যতই দিন যাচ্ছে আরও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে হামের প্রাদুর্ভাব। একই সঙ্গে বাড়ছে মৃত্যু ও আক্রান্তের সংখ্যা। রোগীর চাপে হাসপাতালগুলো চিকিৎসা দিতে হিমশিম খাচ্ছে। সবশেষ গতকাল রোববার দেশে আরও ১৬ শিশু মারা গেছে; যা এক দিনে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মৃত্যু। সারা দেশে হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ৪৩৪ জন। এ পর্যন্ত মোট মৃত্যু ৫২৮ শিশুর।
চলতি বছর বিশ্বে এটি হামে সর্বোচ্চ মৃত্যুর ঘটনা। এ বছর বাংলাদেশ হামে মৃত্যুর শীর্ষে। একই সময়কালে হাম ও উপসর্গে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মৃত্যু হয়েছে সুদানে। সেখানে মারা গেছে ৩৭১ জন। মৃত্যুতে তৃতীয় অবস্থানে আছে পাকিস্তান। দেশটিতে হামে অন্তত ৭১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সতর্ক করে বলেছে, টিকাদানের হার কমে যাওয়ায় বিশ্বের কিছু অঞ্চলে হামের পুনরুত্থান দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশে হামের এ নতুন প্রাদুর্ভাব সবচেয়ে প্রাণঘাতী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বাংলাদেশ ছাড়াও ২০২৬ সালে ভারত, পাকিস্তান, ইয়েমেন, মেক্সিকো, অ্যাঙ্গোলা, কাজাখস্তান, ইন্দোনেশিয়া, সুদান ও ক্যামেরুনসহ বহু দেশে নতুন করে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে।
হাম অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী একজন আক্রান্ত ব্যক্তি গড়ে ১২ থেকে ১৮ জনকে সংক্রমিত করতে পারে। সাধারণত ৯৫ শতাংশের বেশি শিশুকে টিকার আওতায় আনতে না পারলে প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকি তৈরি হয়। চিকিৎসকরা বলছেন, টিকা থেকে বাদ পড়া শিশুর সংখ্যা কয়েক বছর ধরে জমতে জমতেই এবার বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব তৈরি হয়েছে।
গত জানুয়ারিতে বাংলাদেশে রাজশাহী অঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় হামের প্রাদুর্ভাব শুরু হয়। প্রথমদিকে রাজশাহী ও পার্শ্ববর্তী চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা থেকে হামে আক্রান্ত ও উপসর্গ নিয়ে শিশুরা আসতে শুরু করে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।
ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চের তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অজ্ঞাত রোগে ৩৩ শিশুর মৃত্যুর বিষয়টি জানাজানি হলে হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ে তোলপাড় শুরু হয় সারা দেশে। তবে সে সময় অনেক শিশুর মৃত্যুর কারণ হাম নয় বলে জানিয়েছিলেন চিকিৎসকরা।
তবে রাজশাহী বিভাগের স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের মতে, প্রথমে হামের প্রাদুর্ভাব ঘটে চাঁপাইনবাবগঞ্জের সীমান্তবর্তী শিবগঞ্জ ও গোমস্তাপুর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে। এই জেলায় হামে শিশু মৃত্যু বেশি।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল রোববার ঢাকা বিভাগে হামের উপসর্গে ১০ শিশু, রাজশাহী, সিলেট, বরিশাল এবং রংপুরে ১ জন করে এবং ময়মনসিংহ বিভাগে ২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত দেশজুড়ে মোট ৬৩ হাজার ৮১৩ শিশুর শরীরে হামের উপসর্গ দেখা গেছে। আক্রান্তদের মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হয় ৫০ হাজার ৫৫৮ শিশু। হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার পর এ পর্যন্ত সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৪৬ হাজার ২১৪ শিশু। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে বাকি শিশুরা চিকিৎসাধীন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে ঘাটতি, অপুষ্টি, দেরিতে হাসপাতালে আনা এবং জেলা পর্যায়ে চিকিৎসা অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, হামে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে ৫ থেকে ৮ শতাংশের নিউমোনিয়া হয়। তবে গুরুতর শ্বাসতন্ত্রজনিত জটিলতা দেখা দিলে মৃত্যুহার ৮০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। বিশেষ করে অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি।
নিউমোনিয়া শুধু ফুসফুসে সীমাবদ্ধ থাকে না; অনেক ক্ষেত্রে তা মস্তিষ্ক ও শরীরের অন্যান্য অঙ্গেও প্রভাব ফেলে।
চিকিৎসকরা বলছেন, বাস্তবে অনেক পরিবার প্রথম দিকে হামকে সাধারণ জ্বর বা ভাইরাল সংক্রমণ ভেবে বাড়িতে চিকিৎসা করায়। ফলে যখন হাসপাতালে আনা হয়, তখন অনেক শিশুর শরীরে নিউমোনিয়া, অক্সিজেন সংকট কিংবা সেপসিস তৈরি হয়ে যায়। চিকিৎসকরা শিশুদের সুরক্ষায় দ্রুত হামের টিকা নিশ্চিত করার এবং কোনো লক্ষণ দেখা দিলে অবিলম্বে নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যোগাযোগ করার পরামর্শ দিয়েছেন। হামে আক্রান্ত শিশুর জন্য দ্রুত অক্সিজেন, ভিটামিন এ, তরল ব্যবস্থাপনা ও নিউমোনিয়ার চিকিৎসা নিশ্চিত করা না গেলে মৃত্যুঝুঁকি বেড়ে যায়।
গত কয়েক দিনে জ্যামিতিক হারে হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। ঢাকার হাসপাতালের বিশেষায়িত হাম ওয়ার্ডে নির্ধারিত শয্যার সবই পরিপূর্ণ। ভর্তি হওয়া অধিকাংশ শিশুর বয়স এক বছরের কম। এসব ছোট ছোট শিশুদের কারও কারও সারা শরীরে ছোপ ছোপ দাগ ও ফুসকুড়ি। শরীরে চলছে স্যালাইন, কারও নাকে নল আবার কোনো কোনো শিশুর মুখে অক্সিজেন লাগানো।
এমনকি অনেক শিশুর মাথার অর্ধেক চুল ফেলে দিতে হয়েছে ক্যানুলা করার জন্য। প্রচণ্ড জ্বর আর ব্যথায় অনবরত কেঁদেই যাচ্ছেন শিশুরা। পাশেই বসা তাদের মা-বাবা কিংবা স্বজনদের দুই চোখ টলমল করছে। এর মধ্যেও কখনো সন্তানের মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দিচ্ছেন, কখনো সন্তানের শরীর ভেজা কাপড় দিয়ে মূছে দিচ্ছেন। কখনো ওষুধ খাওয়াচ্ছেন। মাঝেমধ্যে নার্সদেরও ডেকে এনে সন্তানের সমস্যার কথা শোনাচ্ছেন। আর সন্তানের যন্ত্রণাকাতর মুখচ্ছবি দেখে নীরবে লড়াই করছেন অভিভাবকরা।
ঢাকার বাইরে পরিস্থিতি আরও নাজুক। স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ঢাকার বাইরের অনেক জেলা ও উপজেলা হাসপাতালে শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত আইসিইউ, অক্সিজেন সাপোর্ট বা প্রশিক্ষিত জনবল নেই। ফলে জটিল অবস্থার শিশুকে দ্রুত ঢাকায় পাঠানো হচ্ছে। এতে সময় নষ্ট হচ্ছে এবং অনেক শিশুর অবস্থার অবনতি ঘটছে পথেই। মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল, ডিএনসিসি কোভিড হাসপাতাল, বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রতিদিন বাড়ছে রোগীর চাপ। কোথাও শয্যা নেই, কোথাও আইসিইউ সংকট।
সুস্থ হওয়ার তুলনায় আক্রান্ত হওয়া রোগীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় প্রতি মুহূর্তেই চাপ বাড়ছে হাসপাতালে। প্রতিনিয়তই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রোগীরা ছুটে আসছেন। কিন্তু বিশেষায়িত ওয়ার্ডে একদিকে সিটের সংখ্যা যেমন কম, অন্যদিকে আইসিইউতেও সিট সংখ্যা কম। ফলে নতুন করে হামের প্রাদুর্ভাব এবং নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়াসহ নানা রোগের চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হবে চিকিৎসক এবং নার্সদের।
তিন দশকে সর্বোচ্চ শিশু হামে মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধান করতে পারেনি স্বাস্থ্য বিভাগ। তবে গত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় হামের টিকাদানে গাফেলতি এবার হামের এই মারাত্মক প্রাদুর্ভাবের কারণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ইউনিসেফ বলছে, সংস্থাটি অন্তর্বর্তী সরকারের সময় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে লেখা অন্তত পাঁচটি চিঠিতে সম্ভাব্য টিকা সংকটের কথা বলে সতর্ক করেছিল। তারা ১০টি মিটিংয়ে সরকারের কর্মকর্তাদের কাছে একই কথা জানিয়েছিল। ইউনিসেফ মনে করে, অন্তর্বর্তী সরকার টিকা ক্রয় প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনায় দেশে সময়মতো টিকা আসেনি।
দেরিতে হাসপাতালে আসায় বাড়ছে মৃত্যুঝুঁকি উল্লেখ করে শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. আবিদ হোসেন মোল্লা বলেন, হাম অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। হাম শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমিয়ে দেয়। ফলে আক্রান্ত শিশুকে দেরিতে হাসপাতালে আনলে জটিলতা দ্রুত বাড়ে। শ্বাসকষ্ট, উচ্চ জ্বর বা অক্সিজেনের মাত্রা কমে গেলে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা জরুরি।
/এসএকে