বর্তমান সময়ে অ্যান্টিবায়োটিক মানবজীবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ওষুধ। নিউমোনিয়া, টাইফয়েড, ইউরিন ইনফেকশন কিংবা বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণে অ্যান্টিবায়োটিক অসংখ্য মানুষের জীবন বাঁচিয়েছে।
কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, সচেতনতার অভাব ও অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে এই উপকারী ওষুধই এখন অনেক ক্ষেত্রে বড় স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হয়ে উঠছে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের অন্যতম সেরা আবিষ্কার অ্যান্টিবায়োটিক। এটি মূলত ব্যাকটেরিয়াজনিত ইনফেকশন বা সংক্রমণ নিরাময় করে কোটি কোটি মানুষের প্রাণ বাঁচিয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এর অবাধ ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার এক ভয়াবহ সংকট তৈরি করেছে, যার নাম ‘অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স’।
অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স কী?
যখন কোনো ব্যাকটেরিয়া নির্দিষ্ট অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলে এবং সেই ওষুধে আর মারা যায় না, তখন তাকে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স বলা হয়। এর মানে হলো, ওষুধটি তার কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলে।
ফলে সাধারণ একটি ইনফেকশনও তখন প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। ভুল ধারণাবশত অনেকেই মনে করেন, মানুষের শরীর অ্যান্টিবায়োটিকের প্রতি প্রতিরোধী হয়ে ওঠে। আসল বিষয়টি তা নয়; প্রতিরোধী হয়ে ওঠে মূলত ব্যাকটেরিয়া নিজে। এই সুপারবাগ বা শক্তিশালী ব্যাকটেরিয়াগুলো যখন শরীরে ছড়িয়ে পড়ে, তখন সাধারণ চিকিৎসায় রোগ ভালো হয় না।
কেন এই সংকট তীব্র হচ্ছে?
আমাদের কিছু অসচেতনতা এবং অভ্যাসের কারণে এই সংকট দিন দিন প্রকট হচ্ছে। আমাদের দেশে জ্বর, সর্দি-কাশি বা গলা ব্যথা হলেই অনেক মানুষ চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই ফার্মেসি থেকে অ্যান্টিবায়োটিক কিনে খাওয়া শুরু করেন।
ভাইরাসজনিত রোগে অ্যান্টিবায়োটিক সেবন-সাধারণ সর্দি-কাশি, ইনফ্লুয়েঞ্জা বা বেশিরভাগ গলা ব্যথার কারণ হলো ‘ভাইরাস’। ভাইরাসজনিত রোগে অ্যান্টিবায়োটিক কোনো কাজ করে না। কিন্তু অনেকেই না বুঝে এসব ক্ষেত্রেও অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া শুরু করেন। কেউ আবার দুই-তিন দিন খেয়ে কিছুটা সুস্থ বোধ করলেই ওষুধ বন্ধ করে দেন। এই অভ্যাসগুলো অত্যন্ত ক্ষতিকর।
নিয়ম মেনে ওষুধ
অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলা। কারণ, অ্যান্টিবায়োটিক সব রোগের জন্য নয়। অপ্রয়োজনে এসব ওষুধ খেলে শরীরে উপকারের চেয়ে ক্ষতিই বেশি হয়। চিকিৎসক যখন অ্যান্টিবায়োটিক দেন, তখন সেটির একটি নির্দিষ্ট ডোজ বা কোর্স থাকে (যেমন-৫ বা ৭ দিন)।
রোগ অনুযায়ী সঠিক ওষুধ, সঠিক ডোজ এবং নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত খাওয়া খুব জরুরি। অনেকেই ২-৩ দিন ওষুধ খাওয়ার পর একটু সুস্থ বোধ করলেই তা বন্ধ করে দেন, যা খুবই বিপজ্জনক। এতে শরীরের সব জীবাণু ধ্বংস হয় না, বরং কিছু জীবাণু আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। পরে একই সংক্রমণ হলে ওষুধ কাজ করতে চায় না।
প্রেসক্রিপশন ছাড়া ওষুধ কেনা
সাধারণ মানুষের মাঝে এখনও অ্যান্টিবায়োটিক নিয়ে অনেক ভুল ধারণা রয়েছে। কেউ মনে করেন শক্তিশালী ওষুধ মানেই দ্রুত সুস্থ হওয়া, আবার কেউ অন্যের প্রেসক্রিপশন অনুসরণ করে ওষুধ খান। কিন্তু মনে রাখতে হবে, একেকজনের রোগ ও শারীরিক অবস্থা একেক রকম।
তাই অন্যের ওষুধ নিজের জন্য কখনোই নিরাপদ নয়। আমাদের দেশে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া যেকোনো ফার্মেসি থেকে সহজেই অ্যান্টিবায়োটিক কেনা যায়, যা এই সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ। অ্যান্টিবায়োটিক আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের এক বড় আশীর্বাদ।
তবে এর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে না পারলে ভবিষ্যতে আমরা বড় সংকটের মুখোমুখি হতে পারি। তাই সচেতনতা বাড়ানো, চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলা এবং অপ্রয়োজনে অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ বন্ধ করা এখন সময়ের দাবি। নিজের সুস্থতার পাশাপাশি পরিবার ও সমাজের সুরক্ষার জন্যও এ বিষয়ে দায়িত্বশীল হওয়া জরুরি।
লেখক : ফিজিশিয়ান অব জেনারেল মেডিসিন, গ্রীন লাইফ মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতাল
/এসএকে