করকাঠামোতে আসছে বেশ কিছু পরিবর্তন

এসএম আলমগীর

অর্থনীতি

দীর্ঘ প্রায় ২০ বছর পর দেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ জাতীয় বাজেট দিতে যাচ্ছে বিএনপি সরকার। আগামী ১১ জুন জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭

2026-05-23T00:34:01+00:00
2026-05-23T00:34:01+00:00
 
  শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬,
৩ শ্রাবণ ১৪৩৩
শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬
অর্থনীতি
বড় বাজেটে থাকবে নতুনত্ব
করকাঠামোতে আসছে বেশ কিছু পরিবর্তন
এসএম আলমগীর
প্রকাশ: শনিবার, ২৩ মে, ২০২৬, ১২:৩৪ এএম 
প্রতীকী ছবি
দীর্ঘ প্রায় ২০ বছর পর দেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ জাতীয় বাজেট দিতে যাচ্ছে বিএনপি সরকার। আগামী ১১ জুন জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট পেশ করবেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। নতুন এই অর্থবছরের বাজেটের সম্ভাব্য আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। ২০০১-০৬ মেয়াদে বিএনপির সর্বশেষ সরকারের শেষ দুই অর্থবছরের বাজেটের আকার ছিল যথাক্রম, ২০০৫-০৬ অর্থবছরে ৬১ হাজার ৫৮ কোটি টাকা এবং ২০০৬-০৭ অর্থবছরের বাজেটের আকার ছিল ৬৯ হাজার ৭৪০ কোটি টাকা।

তৎকালীন অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান ওই বাজেট ঘোষণা করেছিলেন। ২০ বছর পর আগামী ১১ জুন বিএনপির এই নতুন সরকার যে বাজেট দিতে যাচ্ছে তাতে থাকবে বেশ কিছু নতুনত্ব। বাজেটের আকার যেমন বড় হচ্ছে, তেমনই করকাঠামোতে থাকবে অনেক পরিবর্তন। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট ছিল ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে বাজেট বাড়ছে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকার। 

অন্যদিকে অর্থনীতিবিদ ও দেশের উদ্যোক্তারাও চাচ্ছেন এবারের বাজেটে যেন নতুনত্ব থাকে। বিশেষ করে নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি ও ব্যবসা সম্প্রসারণে এবারের বাজেটে নতুনত্ব কিছু রাখতে হবে বলে মনে করছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন।

সময়ের আলোকে তিনি বলেন, প্রতিটা বাজেটেই কিছু না কিছু নতুনত্ব থাকে। এবারও হয়তো বাজেটে নতুন কিছু থাকবে। তবে এবারের বাজেটটি নানা কারণে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে বিগত কয়েক বছরের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে টেনে তুলতে হলে আগামী বাজেটকে একেবারে নতুন করে ঢেলে সাজাতে হবে। বাজেটে একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি কমানোর উপাদান থাকতে হবে, সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর উপায় থাকতে হবে, আগামীতে দেশের অর্থনীতির লাইফ লাইন ব্যাংকিং খাত কীভাবে চলবে তার একটা দিকনির্দেশনা থাকতে হবে। এ ছাড়া আগামী বাজেটে বড় শিল্পের পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশের জন্য ভালো পদক্ষেপ থাকতে হবে। সে সঙ্গে আর্থিক টানাপোড়েন দূর করতে এবং বিশাল বাজেটের অর্থায়ন কীভাবে কোথা থেকে আসবে তার সুনির্দিষ্ট পথরেখা থাকতে হবে। 
আরও পড়ুন

নতুনত্ব থাকবে কোন দিকে : অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে যেসব দিকে নতুনত্ব থাকবে তার মধ্যে বেশি পরিবর্তন আসতে পারে করকাঠামোতে। এ ক্ষেত্রে নতুন উদ্যোক্তাদের ৫ বছরের জন্য করমুক্ত সুবিধার ব্যবস্থা রাখা হতে পারে। এলএনজি আমদানিতে ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য শতাংশ করা হতে পারে। হাসপাতালের বেড ও চিকিৎসা সরঞ্জামের ক্ষেত্রে ভ্যাট ১৫ শতাংশ কমিয়ে শূন্য শতাংশ করা হতে পারে। এপিআই বা ওষুধের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ছাড় ২০৩০ পর্যন্ত বাড়ানো হতে পারে। লিথিয়াম ও গ্রাফিন ব্যাটারিতে ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে ধাপে ধাপে কমিয়ে ০-৫ শতাংশ করা হতে পারে।

অন্যদিকে বেশ কিছু খাতে ভ্যাটের হার বাড়তে পারে আগামী বাজেটে। যেমন- নির্মাণ সেবায় ভ্যাট ৭.৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ১০ শতাংশ হতে পারে। এ ছাড়া অনলাইন মার্কেটপ্লেস কমিশনে ভ্যাট ৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৫ শতাংশ হতে পারে, মোবাইল হ্যান্ডসেটে ভ্যাট ৫-৭.৫ থেকে বেড়ে ৭.৫-১০ শতাংশ হতে পারে। প্লাস্টিকের বাসনপত্র ও হাইজিন পণ্যে ৭.৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৫ শতাংশ হতে পারে।

আসন্ন বাজেটে সরকার অর্থনৈতিক সংস্কার ও উদারীকরণের দিকে জোর দেবে। বিশেষ করে অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ কমানো এবং বাণিজ্য-বিনিয়োগ উদারীকরণকে বাজেটের মূল নীতি করা হচ্ছে। এর লক্ষ্য হলো- প্রতিযোগিতা বাড়ানো, খরচ কমানো, প্রবৃদ্ধি বাড়ানো। এ ছাড়া আমদানি করা কাঁচামালের ওপর অগ্রিম আয়কর বা এআইটি কমানোর সম্ভাবনা আছে। এতে ব্যবসা ও ভোক্তার খরচ কমবে। নির্দিষ্ট কিছু খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে অপ্রদর্শিত আয় বা কালো টাকা বৈধ করার সুযোগ দেওয়া হতে পারে আগামী বাজেটেও।

জানা গেছে, ২০২৬-২৭ এর বাজেটকে সরকার সংস্কারমুখী করতে চাইছে। পুরোনো চাহিদাভিত্তিক খরচের বদলে এবার ফোকাস দেওয়া হবে ব্যবসা সহজ করার দিকে। এ ক্ষেত্রে নিয়মকানুন কমানো, আমদানিতে এআইটি কমানো ও বিনিয়োগের পথ খোলা রাখা হবে। গ্রিন টেক ও স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে লিথিয়াম ব্যাটারি, সোলার, এপিআই প্রোডাকশনে ইনসেন্টিভ দিয়ে লোকাল প্রোডাকশন বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া অর্থনীতিতে গতি আনতে নির্বাচনের প্রতিশ্রুতিগুলো বাজেটে ঢুকিয়ে মানুষের কল্যাণ আর প্রবৃদ্ধি দুটোই ধরার চেষ্টা করা হবে আগামী বাজেটে। 

আগামী বাজেটে আরও যেসব জায়গায় পরিবর্তন আসতে পারে তার মধ্যে আছে- দৈনন্দিন কিছু জিনিসের ওপর ভ্যাট-ট্যাক্স বাড়ানো হতে পারে, তাই দাম বাড়তে পারে এসব পণ্যেরও। তা ছাড়া নির্মাণ কাজ, অনলাইন শপিং কমিশন, মোবাইল, প্লাস্টিকের বাসনপত্রেরও দাম বাড়তে পারে, কারণ এগুলোতে ভ্যাট বাড়ানোর প্রস্তাব আছে।

তবে আগামী বাজেটে বেশ কিছু জায়গাতে স্বস্তির বিষয় থাকবে। বিশেষ করে শক্তি, স্বাস্থ্য আর ওষুধ খাতে ছাড় আসছে। এলএনজি, হাসপাতালের বেড, এপিআই আমদানিতে ভ্যাট শূন্য করার কথা হচ্ছে। এতে বিদ্যুৎ, চিকিৎসা আর ওষুধের খরচ কিছুটা কমতে পারে।

নীতি ও ব্যবসার ক্ষেত্রেও আগামী বাজেটে কিছু নতুনত্ব থাকতে পারে। বর্তমান সরকার চাচ্ছে অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ কমিয়ে বিনিয়োগ আর বাণিজ্যকে সহজ করতে। আমদানির কাঁচামালে এআইটি কমানো হতে পারে।

আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপির আকার ধরা হয়েছে ৩ লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারি তহবিল বা নিজস্ব অর্থায়ন হবে ১ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক ঋণ ও সহায়তা থাকবে ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা। গত ১৮ মে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের সভায় এই এডিপি অনুমোদন দেওয়া হয়। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এবারের এডিপিতে শুধু অবকাঠামো না, সামগ্রিক উন্নয়ন আর নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন থাকবে। প্রকল্পগুলো রিভিউ করে শুধু বাস্তবসম্মতগুলোই বাস্তবায়ন করা হবে। চলতি ২০২৫-২৬ এডিপি ছিল ২ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ, নতুন বাজেটে এডিপি প্রায় ১৩.২ বেড়েছে।

ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ সামাজিক নিরাপত্তায় গুরুত্ব
নতুন বাজেটের আরেকটি নতুন দিক হবে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডের প্রবর্তন এবং এ রকম সামাজিক সুরক্ষা খাতকে অধিক গুরুত্ব দেওয়া। তার অংশ হিসেবে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বড় ধরনের বরাদ্দ ও পরিধি বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। আগামী অর্থবছরে এই খাতের আওতায় প্রায় ৩ কোটি ৬৩ লাখ মানুষকে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যাদের জন্য ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে ৩৫ হাজার ৭০৮ কোটি টাকা। 

সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের সভায় আগামী অর্থবছরের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর এই বাজেট চূড়ান্ত করা হয়েছে। সভা সূত্রে জানা গেছে, আগামী ১১ জুন জাতীয় সংসদে ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার যে বিশাল বাজেট প্রস্তাব পেশ করা হবে, সেখানে সামাজিক সুরক্ষাকেই মূল চালিকাশক্তি হিসেবে উপস্থাপন করা হবে। চলতি অর্থবছরে এই খাতে মোট বরাদ্দ ছিল ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা, যা আগামীতে ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আভাস পাওয়া গেছে।

এবারের বাজেটের সবচেয়ে আলোচিত দিক হচ্ছে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের ব্যাপক বিস্তার। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই এই কর্মসূচির উদ্যোগ নেয়। আগামী অর্থবছরে ফ্যামিলি কার্ডের উপকারভোগীর সংখ্যা ৪১ লাখে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এই কার্ডধারীরা প্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে নগদ ভাতা পাবেন, যার জন্য সরকার ১২ হাজার ৩৮৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখছে। একইভাবে কৃষি খাতের সুরক্ষায় ৪২ লাখ ৫০ হাজার কৃষককে ‘কৃষক কার্ড’ প্রদানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। কার্ডধারী কৃষকরা বছরে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে নগদ সহায়তা পাবেন, যা দেশের কৃষি অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা হচ্ছে। একইভাবে বয়স্কভাতা এবং বিধবা ভাতার মতো অন্যান্য সামাজিক সুরক্ষার খাতগুলোতেও আগামী বাজেটে বরাদ্দ বাড়বে।

এএডি/


Loading...
Loading...
অর্থনীতি- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: