গরু নিয়ে হয়ত আমাদের বিশেষ কোনো আগ্রহ কাজ করে না। কিন্তু গরু সম্পর্কে এমন কিছু তথ্য আছে, যা শুনলে আপনি অবাক হতে বাধ্য।
গরু লালনপালনের জন্য কর দিতে হয়, শুনেছেন কখনও? সম্প্রতি বিশ্বে প্রথমবারের মতো গবাদিপশুর ওপর কর নির্ধারণ করেছে ডেনমার্ক। এক্ষেত্রে দেশটির যেকোনো পশু পালনকারী কিংবা খামারিকে গরুপ্রতি বছরে কর দিতে হবে ৯৬ ডলার (সাড়ে ১১ হাজার টাকা)। ২০৩০ সাল থেকে এই কর আদায় কার্যকর করা হবে।
কিন্তু, গবাদিপশুর ওপর কর নির্ধারণের কারণ কী? মূলত কৃষির এই খাত থেকেও কার্বন নিঃসরণ হয়, যা জলবায়ু পরিবর্তনে প্রভাব বিস্তার করে। তাই এ নিয়ম।
ডেনমার্কে গরু খামারি হওয়া সহজ নয়। অনেক খরচ এবং ঝক্কি-ঝামেলা পোহাতে হয়। তবে সেখানের সবকিছুই খুব পরিকল্পিত। তাই সাধারণত বিশৃঙ্খলা তৈরি হয় না। ডেনমার্কের গরুর জীবনযাপন কিংবা তাদের লালনপালন করার ধরন শুনলে যে কেউ অবাক হয়ে যাবেন।
ডেনমার্কে গরুরও পরিচয়পত্র রয়েছে এবং সেই পরিচয়পত্র তাকে দেওয়া হয় জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই। তাতে উল্লেখ থাকে তার জন্মসাল, জন্মস্থান, এমনকি পিতা-মাতার ব্যাপারেও। এ পরিচয়পত্রের নম্বরেই লিপিবদ্ধ হতে থাকে কবে তার টিকা দেওয়া হয়েছে, সে কী খাবার কত পরিমাণ খেয়েছে, তার কী কী অসুখ হয়েছিল, কী চিকিৎসা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, সে কী পরিমাণ দুধ দিয়েছে, দুধের মান কেমন, তার বাচ্চাসংখ্যা কত কিংবা কখন তার মেজাজ কেমন থাকে। স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোতে, বিশেষ করে ডেনমার্কে গরু লালনপালনে এমন অত্যাধুনিক পদ্ধতিই ব্যবহার করা হয়।
ডেনমার্কের ফার্মগুলোতে গরু দেখতে যাওয়াটাও সহজ নয়। যেতে চাইলে, আপনাকে প্রথমে নেওয়া হবে কোয়ারেন্টাইন রুমে। তারপর বিশেষ ধরনের অ্যাপ্রোন, জুতা পরে হ্যান্ড স্যানিটাইজ করে ফার্মে প্রবেশ করতে হবে।
গরুকে খাবার দেওয়ার পদ্ধতিও অভিনব। ফার্মে গরুর জন্য কয়েক ধরনের উপাদান দিয়ে বিভিন্ন ধরনের খাবার তৈরি করা হয়। খাবারের পাত্রগুলো কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত ঢাকনা দিয়ে ঢাকা থাকে। প্রতিটি গরুর জন্য সেখানে খাবার নির্ধারণ করা থাকে এবং তাদের কানে সেন্সরযুক্ত ইলেকট্রনিক ট্যাগ লাগানো আছে।
কোনও গরু যখন খাবারের পাত্রের সামনে যায়, সে পাত্রে যদি তার জন্য নির্ধারিত খাবার থাকে, তা হলে তা আপনাআপনি খুলে যায়। যদি না থাকে, সেক্ষেত্রে গরুটি যতই চেষ্টা করুক ওই পাত্রটি খুলতে পারবে না। এভাবে সেন্সরের মাধ্যমে প্রতিটি গরু প্রতিদিন কী পরিমাণে খাবার খেল, তা রেকর্ড হতে থাকে। সেই রেকর্ড অনুযায়ী গরুটির খাদ্য উপাদানে প্রয়োজনমতো পরিবর্তন আনা হয়।
গরুর দুধের সবচেয়ে মূল্যবান অংশ হচ্ছে ফ্যাট। ফ্যাট থেকেই মাখন, পনির, চিজসহ আরও অনেক দামি দামি খাবার তৈরি হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, হাসিখুশি গরুর দুধে ফ্যাটের পরিমাণ বেশি থাকে। তাই গরুর মন-মেজাজ ভালো রাখার জন্য পার্লারের ব্যবস্থা রয়েছে। নাম ‘ওয়েলনেস পার্লার’। পার্লারে ম্যাসাজ করা, স্টিম বাথ, মিউজিক শোনাসহ বিভিন্ন সুযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া গরুদের জন্য রয়েছে ‘প্লেজার গ্রাউন্ড’। সেখানে উন্নত প্রজাতির ষাঁড় রাখা হয় গরুকে ব্রিডিং করার জন্য। এক সময় যাচাইবাছাই না করে একেকটা ষাঁড়ের সঙ্গে একেকটা গরুকে দিয়ে দেওয়া হতো ব্রিডিং প্রক্রিয়ার জন্য। পশু অধিকার সংগঠন এ ব্যপারটি নিয়ে আপত্তি জানালে- পদ্ধতিতে পরিবর্তন আসে। তারা মনে করেন, এই কাজের জন্য বাধ্য করা উচিত নয়।
ষাঁড়টিকে যদি গরুটি পছন্দ না করে, তা হলে তা গরুটির ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শামিল। গরুটির নিজের সঙ্গী পছন্দ করার সুযোগ থাকা উচিত। পদ্ধতিতে পরিবর্তন আসার পর গরুকে ছেড়ে দেওয়া হয় প্লেজার গ্রাউন্ডে। তারপর সে তার পছন্দসই ষাঁড় বেছে নেয়।
পশু অধিকার সংগঠনগুলো আবার অভিযোগ তুলল, শুধু গরুর কথাই ভাবা হচ্ছে, ষাঁড়ের কথাও তো ভাবা উচিত। পছন্দ করার অধিকার কী শুধু গরুরই রয়েছে? ষাঁড়েরও থাকা উচিত। ফের পরিবর্তন করা হলো পদ্ধতি।
ডেনমার্কের অরহুস বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত এবং পশুসম্পদ ডিপার্টমেন্ট এক সঙ্গে স্ট্যাটিস্টিক্যাল অ্যানালাইসিসসহ আরও কিছু গবেষণা করে একটা মডেল দাঁড় করল প্লেজার গ্রাউন্ডের জন্য। তারপর নতুন করে ডেনমার্কের সমস্ত ফার্মে আবার প্লেজার গ্রাউন্ড তৈরি করা হলো।
ব্রিডিং করবে এমন গরুগুলোকে, ব্রিডিং করবে এমন ষাড়দের সঙ্গে মিশতে দেওয়া হলো। তখন সবাই সবার পছন্দসই সঙ্গী খুঁজে নিতে শুরু করল। এতে উভয়ের মানসিক স্বাস্থ্যও ভালো থাকল। বর্তমানে এই পদ্ধতিই চলমান।
আরেকটা মজার তথ্য দিয়ে শেষ করি। সেখানে মানুষের বদলে রোবট দিয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে দুধ সংগ্রহ করা হয়!
/কেএইচও