বাংলা সিনেমায় ‘মা’ শুধু একটি সম্পর্ক নয়, অনেক সময় ত্যাগ, সংগ্রাম, মমতা আর নৈতিক শক্তির প্রতীক এবং শক্তিশালী আবেগের জায়গা। এই মা সবসময় একই ছাঁচের নন। কখনও তিনি সন্তানের আশ্রয়, কখনও প্রতিবাদের ভাষা, আবার কখনও সমাজের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকা এক অনমনীয় নারী। বাংলা সিনেমার ইতিহাসে এমন অনেক মা চরিত্র আছে, যাঁরা দর্শকের মনে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ রেখে গেছেন।
পথের পাঁচালী – সর্বজয়া
পথের পাঁচালী বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়ের বহুল জনপ্রিয় উপন্যাস। এই উপন্যাস থেকে যেই সিনেমা নির্মিত হয়েছে, তাও খ্যাতি পেয়েছে বিশ্বজোড়া। পথের পাঁচালীর মা চরিত্রটির নাম সর্বজয়া। বাংলা চলচ্চিত্র বা সাহিত্যের অন্যতম শক্তিশালী মা চরিত্র এটি। দারিদ্র্য, সংসারের টানাপোড়েন, সামাজিক চাপ, স্বামীর অনিশ্চয়তা— সবকিছুর মাঝেও তিনি সন্তান অপু ও দুর্গাকে আগলে রাখেন। তাঁর রাগ, হতাশা, ভালোবাসা— সবই খুব মানবিক। সংসারের ভারে ক্লান্ত হলেও সন্তানদের প্রতি তাঁর টান কখনও কমে না।
সন্তান দুর্গার দুরন্তপনা তাঁকে বিরক্ত করে, অপুকে নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন থাকেন, আবার সংসারের খরচ সামলাতে গিয়ে কখনও কঠোর হয়ে ওঠেন। কিন্তু এই কঠোরতার ভেতরেই লুকিয়ে থাকে তাঁর গভীর মমতা। দুর্গার মৃত্যুর পর তাঁর ভেঙে পড়া কিংবা অপুকে ঘিরে ভবিষ্যতের উদ্বেগ চরিত্রটিকে অসাধারণ গভীরতা দেয়। সর্বজয়া দেখায়, মা হওয়া মানেই শুধু স্নেহ নয়— দায়িত্ব, হতাশা, ক্লান্তি আর নিরন্তর লড়াইও।
হাঙর নদী গ্রেনেড- বুড়ি
এ চলচ্চিত্রে মা চরিত্রটি মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নির্মিত এক গভীর মানবিক প্রতিচ্ছবি। বাংলার বহু মানুষকে কাঁদিয়েছিলো এই মা। তিনি এক যুদ্ধবিধ্বস্ত বাস্তবতার ভেতরে দাঁড়িয়ে থাকা একজন সংগ্রামী মানুষ। চারপাশে যখন অনিশ্চয়তা, মৃত্যু আর আতঙ্ক, তখন এই মা নিজের সন্তানকে বিসর্জন দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের বাঁচিয়ে রাখেন। এখানে দেশমাতৃকার প্রতি তাঁর দায়িত্ব যেমন ফুটে উঠেছে, তেমনই অসহায় এক মায়ের চরিত্রও ফুটে উঠেছে।
এই চলচ্চিত্রে মাতৃত্বকে দেখা যায় এক ধরনের নীরব প্রতিরোধ হিসেবে। তিনি অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেন না, কিন্তু দেশের জন্য নিজের সন্তানকে বিসর্জন দিয়ে যেই ত্যাগ স্বীকার করেন, তা যুদ্ধের চেয়ে কম কিছু নয়।
এই মায়ের চরিত্র দেখায়, যুদ্ধ শুধু বন্দুকের গুলিতে সীমাবদ্ধ নয়— যুদ্ধ হয় ঘরের ভেতরেও, মায়ের বুকের ভেতরেও।
মেঘে ঢাকা তারা– কাদম্বিনী
মেঘে ঢাকা তারার কাদম্বিনী বাংলা সিনেমার অন্যতম বিতর্কিত মা চরিত্র। সাধারণত সিনেমায় মা চরিত্রকে ত্যাগের প্রতীক হিসেবে দেখানো হলেও, কাদম্বিনী সেই ধারণাকে ভেঙে দেন। উদ্বাস্তু জীবনের অনিশ্চয়তা, অর্থনৈতিক সংকট এবং পরিবারকে বাঁচিয়ে রাখার চাপ তাঁকে এক কঠিন মানুষে পরিণত করে।
মেয়ে নীতার ওপর তাঁর নির্ভরশীলতা এতটাই বেশি যে, মেয়ের ব্যক্তিগত সুখ-স্বপ্নকে তিনি প্রায় গুরুত্বই দেন না। ফলে দর্শকের কাছে তিনি অনেক সময় নির্মম বলে মনে হতে পারেন। কিন্তু গভীরভাবে দেখলে বোঝা যায়, তাঁর এই আচরণের পেছনে রয়েছে ভবিষ্যৎ হারানোর ভয়, টিকে না থাকার ভয়। কাদম্বিনী তাই নিছক নেতিবাচক চরিত্র নন; বরং সময় ও বাস্তবতার নির্মম শিকার। এই চরিত্র দেখায়, সব মা একরকম নন— তাঁদেরও সীমাবদ্ধতা আছে।
আম্মাজান- আম্মাজান
বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে আম্মাজান একটি অবিস্মরণীয় চরিত্র। চরিত্রটা এতটাই শক্তিশালী যে, নিজের পরিচয়ের ঊর্ধ্বে গিয়ে আম্মাজান হিসেবেই তিনি পরিচিতি পেয়েছিলেন সবার কাছে।
এই মা শুধু সহনশীল নন— তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারেন, সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, এমনকি প্রয়োজন হলে কঠোরতাও দেখাতে পারেন। সন্তানের প্রতি ভালোবাসা এখানে দুর্বলতা নয়, বরং শক্তির উৎস।
এই মায়ের চরিত্রে দেখা যায় এক ধরনের সামাজিক ক্ষমতার রূপান্তর— যেখানে একজন মা পরিবারের সীমা ছাড়িয়ে ন্যায়ের প্রশ্নে দাঁড়িয়ে যান। তিনি কাঁদেন ঠিকই, কিন্তু তার কান্না শেষ পর্যন্ত প্রতিবাদের শক্তিতে রূপ নেয়।
অপুর সংসার– অপর্ণা
অপুর সংসারে অপর্ণা প্রথমে একজন প্রেমময় স্ত্রী হিসেবে উপস্থিত হলেও, গল্পের অগ্রগতিতে তিনি মাতৃত্বের এক কোমল প্রতীকে পরিণত হন। তাঁর উপস্থিতি অপুর বিশৃঙ্খল জীবনে স্থিতি আনে। অপর্ণা যেন ঘর, শান্তি এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনার প্রতিনিধিত্ব করেন।
সন্তানের জন্মের পরপরই তাঁর মৃত্যু গল্পকে ট্র্যাজিক মোড় দেয়। কিন্তু তাঁর অনুপস্থিতিই মাতৃত্বকে আরও শক্তিশালীভাবে প্রতিষ্ঠা করে। অপুর জীবনে ভীষণ শূন্যতা তৈরি করে।
অপর্ণা চরিত্রটি প্রমাণ করে, মাতৃত্ব অনেক সময় শারীরিক উপস্থিতির চেয়েও বড় এক আবেগিক উত্তরাধিকার।
শঙ্খনীল কারাগার- রাবেয়া
শঙ্খনীল কারাগার চলচ্চিত্রে মা চরিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন এক অনুভূতির জগৎ তৈরি করে। এখানে কোনও যুদ্ধ নেই, কোনও বন্দুক নেই, কিন্তু আছে জীবনের গভীরতম মানসিক যুদ্ধ।
এই মা খুব বেশি কথা বলেন না। তাঁর অনুভূতি প্রকাশ পায় দৃষ্টিতে, নীরবতায় এবং আচরণে। তিনি পরিবারের ভাঙন, সন্তানের কষ্ট এবং জীবনের অনিশ্চয়তাকে নিজের ভেতর ধারণ করেন, কিন্তু ভেঙে পড়েন না।
এই চরিত্র দেখায়, মা মানে সবসময়ই শক্তির প্রকাশ নয়— মা মানে অনেক সময় ভেতরে ভেতরে ভেঙে থেকেও টিকে থাকা।
বেলাশেষে – আরতি
বেলা শেষের আরতি বাংলা চলচ্চিত্রের এক স্মরণীয় মা। দীর্ঘ বিবাহিত জীবনের অভিজ্ঞতা, সন্তানদের মানুষ করা এবং সংসার সামলানোর পর তিনি নিজের অস্তিত্ব নিয়েও ভাবতে শুরু করেন।
সন্তানদের কাছে তিনি নির্ভরতার জায়গা, কিন্তু তাঁর নিজেরও অনুভূতি, অপূর্ণতা এবং অভিমান আছে। তিনি শুধু সংসার টিকিয়ে রাখা নারী নন, নিজের আত্মসম্মান ও অনুভূতির জায়গা নিয়েও সচেতন।
এই চরিত্রের বিশেষত্ব হলো, এখানে মা-কে শুধুই পরিবারের জন্য নিবেদিত একজন মানুষ হিসেবে দেখানো হয়নি; বরং ব্যক্তি সত্তা, আত্মসম্মান ও আবেগ নিয়ে একজন পূর্ণাঙ্গ নারী হিসেবেও দেখানো হয়েছে।
দহন– রমা
দহন চলচ্চিত্রের রমা চরিত্রটি সমাজ-বাস্তবতার মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা এক মায়ের প্রতীক। পরিবার, সামাজিক সম্মান এবং মেয়ের নিরাপত্তার প্রশ্নে তিনি বারবার দ্বিধা ও সংকটের মুখোমুখি হন।
এই চরিত্রের শক্তি হলো তাঁর বাস্তবতা। তিনি সবসময় নিখুঁত সিদ্ধান্ত নেন না, কখনও সামাজিক চাপে আপস করেন, আবার কখনও মেয়ের পাশে দাঁড়ানোর সাহস দেখান। ফলে, রমা হয়ে ওঠেন এমন মা— যিনি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি ও সন্তানের প্রতি দায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্য খোঁজেন। বাংলা সিনেমায় মধ্যবিত্ত পরিবারের মায়ের টানাপোড়েনকে এত সংবেদনশীলভাবে খুব কম চরিত্রই তুলে ধরতে পেরেছে।
দীপু নাম্বার টু– রোশন
দীপুর মা স্নিগ্ধ, পরিচিত এবং বাস্তবধর্মী এক মা চরিত্র। এই চরিত্রটি খুব নাটকীয় নয়; বরং মধ্যবিত্ত পরিবারের প্রতিদিনের জীবনের ভেতর দিয়ে তাঁর উপস্থিতি তৈরি হয়। সংসারের নিয়ম, সন্তানদের পড়াশোনা, শাসন আর স্নেহ— সব মিলিয়ে তিনি একদম চেনা ঘরের মা।
দীপুর দুরন্তপনা, কৌতূহল আর ছোটখাটো দুষ্টুমির মধ্যে মা চরিত্রটি কখনও তাকে বকেন, কখনও সাবধান করেন, আবার প্রয়োজনমতো স্নেহের আশ্রয়ও দেন। তাঁর মধ্যে অতিরিক্ত আবেগের প্রদর্শন নেই, কিন্তু পরিবারের ভিত হিসেবে তিনি সবসময় দৃশ্যমান। ট্রেনে দীপুর সঙ্গে যখন তাঁর শেষ দেখা হয়, সেই দৃশ্যটা খুব আবেগীয়। পরবর্তীতে মায়ের অভাববোধের ভেতরেই দীপুর জীবনে তিনি আরও ভীষণভাবে বেঁচে থাকেন।
দীপু নাম্বার টু-এর মা হয়ত বাংলা চলচ্চিত্রের বহুল আলোচিত চরিত্র নন, কিন্তু বাস্তবতা ও আন্তরিকতার জায়গা থেকে তিনি দর্শকের মনে আলাদা জায়গা করে নেন।
বাংলা চলচ্চিত্রের মায়েরা একই ধাঁচের নন। সর্বজয়ার সংগ্রাম, কাদম্বিনীর কঠোরতা, অপর্ণার কোমলতা, আরতির আত্মসচেতনতা বা রমার সামাজিক সংকট— সব মিলিয়ে তারা বাংলা সিনেমায় মায়ের ধারণাকে বহুমাত্রিক করে তুলেছেন। এই চরিত্রগুলো শুধু আবেগের জায়গা তৈরি করেনি, বরং সমাজ, পরিবার ও নারীর অবস্থান নিয়েও দর্শককে ভাবিয়েছে। তাই বাংলা সিনেমার এই মায়েরা কেবল চরিত্র নন, তারা আমাদের সাংস্কৃতিক স্মৃতিরও অংশ।
/মহু