নারী ও শিশু নির্যাতন রাষ্ট্র রাজনীতি সমাজের দায়

শহীদুল্লাহ ফরায়জী

মতামত

আজ আমাদের সমাজে শিশু ও নারীর প্রতি যে নির্মমতা, নিষ্ঠুরতা ও পাশবিক সহিংসতার প্রকাশ ঘটছে, তা হঠাৎ করে সৃষ্টি হয়নি।

2026-05-25T01:27:25+00:00
2026-05-25T01:27:25+00:00
 
  সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬,
৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬
মতামত
নারী ও শিশু নির্যাতন রাষ্ট্র রাজনীতি সমাজের দায়
শহীদুল্লাহ ফরায়জী
প্রকাশ: সোমবার, ২৫ মে, ২০২৬, ১:২৭ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
আজ আমাদের সমাজে শিশু ও নারীর প্রতি যে নির্মমতা, নিষ্ঠুরতা ও পাশবিক সহিংসতার প্রকাশ ঘটছে, তা হঠাৎ করে সৃষ্টি হয়নি। দীর্ঘদিনের নৈতিক অবক্ষয়, বিচারহীনতার সংস্কৃতি, মানবিক শিক্ষার দুর্বলতা, সামাজিক দায়িত্বহীনতা এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের মধ্য দিয়েই এই ভয়ংকর বাস্তবতার জন্ম হয়েছে। যখন সমাজ অন্যায়কে স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে শেখে, যখন অপরাধী শাস্তির বদলে প্রভাবের আশ্রয়ে নিরাপদ থাকে, যখন মানুষ ধীরে ধীরে সহমর্মিতা হারিয়ে ফেলে, তখনই সভ্যতার আবরণ ভেদ করে পশুত্ব প্রকাশিত হয়। গণতন্ত্র মারা পড়ে মাঠে। আজ আমরা সেই ভয়াবহ বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছি।

একটি সভ্য রাষ্ট্রের নৈতিক মানদণ্ড নির্ধারিত হয় সে রাষ্ট্র কতটুকু তার নারী ও শিশুকে নিরাপত্তা দিতে পারে তার ওপর। যখন কোনো সমাজে নারী ও শিশু ধর্ষণ, নির্যাতন ও হত্যার শিকার হয়, তখন তা কেবল বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়, বরং তা রাষ্ট্রের নৈতিক ব্যর্থতা, সামাজিক অবক্ষয় এবং মানবিক চেতনার গভীর সংকটের বহিঃপ্রকাশ। এ ধরনের অপরাধ শুধু একজন ব্যক্তি বা পরিবারের ওপর আঘাত হানে না বরং সমগ্র সমাজের বিবেক, মূল্যবোধ ও সভ্যতার ভিত্তিকে আহত করে।

আইনের দুর্বল প্রয়োগ, বিচারহীনতার সংস্কৃতি, সামাজিক দায়িত্বহীনতা, পারিবারিক অবক্ষয় এবং নৈতিক শিক্ষার সংকট-
সব মিলিয়ে পরিস্থিতি আজ ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। কেবল কঠোর আইন প্রণয়ন করলেই এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। কারণ অপরাধের শিকড় শুধু আইনের দুর্বলতায় নয়, বরং মানুষের চেতনা, সমাজের মূল্যবোধ ও নৈতিক কাঠামোর ভাঙনের মধ্যেও নিহিত। তাই নারী ও শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার এবং ধর্মীয়-নৈতিক শিক্ষার সমন্বিত ও মানবিক ভূমিকা অপরিহার্য।

প্রথমত একটি ন্যায়ভিত্তিক ও নিরাপদ সমাজ গঠনে রাষ্ট্রের দায়িত্ব সর্বাগ্রে। রাষ্ট্রকে কেবল অপরাধ দমনের যন্ত্র হলে চলবে না বরং এমন একটি নিশ্ছিদ্র বিচারকাঠামো গড়ে তুলতে হবে, যেখানে নারী ও শিশু নির্যাতনের বিচার হবে দ্রুত, নিরপেক্ষ এবং দৃষ্টান্তমূলক। বিচারহীনতার সংস্কৃতি অপরাধের সবচেয়ে বড় জ্বালানি। যখন কোনো অপরাধী অর্থ, ক্ষমতা বা রাজনৈতিক আশ্রয়ে পার পেয়ে যায়, তখন অবক্ষয়িত সমাজব্যবস্থায় চরম নৈরাজ্যের জন্ম হয়। তাই বিচারহীনতার এই বৃত্ত ভাঙতে রাষ্ট্রকে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

এর জন্য প্রথম শর্ত হলো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, জেন্ডার-সংবেদনশীল, মানবিক ও জবাবদিহিমূলক হিসেবে গড়ে তোলা। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ও ফরেনসিক ব্যবস্থার সর্বোচ্চ ব্যবহারের মাধ্যমে অপরাধ তদন্তের গতি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি, যেন কোনো ভুক্তভোগী প্রাতিষ্ঠানিক জটিলতার শিকার না হন।

একই সঙ্গে রাষ্ট্রকে তার দীর্ঘমেয়াদি নীতিতে মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনের ওপর জোর দিতে হবে। শিক্ষাক্রম, গণমাধ্যম এবং জাতীয় সংস্কৃতি-নীতির আমূল সংস্কারের মাধ্যমে এমন এক সমাজ বিনির্মাণ করতে হবে, যেখানে নারীর প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, পারস্পরিক সহমর্মিতা এবং মানবিক মূল্যবোধের চর্চা হবে স্বতঃস্ফূর্ত। কারণ রাষ্ট্র কেবল শাস্তি দেওয়ার কর্তৃপক্ষ নয়; একটি নৈতিক, সাম্যবাদী ও মানবিক সমাজ নির্মাণের প্রধান পথপ্রদর্শক ও অভিভাবক।

দ্বিতীয়ত সমাজেরও গভীর ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। একটি সমাজ যদি অন্যায় দেখে নীরব থাকে, তবে সেই সমাজ ধীরে ধীরে অপরাধের নীরব সহযোগীতে পরিণত হয়। ধর্ষক, নির্যাতনকারী ও সহিংস মানসিকতার মানুষের বিরুদ্ধে সামাজিক ঘৃণা, নৈতিক প্রতিরোধ ও বয়কটের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে নারীর প্রতি অসম্মান, কুরুচিপূর্ণ ভাষা, অনলাইন হয়রানি কিংবা শিশুর প্রতি অবহেলাকেও সামাজিক অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। কারণ বড় অপরাধ হঠাৎ করে জন্ম নেয় না, তা দীর্ঘদিনের ছোট ছোট নৈতিক বিচ্যুতি, অসংবেদনশীলতা ও নীরব সমর্থনের মধ্য দিয়েই বিকশিত হয়।

পাশাপাশি এই সামাজিক প্রতিরোধের অংশ হিসেবে আমাদের পারিবারিক মূল্যবোধের চর্চা বাড়াতে হবে, যেন শৈশব থেকেই সন্তানরা অপরকে শ্রদ্ধা করতে শেখে। একই সঙ্গে গণমাধ্যমে সহিংসতাকে স্বাভাবিকভাবে দেখানো এবং অপরাধের পর ভুক্তভোগীকে দোষারোপ করার কুৎসিত সামাজিক মানসিকতাও কঠোরভাবে বন্ধ করতে হবে।

তৃতীয়ত পরিবারের ভূমিকা সবচেয়ে গভীর, মৌলিক ও দীর্ঘমেয়াদি। একটি শিশুর প্রথম বিদ্যালয় তার পরিবার, আর প্রথম শিক্ষক তার মা-বাবা। পরিবার যদি সন্তানকে মানবিকতা, সহমর্মিতা, আত্মসংযম এবং অন্যের মর্যাদার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ শেখাতে ব্যর্থ হয়, তবে কেবল আইন ও শাস্তি দিয়ে সমাজকে নিরাপদ করা সম্ভব নয়। আজ অনেক পরিবারে অর্থনৈতিক সাফল্য ও প্রতিযোগিতামূলক অর্জনকে নৈতিক শিক্ষার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। অথচ নৈতিকতাহীন শিক্ষা ও চরিত্রহীন সাফল্য সমাজের জন্য ভয়ংকর বিপদের কারণ হতে পারে। সন্তানকে কেবল সফল মানুষ নয়, বিবেকবান ও নৈতিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাই পরিবার ও অভিভাবকের প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত।

চতুর্থত ধর্মীয় অনুশাসন ও নৈতিক বিধিবিধানের গুরুত্ব অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। প্রকৃত ধর্ম মানুষকে সংযম, দায়িত্ববোধ, লজ্জাবোধ, মানবিকতা এবং অন্যের মর্যাদার প্রতি শ্রদ্ধা করতে শেখায়। ধর্মীয় শিক্ষা যদি কেবল আচার-অনুষ্ঠান ও বাহ্যিক অনুশীলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে এবং নৈতিক চরিত্র গঠনে ব্যর্থ হয়, তবে তার সামাজিক প্রভাব ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে। মসজিদ, মন্দির, গির্জা কিংবা অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে কেবল উপাসনার স্থান নয়, মানবিক ও নৈতিক চেতনা গঠনের কেন্দ্র হিসেবেও ভূমিকা পালন করতে হবে। ধর্মকে বিভাজন, বিদ্বেষ কিংবা সংকীর্ণতার হাতিয়ার নয়, বরং মানবিকতা, সহমর্মিতা ও নৈতিক জাগরণের শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

তবে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে বলা জরুরি- নারী ও শিশুর নিরাপত্তার দায় কখনোই ভুক্তভোগীর ওপর চাপানো যায় না। পোশাক, চলাফেরা বা সামাজিক অবস্থানকে অজুহাত বানিয়ে অপরাধকে আড়াল করার প্রবণতা নৈতিকভাবে ঘৃণ্য। অপরাধের সম্পূর্ণ দায় অপরাধীর। সভ্য সমাজের কাজ হলো ভুক্তভোগীকে দোষারোপ নয় বরং তাকে নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার ও মর্যাদা নিশ্চিত করা।

নারী ও শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে লড়াই কেবল আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন নয়, এটি একটি সভ্যতা রক্ষার সংগ্রাম। রাষ্ট্র যদি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে, সমাজ যদি অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, পরিবার যদি নৈতিক মানুষ গড়ে তোলে এবং ধর্ম যদি মানবিকতার আলো ছড়ায়, তবেই একটি নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠা সম্ভব। অন্যথায় কেবল কাঠামোগত বা প্রযুক্তিগত উন্নয়ন সত্ত্বেও আমরা নৈতিকভাবে এক অন্ধকার সময়ের দিকেই ধাবিত হব। আর এই অন্ধকার রুখে দেওয়াই আজ আমাদের সভ্যতার সবচেয়ে মৌলিক পরীক্ষা।

লেখক : গীতিকবি ও সমাজ বিশ্লেষক

/এসএকে


  বিষয়:   নারী  শিশু  নির্যাতন  রাষ্ট্র  রাজনীতি  সমাজ  দায় 


Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: