মঞ্জিমা মঞ্জিল : ভালোবাসার ছাদে ৫৪ জনের এক পরিবার

বন্যা নাসরিন

ফিচার

আধুনিক যুগে যখন পারিবারিক বন্ধন ক্রমশ আলগা হয়ে যাচ্ছে, তখন কেউ কেউ আজও ভীষণ মমতায় আঁকড়ে ধরে আছে বিশাল পরিবারের

2026-05-15T23:23:09+00:00
2026-05-16T11:55:55+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
ফিচার
মঞ্জিমা মঞ্জিল : ভালোবাসার ছাদে ৫৪ জনের এক পরিবার
বন্যা নাসরিন
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৫ মে, ২০২৬, ১১:২৩ পিএম  আপডেট: ১৬.০৫.২০২৬ ১১:৫৫ এএম
‘মঞ্জিমা মঞ্জিল’ নামে একটি বাড়ি ভালোবাসার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। গ্রাফিক : সময়ের আলো
আধুনিক যুগে যখন পারিবারিক বন্ধন ক্রমশ আলগা হয়ে যাচ্ছে, তখন কেউ কেউ আজও ভীষণ মমতায় আঁকড়ে ধরে আছে বিশাল পরিবারের সব সদস্যকে। জীবনের প্রয়োজনে হয়ত সবাই ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে, কিন্তু সম্পর্কের টানে প্রতি বছর নিয়ম করে একসঙ্গে মিলিত হন তারা। তেমনই একটি পরিবার ‘মঞ্জিমা মঞ্জিল’। বিশ্ব পরিবার দিবসে থাকছে ৫৪ সদস্যের এ পরিবারের কথা।

দেশের সীমান্তবর্তী জেলা কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলায় আছে আন্ধারীঝাড় নামে এক গ্রাম। সেখানে ‘মঞ্জিমা মঞ্জিল’ নামে একটি বাড়ি ভালোবাসার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। বাড়ির সদস্য সংখ্যা ৫৪ জন। সেই বাড়ির একজন উত্তরসূরি গুলশানারা আফরোজ অতসী। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করে- বর্তমানে তিনি ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল কলেজে শিক্ষকতা করছেন। পরিবার নিয়ে কথা হলো তার সঙ্গে।

অতসীর দিদার নাম মঞ্জিমা। স্ত্রীকে ভালোবেসে তার দাদু বাড়িটির এই নামকরণ করেছেন। অতসীর দাদা-দাদুর ৮ ছেলে ও ৩ মেয়ে। ৮ ছেলের বউ, ৩ মেয়ের জামাই, ২২ জন নাতি-নাতনি, দুই নাতনির জামাই, এক নাতিনের বউ এবং তাদের সন্তান মিলে মোট ৫৪ জন সদস্য প্রতি বছর দুটি ঈদে মিলিত হয়। কখনও শীতে বা বছরের অন্য কোনও সময় একসঙ্গে ভ্রমণে যান তারা। ওহ হ্যাঁ, পরিবারে আরও একজন অন্যতম সদস্য তাদের ‘বু’। ৮০ বছর বয়সী স্বামীহীনা এই বৃদ্ধা অতসীর বাবা-চাচাদের জন্মেরও আগে থেকে এ তাদের বাড়িতেই থাকেন।

দিদা-দাদু।

দিদা-দাদু।


বেশ সমৃদ্ধ পরিবার অতসীদের। তার দাদু মুক্তিযোদ্ধা, দিদা রত্নগর্ভা। ৮ ভাই এবং তাদের বউয়েরা সবাই স্নাতকোত্তর পাস এবং চাকরিজীবী। বেশিরভাগই কলেজে চাকরি করেন। তার বড় ফুপা একজন অবসর প্রাপ্ত সচিব, চাচাদের মধ্যেও শিক্ষা ক্যাডার এবং প্রশাসন ক্যাডার রয়েছে বলে জানান অতসী। ফুপিরাও সরকারি চাকরিজীবী। কাজিনরা ৪ জন স্নাতকোত্তর পাস করেছেন, কেউ কেউ পড়াশোনা করছেন, কেউ আবার ছোট। স্নাতকোত্তর পাস করা ৪ ভাই-বোনই চাকরিরত অবস্থায় আছেন।

অতসী বলেন, ‘এই যে আমরা সবাই মিলিত হই, এর পেছনের মূল অনুপ্রেরণাটা আমার দিদা এবং দাদু। আমাদের একটাই বাসা। বাসায় বড় উঠান আছে। তার চারদিক দিয়ে থাকার ঘর। উঠানটা অনেক বড়। আমরা ছোটবেলায় উঠানকে কেন্দ্র করেই বড় হয়েছি। দীর্ঘ সময় পর্যন্ত সবাই এসে ওই ঘরগুলোতে থাকতাম। ২০২৩ সালের দিকে বাসার একটা দিক ভেঙে চারতলা বিল্ডিং করা হয়। সেখানে সবাই একটা করে ইউনিট পাই। স্থায়ীভাবে বাসায় থাকে চার চাচা, বাকিরা বাইরে। তবে, প্রতি ঈদে দাদু-দিদাকে কেন্দ্র করে আমরা সবাই একত্রিত হই।’

প্রতি বছর মঞ্জিমা মঞ্জিলে এভাবেই গল্পের আসর বসে।

প্রতি বছর মঞ্জিমা মঞ্জিলে এভাবেই গল্পের আসর বসে।


এতজন মানুষ একসঙ্গে সময় পাওয়া, মিলিত হওয়া তো খুব কঠিন, কীভাবে এই অসাধ্য সাধন হয়- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা যারা ঢাকা, খুলনা বিভিন্ন জায়গায় আছি, ঈদের আগে সবাই মিলে একসঙ্গে টিকিট কাটি বাড়ি যাওয়ার জন্য। আমাদের মঞ্জিমা মঞ্জিল নামে একটা ফ্যামিলি গ্রুপ আছে। সেখানে এসব আলোচনা করি। যাত্রাপথে কাউকে রংপুর, কাউকে কুড়িগ্রামের অন্য কোনও স্থান থেকে তুলে নিয়ে একসঙ্গে বাড়িতে যাই। আমাদের যাওয়া কেন্দ্র করে অনেক আনন্দ হয়। বাড়িতে অবস্থান করা মানুষগুলো গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। আমরা সবাই পৌঁছালে হইচই করে গৃহপ্রবেশ হয়।’


ঈদের দিনগুলোর স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে অতসী বলেন, ‘আমাদের ঈদ একদিনে হয় না, যে কদিন একসঙ্গে থাকি, প্রতিটি দিনই ঈদ। আমরা প্রতি বেলার খাবার ৫৪ জন মিলে নিচতলায় খাই, তিন-চার বৈঠকে। প্রতিটি বৈঠকে ১৬ জন করে বসে। প্রত্যেক দিন সকালের নাস্তা হয় খিচুড়ি, ডিম ভাজি বা গরুর মাংস দিয়ে। ওই কয়েকদিন বাবুর্চি থাকে। ডেগ ভর্তি রান্না হয়। তারপর আমরা ক্যারাম খেলি, লং জাম্প করি, উঠানে ছোট কাজিনরা বিভিন্ন ধরনের খেলায় মজে থাকে। বিকেলের দিকে আমাদের আড্ডা হয়। আড্ডায় পিয়াজু, জিলাপি, পিৎজ্জা, চা- এগুলো খাই। জনপ্রতি ৫০ টাকা চাঁদা তুলে পিৎজ্জা নিয়ে আসি। যৌথ পরিবার হওয়াতে আমাদের শেয়ারিং ব্যাপারটা অনেক বেশি। অল্প খেলেও আনন্দ পাই। সন্ধ্যাতেও আড্ডা চলতে থাকে, আড্ডার মধ্যমণি থাকে দিদা-দাদু। চাচা-ফুপিরা একসঙ্গে বসে। ওই সময় শুরু হয় পরিবারের পুরনো ইতিহাস। নদী এলাকায় আমাদের একটা কাঠের দোতলা বাড়ি ছিল। আমার দাদু ছিল তখন চেয়ারম্যান। ওই বাসায় অনেক লোকজনের সমাগম হতো। বাবাদের সঙ্গে ফুপিদের বন্ধন, গ্রামের সেই বাড়িতে তারা কীভাবে বড় হয়েছে- এসব স্মৃতিচারণা চলতে থাকে।’
 
ভাই-বোনরা সবাই একইরকম পোশাক পরে আনন্দ ভাগাভাগি করে নেয়।

ভাই-বোনরা সবাই একইরকম পোশাক পরে আনন্দ ভাগাভাগি করে নেয়।


ঈদ নিয়ে স্মৃতিচারণা যেন ফুরোতেই চায় না। তিনি আরও বলেন, ‘এছাড়া কাজিনদের ছোটবেলার গল্প হয়। আমরা ৭ কাজিন এক গ্রুপ, ছোটরা অন্য গ্রুপ। সাতজনের নাম প্যাংচা গ্রুপ। যেকোনো সাংস্কৃতিক প্রোগ্রাম আমরা সাতজনই আয়োজন করি; ছোটদের সঙ্গে রেখে ও বড়দের পরামর্শ নিয়ে। মধ্যরাত পর্যন্ত আড্ডা, গান, অভিনয় এসব হয়। প্রোজেক্টরে সিনেমা হলের মতো সবাই সিনেমা দেখি। এক চাচি ভালো চা বানায়, রাত ৩টা-৪টার দিকে সেই চাচির কাছে আবদার করি চা খাওয়ার। প্রায়ই মাঝরাতে গরম মিষ্টি খেতে বের হই। ভোরের দিকে সবাই ঘুমিয়ে পড়লে, কাজিনরা লুকিয়ে বাইরে যাই, রাস্তায় হাঁটি। ঈদের দিন দাদু-দিদাকে সালাম করে সালামি নিই, কোরবানিতে কোরবানি দেই একসঙ্গে। কোথাও সবাই মিলে ঘুরতে যাই। প্রতি ঈদের পর চরের দোতলা বাড়ি যেখানে ছিল, এখন নদীগর্ভে বিলীন- সবাই ওখানে যাই। রান্না করে নিয়ে যাই, সেখানে ফুটবল টুর্নামেন্ট হয়। মঞ্জিমা মঞ্জিলের জার্সি আছে সবার। টিম ওয়াইজ ফুটবল খেলি। তারপর নদীতে গোসল করে সাথে নিয়ে আসা রান্না করা খাবার খাই সবাই মিলে। আমরা মূলত ওখানে যাই পুরনো শেকড়কে স্মরণ করতে, আমাদের চতুর্থ প্রজন্মকেও সেই শিকড়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে।’ 

মঞ্জিমা মঞ্জিলের সবার নিজস্ব জার্সি আছে।

মঞ্জিমা মঞ্জিলের সবার নিজস্ব জার্সি আছে।


এমন আনন্দ আয়োজনের বাইরে ব্যতিক্রম আয়োজনও করা হয়। অতসীর ভাষ্যমতে, ‘শীতে একটা প্রোগাম রাখি। দিদার বোনেরা, দাদুর ভাই বোনেরা, মা-চাচীদের মা-বাবা, সবাইকে শীতের কোনো এক দিনে একসঙ্গে করি। এটা মূলত প্রবীণদের মিলনমেলা। তখন পিঠাপুলির আয়োজন হয়। প্রবীণদের জায়নামাজ ও খেজুরসহ তাদের যা প্রয়োজন সেসব জিনিস উপহার দেই। আলাদা করে কাজিন টুগেদারও হয়।’

অতসীরা ভ্রমণেও যায় সবাই মিলে। ভ্রমণের স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে অতসী বলেন, ‘গত ডিসেম্বরে চারদিন ৫৪ জন মিলে সুন্দরবন ভ্রমণ করেছি। একটা পুরো জাহাজ কেবল আমরাই ভাড়া করে ঘুরেছি। একবার সবাই সাজেক ঘুরতে গিয়েছি। সেখানে কংলাক পাহাড়ে একা একা উঠে গেছে আমার বৃদ্ধ দিদা। দিদা-দাদু অনেক দেশ ঘুরেছেন, আমাদেরও ঘুরতে উৎসাহ দেন।’

বেদনাদায়ক স্মৃতি হাতড়ে তিনি বলেন, ‘ঈদ শেষে বাসা ছেড়ে চলে আসাটা খুব বেদনাদায়ক। যেদিন চলে আসি, নিচতলা, উঠান, বাড়ি পুরো ফাঁকা হয়ে যায়।’

সবাই চলে আসার পর মঞ্জিমা মঞ্জিল এভাবে শূন্য হয়ে যায়।

সবাই চলে আসার পর মঞ্জিমা মঞ্জিল এভাবে শূন্য হয়ে যায়।


এখন আর এমন পরিবার সচরাচর দেখা যায় না। কেন সবাই এভাবে মিলেমিশে থাকতে পারছে না জানতে চাইলে অতসী বলেন, ‘সবার মতামতকে প্রাধান্য দিলে সম্পর্ক ভালো থাকে। আমাদের পরিবার এ ব্যাপারটা মেনে চলে। পারিবারিক সমিতি আছে আমাদের। সেখানে পারিবারিক মিটিং হয়। সবাই আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়। চাচারা কাজিনদের নিয়ে সেশনে বসে। কোনটা ভালো, কোনটা খারাপ সবসময় পরামর্শ দেয়। আসলে প্রাইভেট স্পেস বেশি চাওয়ার কারণে, অন্যের প্রতি সহনশীল না হওয়ার কারণে এমন পারিবারিক বন্ধন আর দেখা যায় না। ’

আমাদের এই আধুনিক ও ব্যস্ত জীবনব্যবস্থায় এমন সুন্দর পারিবারিক বন্ধন সত্যিই খুব বিরল। মঞ্জিমা মঞ্জিলের সদস্যদের মতো যারা সমস্ত ব্যস্ততাকে একপাশে রেখে- ভালোবাসার টানে এক মোহনায় এসে মিলিত হয়, তারা আমাদের আশার আলো দেখায় একটা সুস্থ সমাজের, সুন্দর পরিবারের।


/ইউএমএইচ



  বিষয়:   মঞ্জিমা মঞ্জিল 


Loading...
Loading...
ফিচার- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: