পাবলো পিকাসোর আঁকা ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী ও বিতর্কিত তৈলচিত্র ‘লে দেমোয়াজেল দেভিওঁ’। সৃষ্টির শুরু থেকেই এই চিত্রকর্মটি কখনো প্রশংসায় ভেসেছে, আবার কখনো তীব্র নিন্দার শিকার হয়েছে। আর দীর্ঘ এক শতাব্দীরও বেশি সময় পর এই বিখ্যাত চিত্রকর্মটি আবারও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রখ্যাত কৃষ্ণাঙ্গ শিল্পী হেনরি টেলর পিকাসোর এই কাজটিকে সম্পূর্ণ নতুন এক দৃষ্টিকোণ থেকে পুনর্নির্মাণ করেছেন, যা বর্তমানে প্যারিসের মুজে পিকাসো মিউজিয়ামে একটি প্রধান প্রদর্শনীর কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
ইতিহাসের পাতা উল্টে দেখা যায়, ১৯০৭ সালে প্যারিসে নিজের স্টুডিওতে একটি চিত্রকর্ম দেখানোর জন্য পিকাসো তার ঘনিষ্ঠ শিল্পী বন্ধুদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। দীর্ঘ ছয় মাস ধরে অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে তিনি এই ছবিটি এঁকেছিলেন। কিন্তু ছবিটি দেখার পর তার বন্ধুদের প্রায় সকলেই তীব্র ধাক্কা খান এবং চরম বিরক্তি প্রকাশ করেন। ফরাসি চিত্রশিল্পী জর্জ ব্রাক এই ছবি দেখার অভিজ্ঞতাকে পেট্রল পানের সাথে তুলনা করেছিলেন। এমনকি আঁরি মাতিসের মতো প্রখ্যাত শিল্পীও ছবিতে থাকা নারীদের অবয়বকে কুৎসিত বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। বন্ধুদের এমন চরম নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার কারণে ছবিটির সৃষ্টি হওয়ার পর প্রায় এক দশক ধরে তা জনসাধারণের সামনে প্রদর্শন করা সম্ভব হয়নি। অবশেষে ১৯১৬ সালে এটি প্রথম প্রকাশ্যে আনা হয়।

পিকাসোর এই চিত্রকর্মে বার্সেলোনার একটি পতিতালয়ের পাঁচজন নগ্ন নারীকে চিত্রায়িত করা হয়েছে, যারা সরাসরি দর্শকের দিকে তাকিয়ে আছে। এর মধ্যে দুইজনের মুখমণ্ডল ছিল আফ্রিকান মুখোশের মতো এবং সবার শরীরই ছিল জ্যামিতিক ও এবড়োখেবড়ো। তৎকালীন প্রচলিত শিল্পরীতির বাইরে গিয়ে আঁকা এই ছবিটি আধুনিক শিল্পের অন্যতম প্রধান আন্দোলন ‘কিউবিজমের’ ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিল। কিউবিজমে বাস্তবসম্মত রূপ পরিহার করে কোনো বস্তু বা মানুষকে খণ্ড খণ্ড ও জ্যামিতিক আকারে প্রকাশ করা হয়। পিকাসো ঐতিহ্যবাহী সব নিয়ম একসাথে ভেঙে ফেলায় তৎকালীন শিল্পীরাও তা সহজে গ্রহণ করতে পারেননি।
তবে পিকাসোর এই বৈপ্লবিক পরিবর্তন হুট করে আসেনি। ঐতিহাসিক ও সমালোচকদের মতে, এর পেছনে সরাসরি অবদান ছিল আফ্রিকান মহাদেশের লোকশিল্পের। ছবিটি আঁকার ঠিক কয়েক মাস আগে পিকাসো আফ্রিকান মুখোশ ও ভাস্কর্যের প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট হন। বিশেষ করে কঙ্গোর একটি ছোট মূর্তি দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি প্যারিসের নৃতাত্ত্বিক জাদুঘরে নিয়মিত যাতায়াত শুরু করেন এবং শত শত খসড়া তৈরি করেন। আফ্রিকান শিল্পের এই সরল ও বিমূর্ত রূপই তাকে মানুষের চেনা অবয়ব ভেঙে নতুন কিছু তৈরি করতে সাহায্য করেছিল।
কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, পিকাসো আজীবন তার কাজের ওপর আফ্রিকান শিল্পের এই বিশাল প্রভাবের কথা অস্বীকার করে গেছেন। ১৯২০ সালে এক সাক্ষাৎকারে তিনি সরাসরি দাবি করেছিলেন যে তিনি আফ্রিকান শিল্পের নামই শোনেননি। পিকাসোর এই অস্বীকৃতি পরবর্তীকালে তার বিরুদ্ধে ‘সাংস্কৃতিক চুরির’ অভিযোগ এনেছে। সমালোচকরা মনে করেন, আফ্রিকান সংস্কৃতির গভীর আধ্যাত্মিক ও সামাজিক তাৎপর্যকে অবজ্ঞা করে সেগুলোকে সস্তা ও আদিম হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল।
ঠিক এই জায়গাটিতেই আঘাত করেছেন মার্কিন শিল্পী হেনরি টেলর। ২০০৭ সালে, অর্থাৎ চিত্রকর্মটির ঠিক একশ বছর পূর্তিতে তিনি পিকাসোর এই ছবিটিকে নতুন রূপ দেন। তার এই পুনর্নির্মিত চিত্রকর্মটির শিরোনাম দেওয়া হয়েছে ‘ফ্রম কঙ্গো টু দ্য ক্যাপিটাল অ্যান্ড ব্ল্যাক এগেইন’। টেলর পিকাসোর ছবির মূল কাঠামো এবং নারীদের দাঁড়ানোর ভঙ্গি ঠিক রাখলেও, মূল ছবির শ্বেতাঙ্গ নারীদের অবয়বকে সম্পূর্ণ কৃষ্ণাঙ্গ হিসেবে ফুটিয়ে তুলেছেন। এর মাধ্যমে তিনি পিকাসোর ছবিতে লুকিয়ে থাকা আফ্রিকান প্রভাবকে সরাসরি স্বীকৃতি দিয়েছেন।
প্যারিসের প্রদর্শনীতে যখন পিকাসো এবং টেলরের এই দুটি কাজ পাশাপাশি রাখা হয়েছে, তখন তা কেবল দুটি যুগের শিল্পের তফাতই প্রকাশ করছে না, বরং ক্ষমতা, বর্ণবাদ এবং ইতিহাসে কার গল্প বলা হচ্ছে- সেই দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত প্রশ্নগুলোকে নতুন করে সামনে এনেছে।
পাশাপাশি এই দুটি ছবি নারীদের প্রতি দুই শিল্পীর দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যও স্পষ্ট করে। পিকাসোর ব্যক্তিগত জীবনে নারীদের সাথে সম্পর্ক সবসময়ই বেশ জটিল ও যন্ত্রণাদায়ক ছিল। অনেক সমালোচক মনে করেন, পিকাসোর ছবিতে নারীদের শরীরের যে বিকৃতি ও হিংস্রতা দেখা যায়, তা মূলত তার ব্যক্তিগত ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ। অন্যদিকে হেনরি টেলরের ছবিতে নারীদের শরীরী অবয়ব কিছুটা নমনীয় এবং সেখানে প্রতিবাদের সুর স্পষ্ট। টেলরের ছবির কেন্দ্রীয় নারী চরিত্রটির চুল কাটার স্টাইল বিখ্যাত কৃষ্ণাঙ্গ সুপারস্টার জোসেফাইন বেকারের কথা মনে করিয়ে দেয়, যা পরিচয় ও বর্ণবাদের এক শক্তিশালী বার্তা বহন করে।
টেলরের ছবিতে আরও একটি বিশেষ দিক রয়েছে। ক্যানভাসের এক কোণে একটি শ্বেতাঙ্গ পুরুষের বিচ্ছিন্ন হাত সোনালী ঘড়ি পরিহিত অবস্থায় এক নারীর শরীর স্পর্শ করছে। এটি মূলত পিকাসোর আদি ভাবনার প্রতি ইঙ্গিত করে, যিনি প্রথমে এই ছবিতে একজন নাবিক ও একজন চিকিৎসকের চরিত্র রাখতে চেয়েছিলেন।
শুরুতে তীব্র সমালোচনা হলেও ১৯২০-এর দশকের দিকে এসে ফরাসি কবি আন্দ্রে ব্রেতোঁর হাত ধরে পিকাসোর এই ছবিটিকে একটি বৈপ্লবিক সৃষ্টি হিসেবে গণ্য করা শুরু হয়। পরবর্তীতে ১৯৩৯ সালে নিউইয়র্কের মিউজিয়াম অব মডার্ন আর্ট এটি কিনে নেয় এবং বর্তমানে সেখানেই এটি সংরক্ষিত রয়েছে।
/কহু