পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের চা আলাদা স্বাদ, রং ও ঘ্রাণের জন্য পরিচিত। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বের বিভিন্ন চা উৎপাদনকারী অঞ্চলে একটি প্রশ্ন ক্রমশ গুরুত্ব পাচ্ছে— চায়ের স্বাদ কী বদলে যাচ্ছে?
চা গবেষক ও পরিবেশবিদদের অনেকে বলছেন, হ্যাঁ, বদল হচ্ছে। সেই পরিবর্তনের পেছনে বড় কারণ জলবায়ু পরিবর্তন। একই সঙ্গে বাড়ছে কীটনাশকের ব্যবহার এবং পরিবেশগত সংকট। ফলে চায়ের স্বাদ, গুণগত মান, এমনকি চা-বাগানের ভবিষ্যৎও এখন নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে।
চা গাছ অত্যন্ত সংবেদনশীল। নির্দিষ্ট তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, বৃষ্টিপাত ও মাটির গুণাগুণের ওপর এর স্বাদ অনেকটাই নির্ভর করে। একটি ভালো চায়ের জন্য দরকার ধীরগতির বৃদ্ধি, সুষম বৃষ্টি এবং অনুকূল আবহাওয়া। কিন্তু পৃথিবীর আবহাওয়া দ্রুত বদলে যাওয়ায় সেই স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট হচ্ছে।
বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কা, চীন কিংবা কেনিয়ার মতো চা উৎপাদনকারী দেশগুলোতে গত কয়েক বছরে আবহাওয়ার অস্বাভাবিকতা বেড়েছে। কখনও অতিরিক্ত বৃষ্টি, কখনও দীর্ঘ খরা, কখনও তীব্র তাপপ্রবাহ— সব মিলিয়ে চা গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে। গবেষকেরা বলছেন, অতিরিক্ত গরমে চা পাতার রাসায়নিক গঠনও বদলে যেতে পারে। ফলে আগের মতো স্বাদ ও সুবাস বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।
চা বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, একটি অঞ্চলের ‘টেরোয়ার’—অর্থাৎ মাটি, আবহাওয়া ও পরিবেশের সম্মিলিত প্রভাব চায়ের স্বাদ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যখন বৃষ্টির সময় বদলে যায় বা তাপমাত্রা অস্বাভাবিক হয়ে ওঠে, তখন সেই টেরোয়ারও বদলে যেতে শুরু করে। এর প্রভাব পড়ে সরাসরি চায়ের স্বাদে।
বিশেষ করে পাহাড়ি অঞ্চলের সূক্ষ্ম স্বাদের চাগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। দার্জিলিং বা উচ্চভূমির বিশেষ কিছু চায়ের ক্ষেত্রে সামান্য আবহাওয়াগত পরিবর্তনও স্বাদে বড় পার্থক্য তৈরি করতে পারে।
তবে সংকট শুধু স্বাদের নয়, উৎপাদনেরও। গবেষকদের মতে, চা চাষের জন্য আদর্শ তাপমাত্রা ১৮ থেকে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এর বেশি বা কম হলে উৎপাদন কমতে থাকে। গড় তাপমাত্রার চেয়ে ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বাড়লে চায়ের উৎপাদন ৪ শতাংশ কমে যায়।
বাংলাদেশের চা শিল্পও এই সংকট থেকে বাইরে নয়। সিলেট ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন বাগানে আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। আগে যে সময়ে নিয়মিত বৃষ্টি হতো, এখন সেখানে দীর্ঘ বিরতি দেখা যায়। আবার কখনও অল্প সময়ের মধ্যে অতিবৃষ্টি হচ্ছে। এতে চা গাছের স্বাভাবিক উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
গবেষক মো. রুহুল আমিন এক গণমাধ্যমে বলেন, ‘চা উৎপাদনের সঙ্গে কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমনের সম্পর্ক রয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাস নির্গমনের হার যত বেড়েছে, উৎপাদন ততো কমে আসছে। এ ছাড়া স্বল্পমেয়াদি চা উৎপাদন প্যাটার্ন লক্ষ্য করলে দেখা যায়, কোনও বছরে যদি বেশি চা উৎপাদিত হয়ে থাকে, এর পরবর্তী বছরগুলোতে নিম্ন উৎপাদন প্রবণতা লক্ষণীয়।’
এ ছাড়া অনিয়মিত আবহাওয়ার কারণে চা গাছ দুর্বল হয়ে পড়লে পোকামাকড়ের আক্রমণ বাড়ে। সেক্ষেত্রে কীটনাশকের ব্যবহারও বেড়ে যায়। অনেক চা-বাগানেই এখন আগের তুলনায় বেশি রাসায়নিক ব্যবহার করা হচ্ছে, যাতে উৎপাদন ব্যাহত না হয়। এই কীটনাশক ব্যবহারের মধ্যেই তৈরি হচ্ছে নতুন এক পরিবেশ ও স্বাস্থ্যগত উদ্বেগ। চা গাছে পোকা দমন করতে ব্যবহৃত রাসায়নিকের একটি অংশ মাটিতে জমা হয়, পানিতে মিশে যায়, এমনকি আশপাশের জীববৈচিত্র্যেও প্রভাব ফেলে। দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারে মাটির স্বাভাবিক উর্বরতা কমে যেতে পারে। উপকারী পোকামাকড় ও ক্ষুদ্র জীবাণুও এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করে।
চা-বাগানের শ্রমিকদের জীবনেও এর প্রভাব পড়ছে। অনেক সময় পর্যাপ্ত সুরক্ষা ছাড়া কীটনাশক প্রয়োগ করতে গিয়ে শ্রমিকেরা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েন। ত্বকের সমস্যা, শ্বাসকষ্ট কিংবা দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক জটিলতার আশঙ্কাও থেকে যায়। পরিবেশবিদদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন ও কীটনাশকের দ্বৈত চাপ চা-বাগান এলাকাগুলোকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।
একসময় চা-বাগানের চারপাশে ঘন সবুজ বনভূমি থাকত, যা স্থানীয় আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করত। কিন্তু বন উজাড়, পাহাড় কাটা ও অতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহারের ফলে সেই প্রাকৃতিক ভারসাম্যও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে চা-বাগানগুলো এখন আগের তুলনায় বেশি পরিবেশগত চাপের মুখে পড়েছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এখন টেকসই চা চাষের দিকে জোর দেওয়া হচ্ছে। অনেক চা-বাগান রাসায়নিকের ব্যবহার কমিয়ে জৈব পদ্ধতির দিকে ঝুঁকছে। কোথাও চা গাছ রক্ষার জন্য ‘শেড ট্রি’ বাড়ানো হচ্ছে, কোথাও পানি সংরক্ষণে নতুন ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বিজ্ঞানীরাও এমন চা গাছের জাত নিয়ে কাজ করছেন, যা বেশি তাপমাত্রা ও অনিয়মিত আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে।
ভোক্তাদের মধ্যেও সচেতনতা বাড়ছে। অনেকেই এখন জানতে চাইছেন, তাদের চায়ের উৎস কোথায়, কীভাবে তা উৎপাদিত হয়েছে, পরিবেশের ক্ষতি করে কী না। ফলে পরিবেশবান্ধব চায়ের বাজারও ধীরে ধীরে বড় হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জলবায়ু পরিবর্তন যদি বর্তমান গতিতে চলতে থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে বিশ্বের বহু অঞ্চলে চা উৎপাদন কঠিন হয়ে উঠতে পারে। শুধু উৎপাদন কমবে না, বদলে যেতে পারে শত বছরের পরিচিত স্বাদও। একসময় যে চায়ের সুবাস মানুষকে নির্দিষ্ট অঞ্চল চিনিয়ে দিত, ভবিষ্যতে সেই স্বাদ হয়ত আগের মতো থাকবে না। অর্থাৎ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব শুধু নদী, সমুদ্র বা কৃষিক্ষেত্রেই নয়, মানুষের প্রতিদিনের অনুষঙ্গ চায়ের স্বাদেও পৌঁছে গেছে।
/মহু