কাতার বিশ্বকাপের সেই স্মৃতি নিশ্চয়ই ভুলে যাননি পর্তুগাল সমর্থকরা। মরক্কোর কাছে হেরে কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে যখন অশ্রুসিক্ত বিদায় নিচ্ছিল পর্তুগাল, ম্যাচের শেষ মুহূর্তে একজন বদলি খেলোয়াড় মাঠে নেমেছিলেন তিনি ভিতিনহা। কিন্তু সময় বদলেছে, বদলে গেছে দৃশ্যপটও। চার বছর আগের সেই তরুণ ক্যামিও আজ আর দলের প্রান্তিক কোনো চরিত্র নন। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে তিনি এসেছেন পর্তুগাল দলের মাঝমাঠের প্রধান সেনাপতি এবং অন্যতম সেরা তারকা হিসেবে।
পর্তুগালের গতিশীল মধ্যমাঠের এই মূল পরিকল্পনাকারী সদ্য সমাপ্ত ২০২৫ সালে উয়েফা নেশন্স লিগ জয়ের স্বাদ পেয়েছেন। শুধু জাতীয় দলেই নয়, ক্লাব ফুটবলেও এখন উড়ছেন তিনি। প্যারিস সেন্ট জার্মেইর (পিএসজি) হয়ে একের পর এক ট্রফি জিতে ভিতিনহা এখন উপভোগ করছেন তার ক্যারিয়ারের সোনালি সময়। পিএসজির টানা পাঁচটি লিগ ওয়ান শিরোপার চারটিতেই ছিল তার অগ্রণী ভূমিকা। এমনকি এই মিডফিল্ডারের জাদুকরী পারফরম্যান্সেই ২০২৪-২৫ মৌসুমের উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের শিরোপা ঘরে তোলে পিএসজি এবং বুদাপেস্টে আর্সেনালের বিপক্ষে আরেকটি ফাইনালের টিকেট কাটে।
সম্প্রতি বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ‘ফিফা’র সঙ্গে এক একান্ত সাক্ষাৎকারে ভিতিনহা কথা বলেছেন পর্তুগাল দলে তার ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব এবং প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ শিরোপা জেতার স্বপ্ন নিয়ে। বর্তমান কোচ রবার্তো মার্তিনেজের অধীনে পর্তুগাল দলটিতে যেন তরুণ ও অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের এক নিখুঁত মহাকাব্য তৈরি হয়েছে। একদিকে যেমন আছেন জোয়াও কানসেলো, ব্রুনো ফার্নান্দেস, বার্নার্ডো সিলভা এবং রুবেন দিয়াসের মতো অভিজ্ঞ বিশ্বসেরা তারকারা; ঠিক তেমনি তাদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়ছেন ভিটিনিয়ার প্রজন্মের ডিওগো কস্তা, জোয়াও ফেলিক্স, রাফায়েল লেয়াও এবং পেড্রো নেতোর মতো প্রতিভাবান ফুটবলাররা। এখানেই শেষ নয়, পিএসজিতে ভিটিনিয়ার সতীর্থ জোয়াও নেভেসের বয়স মাত্র ২১ বছর, আর অন্যদিকে ৪১ বছর বয়সেও চিরসবুজ ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো এখনও পরম নির্ভরতায় নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন পুরো দলকে।
দলের এই বৈচিত্র্যময় সমন্বয় পর্তুগালকে এবার নতুন কোনো উচ্চতায় নিয়ে যাবে বলে দৃঢ় বিশ্বাস ভিতিনহার। ফিফাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, আমি মনে করি এই সমন্বয়টা অত্যন্ত ইতিবাচক। একই স্কোয়াডে বিভিন্ন প্রজন্মের খেলোয়াড় থাকা সত্যিই ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের দলে অভিজ্ঞতা আছে, তারুণ্যের শক্তি আছে, খেলার মান আছে এবং আছে যেকোনো মূল্যে জেতার একাগ্রতা। যখন আপনি এই সবকিছুর সঠিক সংমিশ্রণ ঘটাতে পারবেন, তখন সেখান থেকে অসাধারণ ভালো কিছুই বয়ে আসবে।
ভিতিনহা এই ভালো কিছুর অনুপ্রেরণা পাচ্ছেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর কাছ থেকে। তিনি জানান রোলানালদোর কাছ থেকেই বিশ্বকাপে ভালো কিছু করার তাগিদ পাচ্ছেন। ভিতিনহা বলেন, ফুটবলকে তিনি যেভাবে দেখেন এবং গ্রহণ করেন তা সত্যিই অনন্য; তিনি চরম পেশাদার এবং খেলাটা নিয়ে ভীষণ সিরিয়াস। কোনো কিছুকেই তিনি ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দেন না। মাঠে নামার আগে তিনি নিশ্চিত করেন যে তিনি শতভাগ প্রস্তুত এবং দলের জন্য যা যা করা সম্ভব, তার সবকিছুই তিনি করেছেন।
শিরোপার স্বপ্ন থাকলেও ভিতিনহা পা রাখছেন মাটিতেই। অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসে ভেসে না গিয়ে প্রতিটি ম্যাচ ধরে ধরে এগোতে চান এই পর্তুগিজ তারকা। তার ভাষায়, আমরা কেবল জিততে চাই। আমরা জানি কাজটা কতটা কঠিন হবে। তবে এটাও বুঝি যে এখনই ফাইনাল কিংবা ট্রফি উঁচিয়ে ধরার বিষয়ে অতিরিক্ত চিন্তা করার কোনো মানে হয় না। যদিও সেটাই আমাদের মূল লক্ষ্য। আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপ ধাপে ধাপে ফেলতে হবে। এটাই সবসময় সেরা কৌশল। এই মুহূর্তে আমাদের পুরো মনোযোগ দিতে হবে গ্রুপপর্বের ম্যাচগুলোর ওপর। সেখানে যদি আমরা ভালো করতে পারি, তবেই কেবল পরের ধাপগুলো নিয়ে আমরা ভাবনা-চিন্তা শুরু করতে পারব। বিশ্বকাপের মঞ্চে এবার ভিতিনহার হাত ধরে পর্তুগাল তাদের অধরা সোনালি ট্রফিটি ছুঁয়ে দেখতে পারে কি না, এখন সেটাই দেখার অপেক্ষায় ফুটবল বিশ্ব।
আরবিএন