অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় নেওয়া কাঁচা পাট রফতানি বন্ধের সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ জুট অ্যাসোসিয়েশন (বিজেএ)। সংগঠনটির দাবি, সিদ্ধান্তটি প্রত্যাহার না করায় কাঁচা পাট রফতানিকারকরা ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছেন এবং দেশের লক্ষাধিক শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। আজকের মধ্যে এ সিদ্ধান্ত বাতিল না হলে বুধবার থেকে ধারাবাহিক মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছে বিজেএ।
মঙ্গলবার (১৯ মে) সকালে খুলনার দৌলতপুরে বিজেএ’র সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ ঘোষণা দেন সংগঠনের চেয়ারম্যান খন্দকার আলমগীর কবির। পরে রফতানি আদেশ প্রত্যাহারের দাবিতে শ্রমিকরা দৌলতপুর এলাকায় খুলনা-যশোর মহাসড়ক প্রায় এক ঘণ্টা অবরোধ করে রাখেন।
সংবাদ সম্মেলনে খন্দকার আলমগীর কবির অভিযোগ করেন, বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপদেষ্টা ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক স্বার্থে বিজেএ’র সঙ্গে কোনো আলোচনা ছাড়াই বেসরকারি জুটমিলগুলোকে এককভাবে পাটের বাজার নিয়ন্ত্রণের সুযোগ করে দেন। সরকারের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে রফতানি নীতি ২০২৪-২০২৭ এর পরিশিষ্ট-২ এ কাঁচা পাটকে শর্তযুক্ত রফতানি পণ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এর ফলে কাঁচা পাট রফতানি কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।
তিনি বলেন, এই সিদ্ধান্তের কারণে কাঁচা পাট রপ্তানিকারকরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। পাশাপাশি কাঁচা পাট রফতানির সঙ্গে জড়িত সারা দেশের লক্ষাধিক শ্রমিক ও কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। কৃষকরাও পাটের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। একই সঙ্গে এই খাত থেকে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে পাট উৎপাদন ও চাহিদার বিভিন্ন পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়। বিজেএ চেয়ারম্যান জানান, ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে দেশে প্রায় ৭৫ লাখ বেল পাট উৎপাদিত হয়েছে এবং বছর শেষে সাড়ে তিন লাখ বেল কাঁচা পাট উদ্বৃত্ত ছিল। চলতি ২০২৫-২০২৬ মৌসুমে দেশে পাট উৎপাদনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮৩ দশমিক ১৫ লাখ বেল। আগের বছরের উদ্বৃত্তসহ বর্তমানে মোট মজুদ রয়েছে ৮৬ দশমিক ৬৭ লাখ বেল কাঁচা পাট।
তিনি বলেন, দেশের পাটকলগুলোতে বছরে প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ লাখ বেল কাঁচা পাট প্রয়োজন হয়। এছাড়া অভ্যন্তরীণ চাহিদার জন্য আরও প্রায় ৫ লাখ বেল প্রয়োজন হয়। অর্থাৎ মোট চাহিদা প্রায় ৪৫ লাখ বেল। পাট অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের মার্চ পর্যন্ত দেশে ২০ দশমিক ৪০ লাখ বেল কাঁচা পাট মজুদ রয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে বছর শেষে আরও ১৫ থেকে ২০ লাখ বেল কাঁচা পাট উদ্বৃত্ত থেকে যাবে।
তার দাবি, দেশে পর্যাপ্ত উদ্বৃত্ত পাট থাকা সত্ত্বেও একটি নির্দিষ্ট পক্ষকে সুবিধা দিতে হঠাৎ করে কাঁচা পাট রফতানি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। অথচ দেশের চাহিদা পূরণের পরও প্রতিবছর মাত্র ৮ থেকে ১০ লাখ বেল কাঁচা পাট বিদেশে রফতানি করা হতো। এর মাধ্যমে দেশ প্রতি বছর ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার কোটি টাকার শতভাগ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করত।
খন্দকার আলমগীর কবির আরও বলেন, গত বছরের ৮ সেপ্টেম্বর কাঁচা পাট রফতানির ওপর শর্ত আরোপের পর ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের নভেম্বর পর্যন্ত মাত্র ৮৬ হাজার ৩৬৭ বেল কাঁচা পাট রফতানি করা সম্ভব হয়েছে। এতে বৈদেশিক মুদ্রা এসেছে মাত্র ১৪৭ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। তার ভাষায়, “কাঁচা পাট রফতানি বন্ধ করে দেশকে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন, একটি স্বার্থান্বেষী মহলের প্ররোচনায় অতীতেও কয়েক দফা কাঁচা পাট রফতানি বন্ধ করা হয়েছিল। ফলে বিদেশি ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে কাঁচা পাট না পেয়ে নিজেদের জুটমিল বন্ধ করে দেয়। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের কাঁচা পাটের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। বর্তমানে মাত্র ৮ থেকে ১০ লাখ বেল কাঁচা পাট রফতানি করা সম্ভব হচ্ছে। দ্রুত শর্ত প্রত্যাহার না করলে বিদেশি বাজার আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, কাঁচা পাট রফতানি বন্ধ থাকায় খুলনা, নারায়ণগঞ্জ, বৃহত্তর ফরিদপুর, উত্তরবঙ্গসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ৪০টি ছোট-বড় জুট প্রেস হাউস বন্ধ হয়ে গেছে। এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত প্রায় লক্ষাধিক শ্রমিক গত নয় মাস ধরে কর্মহীন অবস্থায় আছেন। শ্রমিকদের মধ্যে চরম অসন্তোষ তৈরি হয়েছে এবং যেকোনো সময় পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছে বিজেএ।
সংগঠনটির চেয়ারম্যান বলেন, ব্যবসা বন্ধ থাকলেও প্রতিষ্ঠানগুলোকে গুদাম ভাড়া, অফিস ভাড়া, ব্যাংক ঋণের সুদ, বীমা, শ্রমিক-কর্মচারীদের হাজিরা ও অন্যান্য খরচ বহন করতে হচ্ছে। এতে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, দ্রুত কাঁচা পাটকে শর্তযুক্ত রফতানি পণ্যের তালিকা থেকে অব্যাহতি না দিলে ব্যবসায়ীরা সীমাহীন আর্থিক সংকটে পড়বেন এবং ব্যাংক ঋণে জর্জরিত হয়ে পড়বেন। সেক্ষেত্রে এর দায় সরকারকেই নিতে হবে।
খন্দকার আলমগীর কবির আরও জানান, কাঁচা পাট রফতানির ওপর থেকে শর্ত প্রত্যাহারের দাবিতে তারা একাধিকবার বস্ত্র, পাট ও বাণিজ্য মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। তবে তাদের দাবি আমলে নেওয়া হয়নি। এ অবস্থায় দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত বুধবার থেকে খুলনার দৌলতপুরে বিজেএ কার্যালয়ের সামনে ধারাবাহিক মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়।
সংবাদ সম্মেলনের পর শ্রমিকরা বাতিল হওয়া রফতানি আদেশ প্রত্যাহারের দাবিতে খুলনা-যশোর মহাসড়ক অবরোধ করেন। এতে সড়কে যান চলাচল কিছু সময়ের জন্য বন্ধ হয়ে যায়।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বিজেএ’র পরিচালক বদরুল আলম মার্কিন, খাইরুজ্জামান, নুর ইসলাম বাচ্চু, শামীম আহমেদ, কুতুব উদ্দিন, প্রিন্স মাহমুদ, রঞ্জন কুমার দাস, আলমগীর খান ও সাইফুল ইসলাম মানুসহ সংগঠনের অন্যান্য সদস্যরা। এছাড়া উপস্থিত ছিলেন গাজী শরিফুল ইসলাম, মিতা বাগচী, জামাল হোসেন, আব্দুস সাত্তার, রানা হক, মজনু, লিওন জিয়া, আব্দুস সালাম, আবুল কালাম আজাদ, বেলাল হোসেন, শেখর সাহা, শাজাহান কবির, খন্দকার ইকবাল, খন্দকার হুমায়ুন, চৈতন্য সাহা, মিজানুর রহমান, পারভেজ, বাবলু এবং ইস্পাহানির জেনারেল ম্যানেজার সুলতান রশিদ।
আরবিএন