মাল্টি-লেয়ারড ওয়ার মেশিন হতে চায় ইরান

সময়ের আলো ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

‘ইরানের হাতে এমন কিছু অত্যাধুনিক দেশীয় অস্ত্র রয়েছে, যেগুলো এখনও যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহারই করা হয়নি। এমনকি বাস্তব পরীক্ষাও হয়নি। এবার আমরা

2026-05-22T00:22:36+00:00
2026-05-22T00:22:36+00:00
 
  মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬,
৬ শ্রাবণ ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬
আন্তর্জাতিক
মাল্টি-লেয়ারড ওয়ার মেশিন হতে চায় ইরান
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ২২ মে, ২০২৬, ১২:২২ এএম 
লেবাননের টায়ার এলাকার এক গ্রামে ইসরাইলি হামলায় নিহতদের জানাজা শেষে স্বজনদের বিলাপ। নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে নিহতদের পরিবার শেষ বিদায়ের অনুষ্ঠানটুকুও করতে পারেননি। ছবি : আলজাজিরা
‘ইরানের হাতে এমন কিছু অত্যাধুনিক দেশীয় অস্ত্র রয়েছে, যেগুলো এখনও যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহারই করা হয়নি। এমনকি বাস্তব পরীক্ষাও হয়নি। এবার আমরা আর সংযত আচরণ করব না।’ রুশ সংবাদমাধ্যম আরআইএ নভোস্তিকে দেওয়া ইরানের এক সামরিক কর্মকর্তার এই বক্তব্য নতুন করে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। 

আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষক, গোয়েন্দা মূল্যায়ন এবং বিভিন্ন বৈশ্বিক সংবাদমাধ্যমের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, ইরান এখন দীর্ঘস্থায়ী আঞ্চলিক যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত একটি ‘মাল্টি-লেয়ারড ওয়ার মেশিন (বহুস্তরীয় যুদ্ধযন্ত্র)’ হয়ে ওঠার চেষ্টা করছে।

আলজাজিরা বলছে, এই মন্তব্য এমন একসময়ে এলো, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে ইরানের উত্তেজনা আবারও বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছেছে। ওয়াশিংটন থেকে সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপের ইঙ্গিত, ইসরাইলের ধারাবাহিক হুমকি, গাজা যুদ্ধকে ঘিরে আঞ্চলিক অস্থিরতা এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে আরও বড় ধরনের সংঘাতের আশঙ্কা ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।

তেহরানের বার্তাও স্পষ্ট। ফের যদি হামলা হয়, তা হলে সেটি কেবল সীমিত পাল্টা জবাবে শেষ হবে না। বরং ক্ষেপণাস্ত্র, আত্মঘাতী ড্রোন, প্রক্সি বাহিনী, সাইবার হামলা এবং গণপ্রতিরোধ সব মিলিয়ে বহুস্তরীয় পাল্টা আঘাতের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে ইরান। একই সঙ্গে দেশটির সাধারণ নাগরিকদেরও সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ পরিস্থিতির জন্য প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে বলে দাবি করেছে রয়টার্স, মিডল ইস্ট আই ও সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজসহ (সিএসআইএস) আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম।

‘গোপন অস্ত্র’ বলতে কী বোঝাতে চাইছে ইরান : ইরানের সামরিক বাহিনী ও ইসলামিক রেভ্যুলশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) বহু বছর ধরেই পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মধ্যে নিজস্ব অস্ত্র প্রযুক্তি উন্নয়নের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এসআইপিআরআই), ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (আইআইএসএস) এবং মার্কিন থিংক ট্যাঙ্ক সিএসআইএসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী ইরানের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো কম খরচে বিপুলসংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও অসম যুদ্ধ কৌশল।

বিশ্লেষকদের ধারণা, ‘এখনও ব্যবহার না করা অস্ত্র’ বলতে ইরান কয়েকটি সম্ভাব্য প্রযুক্তির ইঙ্গিত দিতে পারে। নতুন প্রজন্মের হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র যেমন ‘ফাত্তাহ’ সিরিজ, দূরপাল্লার আত্মঘাতী ড্রোনের উন্নত সংস্করণ, ইলেকট্রনিক ও সাইবার যুদ্ধ প্রযুক্তি, ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা, ড্রোনের ‘স্বার্ম অ্যাটাক’ বা ঝাঁকভিত্তিক হামলা প্রযুক্তি এবং উন্নত জাহাজ বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র, যা পারস্য উপসাগরে মার্কিন নৌবহরের জন্য হুমকি হতে পারে।

রয়টার্স জানিয়েছে, ২০২৩ সালে ইরান ফাত্তাহ নামের একটি হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র উন্মোচন করে। তেহরানের দাবি, এটি শব্দের গতির ১৩ থেকে ১৫ গুণ বেগে চলতে পারে এবং মাঝপথে গতিপথ পরিবর্তন করতে সক্ষম। পশ্চিমা বিশেষজ্ঞরা এই দাবির সবটা নিশ্চিত না করলেও স্বীকার করেছেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি আগের চেয়ে অনেক উন্নত হয়েছে।

সিএনএনের প্রতিবেদন অনুযায়ী সাম্প্রতিক মার্কিন ও ইসরাইলি হামলার পরও ইরান প্রত্যাশার চেয়ে দ্রুতগতিতে তাদের সামরিক শিল্প ও ড্রোন উৎপাদন সক্ষমতা পুনর্গঠন করছে। মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধবিরতির কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তেহরান আবারও ব্যাপক হারে ড্রোন উৎপাদন শুরু করেছে।

মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারাও স্বীকার করছেন যে, ইরান তাদের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ক্রমেই ভূগর্ভে সরিয়ে নিচ্ছে। এ জন্য আরও শক্তিশালী ‘বাঙ্কার বাস্টার’ বোমার প্রয়োজন হতে পারে বলে জানিয়েছেন সেন্টকম প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার।

ইরানের পাল্টা হামলার কৌশল কী হতে পারে : সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরাইলের সঙ্গে সরাসরি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে ইরান প্রচলিত শক্তিতে পিছিয়ে আছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিমানশক্তি, স্যাটেলাইট নজরদারি ও নৌ সক্ষমতার সঙ্গে সরাসরি পাল্লা দেওয়া তেহরানের পক্ষে কঠিন। তাই ইরান ‘অ্যাসিমেট্রিক ওয়ারফেয়ার’ বা অসম যুদ্ধনীতির ওপর জোর দিচ্ছে।

ক্ষেপণাস্ত্র বৃষ্টি : ইরানের সবচেয়ে বড় ভয়ংকর শক্তি তার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভান্ডার। মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতরের বিভিন্ন মূল্যায়নে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে সবচেয়ে বড় ক্ষেপণাস্ত্র ভান্ডারগুলোর একটি ইরানের হাতে রয়েছে। ফের যুদ্ধ শুরু হলে ইসরাইলের সামরিক ঘাঁটি, বিমানঘাঁটি, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে শত শত ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হতে পারে। একই সঙ্গে ইরাক, কাতার, বাহরাইন বা সংযুক্ত আরব আমিরাতে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোও লক্ষ্যবস্তু হতে পারে বলে জানিয়েছে সিএসআইএস।

ড্রোনের ঝাঁক : রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে ইরানি ড্রোনের কার্যকারিতা বিশ্বজুড়ে নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে ‘শাহেদ’ সিরিজের আত্মঘাতী ড্রোন কম খরচে দূরপাল্লার হামলায় কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যৎ সংঘাতে ইরান একই সঙ্গে শত শত ড্রোন উড়িয়ে প্রতিপক্ষের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করতে পারে। এতে ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা চাপে পড়ে যেতে পারে।

হরমুজ প্রণালি অচলের চেষ্টা : বিশ্বের জ্বালানি বাণিজ্যের বড় অংশ পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালি দিয়ে যায়। আবার যুদ্ধ শুরু হলে ইরান সেখানে মাইন পেতে, ড্রোন বোট ব্যবহার করে বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে আন্তর্জাতিক তেল পরিবহন ব্যাহত করতে পারে বলেও আশঙ্কা রয়েছে। এ ধরনের পদক্ষেপ বিশ্ববাজারে আবারও তেলের দাম বাড়িয়ে দিতে পারে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা তৈরি করতে পারে বলে জানিয়েছে ব্লুমবার্গ।

প্রক্সি নেটওয়ার্ক সক্রিয় করা : ইরানের আঞ্চলিক প্রভাবের বড় অংশ আসে তার মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে। লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুথি, ইরাকের শিয়া মিলিশিয়া এবং সিরিয়ার বিভিন্ন গোষ্ঠীর সঙ্গে তেহরানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। এপি জানিয়েছে, সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে এসব গোষ্ঠী একযোগে ইসরাইল বা মার্কিন স্বার্থে হামলা চালাতে পারে। এতে যুদ্ধ কেবল ইরান সীমান্তে সীমাবদ্ধ না থেকে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হবে।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন বলছে, ইরান কেবল সামরিক অস্ত্রভান্ডার নয়, সাধারণ মানুষকেও দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধ যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করার চেষ্টা করছে। বিশেষ করে আইআরজিসির অধীন স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী বাসিজ মিলিশিয়া দেশজুড়ে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালাচ্ছে।

রয়টার্স, আলজাজিরা ও মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, অনেক শহরে তরুণদের প্রাথমিক অস্ত্র চালনা, নগর প্রতিরক্ষা, ড্রোন শনাক্তকরণ ও জরুরি উদ্ধারকাজ পরিচালনার প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরান বুঝতে পেরেছে যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি প্রচলিত যুদ্ধে টিকে থাকা কঠিন।

তাই তারা আফগানিস্তান, ইরাক ও ভিয়েতনামের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ‘জনযুদ্ধ’ বা দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধ কৌশলকেও গুরুত্ব দিচ্ছে। তেহরানের বাইরে কিছু এলাকায় ভূগর্ভস্থ বাঙ্কার, জরুরি খাদ্যসংগ্রহ এবং বিকল্প যোগাযোগব্যবস্থা নিয়েও কাজ হচ্ছে বলে দ্য ইকোনমিস্টসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

ভূগর্ভস্থ ‘ক্ষেপণাস্ত্র সিটি’ : ইরানের সবচেয়ে আলোচিত সামরিক প্রকল্পগুলোর একটি হলো কথিত ‘মিসাইল সিটি’- ভূগর্ভস্থ বিশাল টানেল নেটওয়ার্ক, যেখানে ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও অস্ত্র মজুদ রাখা হয়। ইরানি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা গেছে, পাহাড়ের গভীরে নির্মিত সুড়ঙ্গপথে সারিবদ্ধভাবে রাখা রয়েছে ক্ষেপণাস্ত্র ও মোবাইল লঞ্চার।

পশ্চিমা বিশ্লেষকদের মতে, এসব ভূগর্ভস্থ ঘাঁটি ইরানের কৌশলগত সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কারণ বিমান হামলা করেও পুরো অস্ত্রভান্ডার ধ্বংস করা কঠিন। তেহরানের ইমাম হোসেন স্কয়ারে আয়োজিত গণবিবাহ অনুষ্ঠানে সামরিক জিপে চড়ে নববধূকে নিয়ে আসছেন এক শিয়া ধর্মীয় নেতা।

ইরান এখন সাইবার সক্ষমতাও বাড়িয়েছে। মার্কিন ও ইসরাইলি বিভিন্ন অবকাঠামোয় অতীতে ইরান-সমর্থিত হ্যাকারদের হামলার অভিযোগ উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যৎ সংঘাতে বিদ্যুৎ গ্রিড, ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক, যোগাযোগব্যবস্থা বা শিল্প কারখানার সফটওয়্যারে সাইবার হামলাও বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

/কেএইচও


  বিষয়:   মাল্টি-লেয়ারড  ওয়ার  মেশিন  ইরান 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: