ধোঁয়া ওঠা গরম ভাত, পাশে মাছ বা মুরগির মাংস, ডাল, শাক ও একটা কাঁচামরিচ— বাংলাদেশের চিরচেনা একটি খাবার প্লেট। আমরা প্রতিদিন এমন খাবার খাই, কিন্তু খুব কম মানুষই ভাবি- এই এক প্লেট খাবারের পেছনে কত অসংখ্য প্রাণ, উদ্ভিদ, মাটি, পানি, পোকামাকড় ও প্রাকৃতিক সম্পর্ক কাজ করছে। এক কথায়- জীববৈচিত্র্য ছাড়া খাবারের অস্তিত্বই অসম্ভব।
জীববৈচিত্র্য মানে শুধু বনের বাঘ-সিংহ বা পাখি নয়। ধান, মাছ, মৌমাছি, এমনকি রান্নার মসলাও জীববৈচিত্র্যের অংশ। আমাদের খাদ্যব্যবস্থা আসলে প্রকৃতির বিশাল এক সমন্বিত সিস্টেমের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
বাংলাদেশ ধানের দেশ। ধান থেকে চাল, চাল থেকে ভাত হয়ে তা আমাদের খাবার প্লেটের প্রধান উপাদান হিসেবে ধরা দেয়। একসময় দেশে হাজার হাজার দেশীয় ধানের জাত ছিল। কোথাও লবণাক্ত জমির ধান, কোথাওবা খরাপ্রতিরোধী ধান। এই বৈচিত্র্য শুধু স্বাদের জন্য নয়, টিকে থাকার জন্যও জরুরি। লবণ সহ্য করতে পারে- এমন ধান না থাকলে উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষকরা চাষ করতে পারতেন না। পাহাড়ি এলাকায় আবার অন্য ধরনের ধান প্রয়োজন। জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে এই বৈচিত্র্যই ভবিষ্যতের খাদ্যনিরাপত্তার বড় ভরসা।
কৃষিবিজ্ঞানীরা মনে করেন, একই ধরনের ধানের ওপর পুরো কৃষি নির্ভরশীল হয়ে গেলে রোগ বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে বড় ক্ষতি হতে পারে। তাই দেশীয় বীজ ও কৃষিজ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নদীমাতৃক বাংলাদেশের মানুষদের বলা হয়- মাছে ভাতে বাঙালি। তাই ভাতের প্লেটে মাছ থাকা খুব স্বাভাবিক দৃশ্য। এটা শুধু খাবার নয়, সংস্কৃতিরও অংশ। মাছের সঙ্গে জড়িয়ে আছে নদী, খাল, বিল, হাওর ও জলাভূমি। এদের জীববৈচিত্র্য নষ্ট হলে মাছও হারিয়ে যায়। একসময় গ্রামবাংলার খালে-বিলে শিং, মাগুর, কৈ, টেংরাসহ নানা দেশি মাছ সহজেই পাওয়া যেত। এখন অনেক মাছ সহজে পাওয়া যায় না। নদী দূষণ, জলাভূমি ভরাট, অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার এর মূল কারণ। মাছ শুধু পানিতেই টিকে থাকে না, তার দরকার জলজ উদ্ভিদ, পোকামাকড়, নিরাপদ প্রজননক্ষেত্র ইত্যাদি। অর্থাৎ মাছের জীবন পুরো একটি বাস্তুতন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল। দূষণের কারণে সেই বাস্তুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এদিকে, মসলা ছাড়া তো বাঙালিরা তরকারি রান্না করতেই জানে না। সেই মসলাও জীববৈচিত্র্যের অংশ। হলুদ, মরিচ, ধনে, জিরা, এলাচ, দারুচিনি— প্রতিটি মসলা এসেছে উদ্ভিদ থেকে। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের জলবায়ু, মাটি ও পরিবেশের কারণে এসব মসলার স্বাদ ও গন্ধ ভিন্ন হয়।
আমাদের প্লেটে যেই ভাত বা শাকসবজি থাকে, তার সঙ্গে রয়েছে মাটির সম্পর্ক। উর্বর মাটির ভেতর কোটি কোটি অণুজীব বাস করে। ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক, কেঁচো ও নানা অণুজীব মাটিকে উর্বর রাখে। এরা মৃত পাতা ও জৈব পদার্থ পচিয়ে উদ্ভিদের জন্য পুষ্টি তৈরি করে। মাটির এই উপকারী প্রাণীরা না থাকলে ধান, শাকসবজি বা ফলের উৎপাদন মারাত্মকভাবে কমে যেত। আশঙ্কাজনক ব্যাপার হচ্ছে, অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারে মাটির জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে, দীর্ঘমেয়াদে জমির উর্বরতা কমে যাচ্ছে। এ ছাড়া বিশ্বজুড়ে এখন ‘এক ধরনের ফসল’ ভিত্তিক কৃষি বাড়ছে। একই জমিতে শুধু এক ধরনের ধান বা সবজি চাষ করলে প্রথমে উৎপাদন বাড়লেও, দীর্ঘমেয়াদে রোগবালাই ও পরিবেশগত ঝুঁকি বাড়ে।

জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হলে মাটির উর্বরতা কমে যায়, ফসল নষ্ট হয়, খাদ্যের পুষ্টিগুণ কমে যায়, মাছ ও বন্যপ্রাণীর আবাস ধ্বংস হয়, এমনকি জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোও কঠিন হয়ে যায়। আগে কৃষকেরা একসঙ্গে বিভিন্ন ফসল চাষ করতেন। বাড়ির পাশে শাক, পুকুরে মাছ, জমিতে ধান, আলপথে গাছ— পুরো ব্যবস্থা ছিল প্রাকৃতিক ভারসাম্যের ওপর নির্ভরশীল। এতে পোকামাকড়ের আক্রমণ কম হতো, মাটিও ভালো থাকত। এখন আধুনিক কৃষিতে অনেক জায়গায় সেই বৈচিত্র্য হারিয়ে যাচ্ছে। তবে নতুন করে অনেক কৃষক আবার দেশীয় বীজ, জৈব চাষ ও মিশ্র কৃষির দিকে ঝুঁকছেন।
একটি জলাভূমি ভরাট হওয়া, একটি বন উজাড় হওয়া কিংবা কোনও দেশীয় ধানের জাত হারিয়ে যাওয়া— শেষ পর্যন্ত আমাদের খাবারের প্লেটেই প্রভাব ফেলে। ভবিষ্যতে যেন আমাদের খাদ্য সংকটে পড়তে না হয়, সেজন্য প্রকৃতিকে বাঁচাতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে শুধু উৎপাদন বাড়ালেই হবে না, জীববৈচিত্র্যও রক্ষা করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন দেশীয় বীজ সংরক্ষণ, নদী ও জলাভূমি রক্ষা, কীটনাশক কম ব্যবহার, পরাগায়নকারী প্রাণী সংরক্ষণ, কৃষিতে বৈচিত্র্য ফিরিয়ে আনা, বন ও প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষা করা ইত্যাদি।
মানুষ প্রকৃতি থেকে আলাদা নয়। আমাদের প্রতিটি খাবার প্রকৃতির অসংখ্য জীবের সম্মিলিত উপহার। এক প্লেট খাবারের ভেতর মিশে থাকে নদী ও মাটির গল্প, মৌমাছির উড়াউড়ি, কৃষকের ঘাম কিংবা প্রকৃতির অসংখ্য প্রাণের অবদান। তাই জীববৈচিত্র্য রক্ষা মানে শুধু বন বা প্রাণী বাঁচানো নয়, নিজের অস্তিত্বকেও রক্ষা করা।
/মহু