদের দ্রুত অগ্রগতির একটি বড় কারণ।

বিরল খনিজ কার কাছে বেশি


চীনের কাছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিরল খনিজ মজুদ রয়েছে। ২০২৪ সালের হিসাবে দেশটিতে আনুমানিক ৪৪ মিলিয়ন টন পরিচিত বিরল আর্থ অক্সাইড মজুদ রয়েছে, যা বিশ্বে মোট মজুদের অর্ধেকেরও কিছু বেশি। 

চীন শুধু মজুদের দিক থেকেই নয়, প্রক্রিয়াকরণ বা পরিশোধনের ক্ষেত্রেও বিশ্বে আধিপত্য বিস্তার করে আছে। এর মানে হলো, অন্য দেশে খনন করা বিরল খনিজও অনেক সময় চীনে পাঠানো হয় পরিশোধনের জন্য। ফলে এই খাতের ওপর চীনের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী হয়।

বিরল পৃথিবীর খনিজ বলতে ১৭ ধরনের ধাতব উপাদানকে বোঝায়, যা আধুনিক প্রযুক্তির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেমন— বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি, উইন্ড টারবাইন, স্মার্টফোন, সামরিক সরঞ্জাম ও সেমিকন্ডাক্টর। 

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে প্রায় ১.৯ মিলিয়ন টনের বিশ্বের সপ্তম বৃহত্তম বিরল খনিজ মজুদ রয়েছে, যা চীনের তুলনায় ৫ শতাংশেরও কম। ফলে যুক্তরাষ্ট্র এই খনিজের জন্য চীনের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। 

তবে চীন খনন ও উৎপাদনে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় এগিয়ে গেছে মূলত নীতিগত কারণে। যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন নিয়ম, মামলা ও উচ্চ খরচের কারণে খনি পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়ে। বিপরীতে চীন তুলনামূলকভাবে এসব পরিবেশগত ও সামাজিক খরচ গ্রহণ করে দ্রুত উৎপাদন বাড়াতে সক্ষম হয়েছে।

এই কারণে বিরল খনিজ এখন যুক্তরাষ্ট্র–চীন বাণিজ্য উত্তেজনার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য আলোচনায় এটি বারবার উঠে আসে এবং ভবিষ্যতেও গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে থাকবে।

কে কোন বৈশ্বিক গোষ্ঠীর অংশ 

যুক্তরাষ্ট্র ও চীন একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক সংস্থা ও ফোরামের সদস্য। যেখানে তারা একসাথে কাজ করে, আবার আলাদা আলাদা জোটেও নেতৃত্ব দেয়।

উভয়দেশ যে সংস্থাগুলোর অংশ

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ 

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা 

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল 

জি২০ 

এশিয়া-প্যাসিফিক ইকোনমিক কো-অপারেশন 

চীনের আলাদা জোট ও সংস্থা

সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন (এসসিও)

ব্রিকস 

এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি)

যুক্তরাষ্ট্রের আলাদা জোট ও অংশীদারিত্ব

নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশন (ন্যাটো)

অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট 

ফাইভ আইজ গোয়েন্দা জোট

অস্ট্রেলিয়া–যুক্তরাজ্য–যুক্তরাষ্ট্র নিরাপত্তা অংশীদারিত্ব 

যুক্তরাষ্ট্র ও চীন অনেক বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মে একসাথে থাকলেও, তারা আলাদা আলাদা জোটের মাধ্যমে ভিন্ন ভিন্ন কৌশলগত ব্লকে অবস্থান করছে।

কার অর্থনৈতিক উন্নয়ন মডেল কেমন  

চীনের অর্থনীতি মূলত রাষ্ট্রনির্ভর। এখানে সরকার অবকাঠামো, শিল্প এবং প্রযুক্তিতে ব্যাপক বিনিয়োগের মাধ্যমে অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে বড় ভূমিকা রাখে। চীনের প্রবৃদ্ধি অনেকটাই রফতানিনির্ভর এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় পরিকল্পনার ওপর দাঁড়ানো, যেখানে মুক্তবাজার শক্তির ভূমিকা তুলনামূলকভাবে সীমিত।

অন্যদিকে, ট্রাম্পের আমেরিকা ফার্স্ট মডেল একটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি অনুসরণ করে। এতে শুল্ক (বিশেষ করে চীনের ওপর), কর হ্রাস, নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণ এবং উৎপাদন খাতকে আবার যুক্তরাষ্ট্রে ফিরিয়ে আনার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে 

এই নীতির অংশ হিসেবে তিনি ফেডারেল রিজার্ভকে সুদের হার কমাতে চাপ দিয়েছেন, একক দেশভিত্তিক বাণিজ্য চুক্তিকে বহুপাক্ষিক চুক্তির চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন, অভিবাসন সীমিত করেছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের চীনের ওপর নির্ভরতা কমানোর ওপর জোর দিয়েছেন।

সব মিলিয়ে চীনের মডেল বেশি কেন্দ্রীভূত ও পরিকল্পনাভিত্তিক, আর যুক্তরাষ্ট্রের এই নীতি বাজারভিত্তিক হলেও জাতীয় স্বার্থ ও সুরক্ষাবাদী দিক থেকে বেশি আক্রমণাত্মক।

সূত্র : আল-জাজিরা 

/ইউএমএইচ



  বিষয়:   চীন-যুক্তরাষ্ট্র  বৈঠক 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: