খুলনা মেডিকেলে চিকিৎসা নয়, চলছে কমিশন বাণিজ্য। এই হাসপাতালটির নাম খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল না রেখে কসাইখানা রাখা উচিত। ক্ষোভ আর অসহায়ত্বে ভরা কথাগুলো বলছিলেন খুলনার আড়ংঘাটা থেকে আসা এক রোগীর বাবা। মেয়েকে নিয়ে চিকিৎসার আশায় খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এসেছিলেন তিনি। কিন্তু বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে এসে পড়েছেন একের পর এক হয়রানি আর কমিশন বাণিজ্যের ফাঁদে।
সরকারি হাসপাতাল মানেই সাধারণ মানুষের শেষ ভরসা। বিশেষ করে নিম্নআয়ের মানুষ, দিনমজুর, শ্রমজীবী কিংবা গ্রামের অসহায় রোগীরা কম খরচে চিকিৎসার আশায় ছুটে আসেন খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, এখানেই চিকিৎসার আড়ালে গড়ে উঠেছে ভয়ংকর এক কমিশন বাণিজ্য। আর সেই বাণিজ্যের মধ্যমণি হয়ে উঠেছেন হাসপাতালেরই কিছু চিকিৎসক।
ভুক্তভোগীরা জানান, একজন চিকিৎসক পরীক্ষা লিখে দেওয়ার পাশাপাশি হাতে ধরিয়ে দিচ্ছেন নির্দিষ্ট একটি বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের টোকেন। সেই প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা করিয়ে রিপোর্ট নিয়ে গেলে আবার অন্য চিকিৎসক আগের রিপোর্ট বাতিল করে পাঠিয়ে দিচ্ছেন আরেকটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে। অর্থাৎ চিকিৎসার চেয়ে যেন বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে- কোন রোগী কোন ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যাবে।
আরও পড়ুন
সরেজমিন খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আউটডোর বিভাগ ঘুরে দেখা যায়, বিভিন্ন চিকিৎসকের কক্ষ থেকেই রোগীদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের টোকেন। দৈনিক সময়ের আলো পত্রিকার প্রতিবেদকের গোপন ক্যামেরায় ধারণ করা দৃশ্যে দেখা যায়, চিকিৎসকদের কক্ষের ভেতর থেকেই রোগীদের বলা হচ্ছে- সরকারি হাসপাতালে পরীক্ষা করাতে গেলে সময় লাগবে, বাইরে করালেই দ্রুত রিপোর্ট পাওয়া যাবে।
ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করে বলেন, কমিশনের ভাগ-বাটোয়ারার কারণেই রোগীদের বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠানো হচ্ছে। আর এই কমিশন বাণিজ্যের পুরো চাপ গিয়ে পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে সরকারি হাসপাতালের পরীক্ষার চেয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের রিপোর্ট ‘ভালো’ বলেও আমাদের বোঝানো হচ্ছে। যে মানুষগুলো সরকারি হাসপাতালে আসে কম খরচে চিকিৎসার আশায়, তারাই উল্টো বাধ্য হচ্ছে অতিরিক্ত টাকা খরচ করতে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো- হাসপাতাল প্রশাসন যেখানে বাইরের দালালদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছে, সেখানে অভিযোগ উঠেছে হাসপাতালের ভেতরেই সক্রিয় রয়েছে আরও শক্তিশালী দালাল চক্র। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা দালালদের সরানো হলেও চিকিৎসকদের কক্ষের ভেতর থেকেই চলছে টোকেন বাণিজ্য আর রোগী ভাগাভাগির অভিযোগ। আর সেই চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন হাসপাতালেরই কিছু চিকিৎসক।
এ বিষয়ে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক কাজী আইনুল ইসলাম বলেন, হাসপাতাল প্রশাসন দালাল নির্মূলে কাজ করছে। তবে চিকিৎসকদের কক্ষের ভেতর থেকে টোকেন দেওয়ার বিষয়টি আমাদের জানা নেই। লিখিত অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ, ড্যাবের সাধারণ সম্পাদক ডা. পলাশ বলেন, কিছু চিকিৎসক অনৈতিক সুবিধার জন্য এমন কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকতে পারে তবে সব চিকিৎসক এমন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত নন।
খুলনা নাগরিক সমাজের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, চিকিৎসককে মানুষ সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করে নিজের জীবনের সংকটে। কিন্তু সেই চিকিৎসকরাই যদি রোগীদের চিকিৎসা নয়, কমিশনের হিসাব কষে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পাঠান- তা হলে প্রশ্ন উঠছে, সরকারি হাসপাতাল কি এখন সত্যিই সাধারণ মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল, নাকি নতুন এক বাণিজ্যের কেন্দ্র?
এএডি/