‘ছোটবেলায় দেখতাম, টিউবওয়েলের পানি যখন নিচে চলে যেত তখন কল টিপলেও পানি আসত না। এ সময় বাইরে থেকে পানি দিয়ে কল চাপতাম। পরে আরও গভীর হলে আরও একটু পানি ঢালতে হতো, তারপর যখন কল চাপা হতো তখন পানি আসা শুরু হতো। একইভাবে এই ভঙ্গুর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য আমরা একটা বড় বাজেটে যাচ্ছি। এ ছাড়া এর থেকে উতরানোর কোনো উপায় নেই। এ ছাড়া চলমান অর্থবছরের তুলনায় এই বড় আকারের উন্নয়ন কর্মসূচি সরকারের বিনিয়োগ ও বাস্তবায়ন সক্ষমতা বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়।’ সোমবার দুপুরে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভায় ৩ লাখ কোটি টাকার নতুন এডিপি পাস হওয়ার পর এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
এর আগে সকালে শেরেবাংলা নগরের পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের এনইসি সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সভায় নতুন এ এডিপি পাস হয়। যেখানে আগামী অর্থবছরের মূল এডিপির আকার ধরা হয় ৩ লাখ কোটি টাকা। এ ছাড়া স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোর উন্নয়ন খরচসহ সার্বিক এডিপির আকার হচ্ছে প্রায় ৩ লাখ ৮ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা। ফলে চলমান এডিপির চেয়ে আগামী এডিপির আকার এক লাখ কোটি টাকা বাড়ছে। সেই সঙ্গে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এবার এডিপি আকার তিন লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেল।
নতুন এডিপিতে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। এডিপিতে বরাদ্দ পাওয়া শীর্ষ পাঁচটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে তিনটি হলো স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। এসব মন্ত্রণালয় ও বিভাগে বরাদ্দ আগের চেয়ে বেশ বেড়েছে। এডিপির নথি অনুসারে মূল এডিপিতে দেশজ উৎস থেকে জোগান দেওয়া হবে ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। প্রকল্প সহায়তা হিসেবে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে পাওয়া যাবে ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা। এডিপিতে প্রকল্পের সংখ্যা ১ হাজার ১০৫।
এ ছাড়া এডিপিতে বরাদ্দের দিক থেকে সর্বোচ্চ বরাদ্দ পেয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। এ বিভাগের বরাদ্দ হলো ৩৩ হাজার ৭৩৫ কোটি টাকা। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ রাখা হয়েছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ। এ বিভাগের বরাদ্দ ৩০ হাজার ৭৪১ কোটি টাকা। তৃতীয় স্থানে থাকা স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে বরাদ্দ ২৬ হাজার ৮০৬ কোটি টাকা। এরপরে চতুর্থ স্থানে থাকা মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২০ হাজার ৮৩৫ কোটি টাকা। পঞ্চম সর্বোচ্চ বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে, বরাদ্দ ১৯ হাজার ৪৪১ কোটি টাকা।
সভা শেষে প্রেস ব্রিফিংয়ে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, একটি ভঙ্গুর অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার ও পুনর্গঠনে পাঁচ বছরের ফ্রেমওয়ার্ক একটা পরিকল্পনা হয়েছে। এ এডিপি শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয় বরং রাষ্ট্রীয় সংস্কার, বৈষম্যহীন সমাজ গঠন, টেকসই অর্থনীতি ও আঞ্চলিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার একটি সমন্বিত রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে। তিনি বলেন, সরকার যখন দায়িত্ব নেয় তখন প্রায় ১ হাজার ৩০০ প্রকল্প বিগত সরকারের পক্ষ থেকে রেখে যাওয়া হয়। এখানে দেখা যাচ্ছে অনেক প্রকল্প আসলে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, দুর্নীতি এবং ইনেফিশিয়েন্সি ওয়েস্টেজ, যেটি জাতীয় ও অর্থনীতিতে অগ্রাধিকার থাকার কথা ছিল না। আমরা এখানে রিভিউ করছি। এই রিভিউতে যেগুলো গ্রহণযোগ্য নয় সেগুলোকে বাদ দেওয়া হবে।
এডিপি উচ্চাভিলাষী কি না এমন প্রশ্নের উত্তরে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, রাজনৈতিক সরকারের উচ্চাভিলাষ থাকতে হবে। আকাক্সক্ষা নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। বিশেষ করে বিগত দিনে দেশ যতটুকু পিছিয়েছে সেখান থেকে সেলবেজ করে সামনের দিকে যেতে হলে আপনাকে তো বিনিয়োগ করতে হবে। আপনি বিনিয়োগ না করলে প্রবৃদ্ধি হবে না, কর্মসংস্থান হবে না ও দেশের উন্নয়ন হবে না। সুতরাং আমাদের সে কনফিডেন্স আছে আমরা সেটি বাস্তবায়ন করতে পারব বিধায় আমরা প্রকল্প এত বড় একটা ডেভলপমেন্ট বাজেট করেছি। তিনি বলেন, সময়মতো প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না, এ নিয়ে প্রতিটি মন্ত্রণালয়ে ড্যাশবোর্ড থাকবে। প্রকল্পের অগ্রগতি সন্তোষজনক না হলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি জানান, এডিপি থেকে অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প বাদ দিতে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এ ছাড়া প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দিতে কিছু নিয়মকানুন অনুসরণ করা হবে। প্রয়োজনীয় দক্ষতা না থাকলে কেউ প্রকল্প পরিচালক হতে পারবেন না। অতীতে প্রকল্প পরিচালকদের বিরুদ্ধে অনেক দুর্নীতির অভিযোগ আছে।
রাজস্ব বাড়াতে এনবিআরের একটা রিফর্ম প্রোগ্রামে যাওয়া হচ্ছে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের রাজস্ব আদায়ের হার বিশ্বের একেবারে নিম্ন পর্যায়ে, সুতরাং আমরা তো সে জায়গায় রাখতে পারব না। দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য অর্থায়ন করতে হলে সেটি আমাদের অবশ্যই বাড়াতে হবে এবং এটির জন্য আমরা এনবিআরের একটা রিফর্ম প্রোগ্রামে যাচ্ছি। এগুলোর রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে আমাদের নেটওয়ার্কটাকে বড় করতে যাচ্ছি। বহুদিন নেটওয়ার্কের কথা শোনা গেছে; কিন্তু নেটওয়ার্ক বড় হয়নি। ঘুরেফিরে যারা আছে তারাই ট্যাক্স দিচ্ছে। তাদের ওপর বারবার চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। এ জন্য আমাদের নেটওয়ার্ক আমরা বৃদ্ধি করতে যাচ্ছি। আপনারা দেখতে পাবেন এবং মেবি অনেকের লোভ, একটা ইনকাম ট্যাক্স দিয়ে তারা নেটওয়ার্কে আসবে। যাতে আসে আমরা সবাইকে এনকারেজ করতেছি। যতবেশি লোককে আমরা নেটওয়ার্কে আনতে পারব তাদের জন্য সুবিধা।
এবারের বাজেটের বড় অংশ থোক বরাদ্দ রাখার বিষয়ে তিনি বলেন, বিষয়টা খুব সহজ। যে প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন সম্ভব নয়, যেগুলো জনস্বার্থে করার প্রয়োজনীয়তা নেই সেগুলো বাদ যাবে। সুতরাং কতগুলো বাদ যাবে এগুলো রিভিউ হচ্ছে। যেগুলো বাদ যাবে সেগুলোর জন্য আমরা থোক বরাদ্দ রেখেছি। কারণ আমাদের তো নতুন প্রকল্প করতে হবে। নতুন প্রকল্প করার জন্য থোক বরাদ্দ থেকে যার যে প্রয়োজনীয় তার পরিপ্রেক্ষিতে দেওয়া হবে। ওই কারণেই করা হয়েছে। প্রতিটি প্রকল্পের ভ্যালু ফর মানি মানে একটা মূল্য থাকতে হবে। এটি রিটার্ন ইনভেস্টমেন্ট, এটির ভেতরে আমার একটা রিটার্ন থাকতে হবে এবং এটি এমপ্লয়মেন্ট ক্রিয়েট করতে হবে। আমরা জবলেস কোনো গ্রোথ চাচ্ছি না। আমরা একটা বড় জনসংখ্যার আগামী দিনের কর্মসংস্থানকে মাথায় রেখে আমাদের প্রকল্প করছি। সুতরাং সেটিও আমাদের মাথায় রাখতে হবে। এখন আমাদের জলবায়ুর যে বিষয়টা সেটিও মাথায় রাখতে হবে।
এ সময় প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি (জোনায়েদ সাকি) ও পরিকল্পনা কমিশনের সচিব এস এম শাকিল আখতার উপস্থিত ছিলেন।
আরবিএন