সংস্কার না হলে সংসদীয় স্বৈরতন্ত্রের ঝুঁকি তৈরি হবে

সারোয়ার তুষার

মতামত

অনেক জল্পনা-কল্পনা পেরিয়ে ২০২৪-এর জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে একটি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং এর মাধ্যমে বিএনপি সরকার

2026-05-24T23:56:17+00:00
2026-05-24T23:56:17+00:00
 
  সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬,
৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬
মতামত
সংস্কার না হলে সংসদীয় স্বৈরতন্ত্রের ঝুঁকি তৈরি হবে
সারোয়ার তুষার
প্রকাশ: রোববার, ২৪ মে, ২০২৬, ১১:৫৬ পিএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
অনেক জল্পনা-কল্পনা পেরিয়ে ২০২৪-এর জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে একটি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং এর মাধ্যমে বিএনপি সরকার গঠন করেছে। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের জন্য এটি অবশ্যই একটি ইতিবাচক ঘটনা। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের পরিণতি হবে মিসরের মতো- ইন্ডিয়ান কোনো কোনো বুদ্ধিজীবী এমন ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। কিন্তু বাংলাদেশ তার অভিযাত্রা ধরে রাখতে পেরেছে এবং সব ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে সংসদীয় গণতন্ত্রের যুগে প্রবেশ করেছে। 

কিন্তু সত্যের খাতিরে বলতে হয়, বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্র এখনও অনেক নাজুক; এর প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি অত্যন্ত দুর্বল। প্রাতিষ্ঠানিক অ্যান্টিবডি না থাকার কারণে সংসদীয় গণতন্ত্র থেকে সংসদীয় স্বৈরতন্ত্রে ঝুঁকে পড়ার অতীত নজির রয়েছে। গণহত্যাকারী হাসিনা সরকার সংসদীয় স্বৈরতন্ত্রে সীমিত থাকেনি, রীতিমতো ফ্যাসিবাদে রূপ নিয়েছিল। 

এ কারণেই ভবিষ্যতে যেন কোনো সরকার আর স্বৈরাচার হয়ে উঠতে না পারে, সে লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হচ্ছে এই, গুম, মানবাধিকার, ব্যাংকিং সংস্কার, বিচার বিভাগ, পুলিশ কমিশনসহ গুরুত্বপূর্ণ ২০টি অধ্যাদেশ সরকার ইতিমধ্যেই বাতিল করে দিয়েছে। গণভোটের রায় মোতাবেক সংবিধান সংস্কার পরিষদও গঠন করা হয়নি। আদালতের রায় উপেক্ষা করে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্ত করা হয়েছে। 

বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা ও স্বাধীনতা আধুনিক গণতন্ত্রের প্রাণভোমরা। স্বাধীন বিচার বিভাগের দাবি এ অঞ্চলের অন্তত শতবর্ষের দাবি। বিএনপিও তাদের দলীয় ও নির্বাচনি ইশতেহারে স্বাধীন বিচার বিভাগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু ক্ষমতা গ্রহণের পর চিরাচরিত ওয়াদাভঙ্গের রাজনীতিই আমরা দেখলাম।

বিএনপির ৩১ দফার ১০ নং দফায় বিচার বিভাগের স্বাধীনতার উল্লেখ রয়েছে। পরিষ্কারভাবে বিএনপি জনগণকে অঙ্গীকার করেছিল ‘বিচার বিভাগের জন্য সুপ্রিম কোর্টের নিয়ন্ত্রণাধীন একটি পৃথক সচিবালয় থাকিবে।’ জুলাই সনদেও সুপ্রিম কোর্টের স্বতন্ত্র সচিবালয়ের ব্যাপারে বিএনপি নোট অব ডিসেন্ট ছাড়া একমত হয়েছিল। অথচ ক্ষমতায় এসে আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে গিয়ে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্ত করে দিয়েছে বিএনপি।

বাংলাদেশের অর্থনীতি অতিমাত্রায় ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে। বিশেষত আওয়ামী লীগ আমলে ব্যাংকিং খাতকে অবাধ লুটপাটের অভয়ারণ্যে পরিণত করা হয়েছিল। কিন্তু বিএনপি সরকার এই জরুরি সংস্কার থেকেও পিছু হটেছে।

মানবাধিকার কমিশন এবং গুম অধ্যাদেশ প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় ৬ শতাধিক দেশি-বিদেশি অংশীজনের মতামত নেওয়া হয়েছিল; যার মধ্যে জাতিসংঘের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং বিভিন্ন স্তরের নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা ছিলেন। এমন বিস্তৃত অংশগ্রহণ এবং সবার অন্তর্ভুক্তিতে খসড়া প্রণয়ন করার প্রক্রিয়াটি ছিল নজিরবিহীন। 

মুখে সরকার বলছে অধিকতর যাচাই-বাছাই, আরও আলোচনা করে আরও ভালো আইন তারা প্রণয়ন করবেন। অথচ মানবাধিকার কমিশন এবং গুম (প্রতিরোধ) কমিশনের বিরুদ্ধে সরকার যেসব আপত্তি প্রকাশ করেছে, সেগুলোই তাদের মূল অবস্থান। সেগুলো পড়লে দেখা যায় কোনোভাবেই তারা একটি স্বাধীন মানবাধিকার কমিশন এবং গুম কমিশন চান না। 

সরকার যে আপত্তিগুলো প্রকাশ করেছে, সেগুলোই হবে নতুন আইনের ভিত্তি। সেগুলো মানলে কোনোভাবেই শক্তিশালী মানবাধিকার ও গুম কমিশন গঠন সম্ভব হবে না। সরকারের আজ্ঞাবহ নখদন্তহীন দুটি কমিশন হবে। 

সরকারের আপত্তিগুলোর মধ্যে অন্যতম প্রধান দুটি আপত্তি : নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে তদন্ত করতে হলে সরকারের অনুমতি লাগবে এবং জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে আটককে গুম বলা যাবে না। এই দুটি আপত্তিতেই সরকারের মতলব পরিষ্কার হয়। 

এ ছাড়া মানবাধিকার কমিশন কোনো মন্ত্রণালয়ের অধীন নয়, এটার তদারকি কীভাবে হবে, বাছাই কমিটিতে সরকারের প্রতিনিধি যুক্ত করতে হবে- এগুলোও সরকারের আপত্তি। অর্থাৎ সরকার কমিশনগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। 

দুদক, নির্বাচন কমিশন, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়- এর কোনোটাই কোনো মন্ত্রণালয়ের অধীন নয়। তা হলে মানবাধিকার কমিশনকে কেন মিনিস্ট্রির অধীনে আসতে হবে? 

অধ্যাদেশে অন্তত ৪ স্তরের তদারকি নিশ্চিত করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতি, প্রধান বিচারপতি, মহাহিসাব নিরীক্ষক এবং নাগরিক সমাজ- এই চার ধাপের তদারকি নিশ্চিত করা হয়েছে যা অত্যন্ত শক্তিশালী তদারকি ব্যবস্থা নিশ্চিত করে। 

তবু চাইলে একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটির কাছে রিপোর্ট প্রদানের বাড়তি আরেক ধাপ যুক্ত করা যায়। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের অধীন নিতে চাওয়ার মানে হচ্ছে আরেকটি মিজানুর রহমান কমিশন।

৮ সদস্যবিশিষ্ট বাছাই কমিটিতে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, রাষ্ট্রপতির মনোনীত দুজন প্রতিনিধি, সরকারি দলের একজন সংসদ সদস্য রয়েছেন। রাষ্ট্রপতির প্রতিনিধি কার্যত সরকারি দলের প্রতিনিধি। অর্থাৎ ৮ সদস্যের বাছাই কমিটিতে ৪ জন (৫০%) রয়েছেন নির্বাহী বিভাগ-সংশ্লিষ্ট। সরকার এ সংক্রান্ত যে আইনের খসড়া অংশীজনদের সঙ্গে শেয়ার করেছে, সেগুলোর ভিত্তি হয়েছে এই আপত্তিগুলো। এই আপত্তিগুলো আমলে নিয়ে কোনো শক্তিশালী কমিশন গঠন সম্ভব নয়। 

পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দলীয় স্বার্থে জনগণের বিরুদ্ধে ব্যবহার করার নজির এ দেশে আছে। এটি রোধ করতে পুলিশ সংস্কার কমিশন গঠনের প্রস্তাব জুলাই সনদে ছিল। কিন্তু বিএনপি সরকার এই অধ্যাদেশটিও বাতিল করে দিয়েছে। এর ফলে পুলিশের আবারও পেশাদার বাহিনীর পরিবর্তে দলীয় বাহিনীতে পরিণত হওয়ার শঙ্কা দেখা দিচ্ছে। 

সব মিলিয়ে বাংলাদেশ এক অভূতপূর্ব ঐতিহাসিক মুহূর্ত পার করছে। এ সময় প্রয়োজন জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে সংস্কার বাস্তবায়ন করা। নিজেদের বিরোধী দলের আসনে কল্পনা করে বিএনপি সরকারের সংস্কার বাস্তবায়নে আন্তরিকতা দেখানো উচিত। কারণ কোনো ক্ষমতাই চিরস্থায়ী ক্ষমতা নয়। কোনো সরকারই শেষ সরকার নয়। কাজেই সংসদীয় গণতন্ত্রকে শক্তিশালীকরণের লক্ষ্যে প্রতিশ্রুত সংস্কার বাস্তবায়নের এখনই সময়। অন্যথায় সংসদীয় স্বৈরতন্ত্রের ঐতিহাসিক দায় বর্তমান সরকারকে নিতে হতে পারে।

লেখক : যুগ্ম আহ্বায়ক ও উপপ্রধান, সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটি, এনসিপি

সময়ের আলো/জেডআই


  বিষয়:   সংস্কার 


Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: