ইরাকের দুর্গম পশ্চিম মরুভূমিতে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে গোপনে দুটি সামরিক ঘাঁটি পরিচালনা করে আসছিল ইসরায়েল। সেখান থেকেই ইরানে সামরিক অভিযান চালানো হয়েছিল বলে দাবি করেছেন ইরাকের আঞ্চলিক সামরিক কর্মকর্তারা।
ইজরায়েলকে ‘শত্রু রাষ্ট্র’ মনে করা ইরাকের ভূখণ্ডে এমন গোপন তৎপরতা দেশটির সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছে।
২০২৬ সালের ৩ মার্চ ইরাকের পশ্চিম মরুভূমির এক বেদুইন শিবিরের বাসিন্দারা স্থানীয় এক মেষপালকের গুলিঝাঁঝরা ও অগ্নিদগ্ধ ট্রাক ফিরে আসতে দেখেন। ট্রাকটি চালাচ্ছিলেন ২৯ বছর বয়সী আওয়াদ আল-শাম্মারি। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, একটি হেলিকপ্টার ধাওয়া করে অনবরত গুলি ছুড়লে মরুভূমিতেই ট্রাকটি থেমে যায় এবং আওয়াদের মৃত্যু হয়।
নিহত আওয়াদের চাচাতো ভাই আমির আল-শাম্মারি নিউ ইয়র্ক টাইমসকে জানান, আওয়াদ ঘটনাবশত মরুভূমিতে গোপনে থাকা একটি ইসরায়েলি সামরিক ঘাঁটির সন্ধান পেয়েছিলেন এবং ইরাকের আঞ্চলিক সামরিক কমান্ডে ফোন করে সেখানে সৈন্য, হেলিকপ্টার ও তাঁবু দেখার কথা জানিয়েছিলেন। ধারণা করা হচ্ছে, এই গোপন তথ্য ফাঁস হওয়ার কারণেই তাকে হত্যা করা হয়েছে।
ইরাকে ইসরায়েলি ঘাঁটির উপস্থিতির খবর এর আগে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে প্রকাশ পেলেও ইরাকি কর্মকর্তারা জানান, সেখানে আরও একটি দ্বিতীয় গোপন ঘাঁটি ছিল, যা আগে জানা যায়নি। আঞ্চলিক নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের মতে, ২০২৪ সালের শেষ দিক থেকেই ইসরায়েল দূরবর্তী এলাকাগুলো চিহ্নিত করে এই অস্থায়ী ঘাঁটি তৈরির প্রস্তুতি নেয়।
মূলত বিমান সহায়তা, জ্বালানি সরবরাহ এবং চিকিৎসা সেবার জন্য ব্যবহৃত এই ঘাঁটিটি ২০২৫ সালের জুনে তেহরানের বিরুদ্ধে ১২ দিনের যুদ্ধে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রেখেছিল। এর মাধ্যমে ইসরায়েলি বিমানের জন্য ইরানে পৌঁছানোর দূরত্ব অনেক কমে যায়।
তথ্য অনুযায়ী, ওয়াশিংটন ২০২৫ সালের জুন বা তারও আগে থেকেই এই ঘাঁটির বিষয়ে জানত। এর অর্থ, ইরাকের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র হয়েও যুক্তরাষ্ট্র তাদের ভূখণ্ডে শত্রু শক্তির সক্রিয় থাকার বিষয়টি বাগদাদকে জানায়নি।
দুই ইরাকি নিরাপত্তা কর্মকর্তা জানান, গত বছরের যুদ্ধ ও বর্তমান সংঘাতের সময়ে ওয়াশিংটন ইরাককে তাদের রাডার ব্যবস্থা বন্ধ রাখতে বাধ্য করেছিল, যাতে মার্কিন বিমান নিরাপদে চলাচল করতে পারে। ফলে শত্রু তৎপরতা শনাক্তে বাগদাদ পুরোপুরি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
এই ঘাঁটির তথ্য প্রকাশ পাওয়ায় ইরাকের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা সামনে এসেছে। ইরাকি সামরিক বাহিনীর পশ্চিম ইউফ্রেটিস ফোর্সের কমান্ডার মেজর জেনারেল আলি আল-হামদানি বলেন, মেষপালকের আবিষ্কারের এক মাস আগেই সেনাবাহিনী মরুভূমিতে ইসরায়েলি উপস্থিতির সন্দেহ করেছিল। তবে এখন পর্যন্ত সরকার এ বিষয়ে নীরব রয়েছে।
অন্যদিকে, ইরাকের নিরাপত্তা বাহিনীর মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট জেনারেল সাদ মান দাবি করেছেন, ইসরায়েলি সামরিক ঘাঁটির অবস্থান সম্পর্কে ইরাকের কাছে কোনো তথ্য নেই।
ইরাকি আইনপ্রণেতা ওয়াদ আল-কাদু এই ঘটনাকে ইরাকের সার্বভৌমত্ব, সরকার ও নিরাপত্তা বাহিনীর প্রতি প্রকাশ্য অবজ্ঞা এবং নেতাদের অবস্থানকে ‘লজ্জাজনক’ বলে অভিহিত করেছেন।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী এবং পেন্টাগনের সেন্ট্রাল কমান্ড এই ঘাঁটি ও আওয়াদের হত্যাকাণ্ড নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। তবে সাবেক মার্কিন সামরিক কমান্ডার ও কূটনীতিকরা মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে পশ্চিম ইরাকে ইসরায়েলি উপস্থিতির বিষয়ে সেন্ট্রাল কমান্ড কিছুই জানত না— এমনটা ভাবা অসম্ভব।
সময়ের আলো/জেডি