জেরুজালেমে ‘নতুন নাকবা’র আশঙ্কা, আল-আকসার কাছে সিলওয়ানে বাড়িঘর ভাঙচুর
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক
পূর্ব জেরুজালেমের সিলওয়ান এলাকায় ফিলিস্তিনি বাড়িঘর ভাঙার অভিযান দ্রুততর হওয়ায় নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর
একজন ব্যক্তি দখলকৃত পূর্ব জেরুজালেমের সিলওয়ান এলাকার কাছে ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর ইসরায়েলি বাহিনী ভেঙে ফেলার দৃশ্য দেখছেন। ছবি : মিডল ইস্ট আই
পূর্ব জেরুজালেমের সিলওয়ান এলাকায় ফিলিস্তিনি বাড়িঘর ভাঙার অভিযান দ্রুততর হওয়ায় নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে ইসরায়েল প্রশাসন উচ্ছেদ অভিযান আরও জোরদার করছে এবং বসতি সম্প্রসারণ প্রকল্প এগিয়ে নিচ্ছে।
এই অভিযানের কেন্দ্রবিন্দু হলো সিলওয়ানের আল-বুস্তান এলাকা, যা আল-আকসা মসজিদের দক্ষিণে অবস্থিত। স্থানীয়দের মতে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে এখন পর্যন্ত এখানে অন্তত ৫০টিরও বেশি ফিলিস্তিনি বাড়ি ধ্বংস করা হয়েছে। মোট প্রায় ১১৫টি বাড়ির মধ্যে এখন অধিকাংশই ভাঙার ঝুঁকিতে রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, ভাঙা বাড়ির ধ্বংসস্তূপ এখন পুরো এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে আছে। সরু রাস্তার পাশে প্রতি কয়েক মিটারেই ভাঙা দেয়াল ও কংক্রিটের স্তূপ দেখা যায়। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে নিজেরা বাড়ি ভেঙে ফেলছেন, অন্যথায় প্রশাসন জরিমানা বা জোরপূর্বক উচ্ছেদের হুমকি দিচ্ছে।
ফাখরি আবু দিয়া এক বাসিন্দা বলেন, ‘বাড়িটি ভাঙার সময় শুধু ভবন নয়, আমার পুরো জীবনের স্মৃতি ধ্বংস হয়ে গেছে। এটা শুধু একটি বাড়ি নয়, আমাদের অতীত, আমাদের পরিবার, আমাদের শৈশব সবকিছুই ছিল এখানে।’
তিনি জানান, আগে একই বাড়িতে ১০ জন সদস্য একসঙ্গে থাকতেন। এখন পরিবারটি বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়েছে।
দীর্ঘমেয়াদি উচ্ছেদ পরিকল্পনা বিশ্লেষকদের মতে, সিলওয়ান ও আশপাশের এলাকাগুলোতে এই অভিযান নতুন নয়। ১৯৬৭ সালে পূর্ব জেরুজালেম দখলের পর থেকেই এই অঞ্চলে বসতি সম্প্রসারণ ও ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদের প্রক্রিয়া ধীরে ধীরে চলছিল।
এলাকাটি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি পুরনো শহর ও আল-আকসার কাছাকাছি অবস্থিত। এখানে প্রায় ৫৫ হাজার ফিলিস্তিনি বসবাস করেন।
মানবাধিকার গবেষকদের মতে, এখানে তিনটি প্রধান এলাকা— ওয়াদি হিলওয়ে, আল-বুস্তান এবং বাতন আল-হাওয়ায় দীর্ঘদিন ধরেই উচ্ছেদ ও বসতি বিস্তারের মূল লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
ফাখরি আবু দিয়া দখলকৃত পূর্ব জেরুজালেমের সিলওয়ান এলাকায় তার বাড়ি ইসরায়েলি বাহিনীর দ্বারা ভেঙে ফেলার পর ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছেন।
বসতি ও পর্যটন প্রকল্পের অভিযোগ
স্থানীয়দের দাবি, উচ্ছেদের মূল লক্ষ শুধু আবাসন নয়, বরং পুরো এলাকার অবকাঠামোগত পরিবর্তন করা। ইসরায়েলি বসতি-সম্পর্কিত সংগঠনগুলো এখানে ‘সিটি অব ডেভিড’ ও ‘কিংস গার্ডেন’ নামে পর্যটন ও ধর্মীয় প্রকল্প সম্প্রসারণ করছে।
এই প্রকল্পগুলোর মাধ্যমে এলাকাটিকে বাইবেলভিত্তিক ঐতিহাসিক পার্কে রূপান্তরের চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ করা হচ্ছে— যা ফিলিস্তিনি উপস্থিতি কমিয়ে দেবে।
এক গবেষকের মতে, আল-বুস্তান এলাকাটি খালি করা হলে পশ্চিম জেরুজালেম থেকে বসতি এলাকাগুলোর মধ্যে সরাসরি সংযোগ তৈরি হবে, যা শহরের জনসংখ্যাগত কাঠামো বদলে দিতে পারে।
বাড়ি ভাঙার গতি বেড়েছে
মানবাধিকার সংস্থা ও স্থানীয় গবেষকদের মতে, আগে বছরে গড়ে মাত্র কয়েকটি বাড়ি ভাঙা হলেও ২০২৩ সালের পর থেকে তা দ্রুত বেড়েছে।
কিছু প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগে যেখানে বছরে ১-২টি বাড়ি ভাঙা হতো, এখন সেখানে কয়েক ডজন বাড়ি ধ্বংস করা হচ্ছে। প্রশাসন অনেক পরিবারকে স্বল্প সময়ের মধ্যে ‘স্বেচ্ছায় ভাঙার’ নোটিশ দিচ্ছে, না হলে দ্রুত অভিযান চালানো হচ্ছে।
আইন ও বিতর্ক
ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ দাবি করে, এসব বাড়ি ‘বিল্ডিং পারমিট ছাড়া নির্মিত’ হওয়ায় অবৈধ। তবে ফিলিস্তিনি ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর বক্তব্য, পূর্ব জেরুজালেমে ফিলিস্তিনিদের জন্য অনুমতি পাওয়া প্রায় অসম্ভব হওয়ায় এটি পরিকল্পিত বৈষম্য।
আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, দখল করা ভূখণ্ডে স্থায়ী পরিবর্তন ও জনসংখ্যা স্থানান্তর আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হতে পারে।
সামাজিক ও মানবিক প্রভাব
বাড়িঘর ভাঙার ফলে শুধু আবাসন সংকট নয়, পুরো সামাজিক কাঠামো ভেঙে পড়ছে। বহু পরিবার আত্মীয়দের বাড়িতে বা ভাড়া বাসায় চলে যেতে বাধ্য হচ্ছে, কিন্তু জেরুজালেমে ভাড়া অত্যন্ত ব্যয়বহুল হওয়ায় অনেকেই শহর ছেড়ে চলে যাচ্ছে।
এক বাসিন্দা বলেন, ‘আমরা আগে একসাথে বড় পরিবার হিসেবে থাকতাম। এখন সবাই আলাদা হয়ে গেছি। আমাদের সম্পর্ক ভেঙে গেছে।’
ফাখরি আবু দিয়ার পরিবারের বাড়ির একটি ভাঙা অংশ দখলকৃত পূর্ব জেরুজালেমের সিলওয়ান এলাকার ওই সম্পত্তির আঙিনায় পড়ে আছে।
‘নতুন নাকবা’র আশঙ্কা
স্থানীয় বাসিন্দারা মনে করছেন, এই উচ্ছেদ অভিযান অব্যাহত থাকলে এটি আরেকটি বড় ধরনের বাস্তুচ্যুতি সৃষ্টি করতে পারে, যাকে তারা ‘নতুন নাকবা’ বলে উল্লেখ করছেন।
এক বাসিন্দার ভাষায়, যদি এখনই কিছু না করা হয়, তাহলে সিলওয়ান ও জেরুজালেমের মানচিত্রই বদলে যাবে।
মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, পরিস্থিতি এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে পুরো ফিলিস্তিনি সম্প্রদায়ের অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়তে পারে।
প্রসঙ্গত, নাকবা আরবি শব্দ, যার অর্থ দুর্যোগ বা বিপর্যয়। ইতিহাসে নাকবা বলতে ১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিনিদের দেশত্যাগ ও বাস্তুচ্যুতির ঘটনাকে বোঝায়। ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার সময় ৭ লক্ষাধিক ফিলিস্তিনি তাদের ঘরবাড়ি থেকে বিতাড়িত হয়। প্রতি বছর ১৫ মে ফিলিস্তিনিরা এটি ‘নাকবা দিবস’ হিসেবে পালন করে, যা তাদের হারানো ভূমি এবং চলমান যন্ত্রণার প্রতীক।