ঈদ মানেই অন্যরকম এক আনন্দ। সকাল থেকে ঘরজুড়ে ব্যস্ততা, রান্নাঘরে মসলার ঘ্রাণ, আত্মীয়স্বজনের আনাগোনা, কুরবানির মাংসের স্বাদ নেওয়ার ধুম, প্রিয় মানুষদের সঙ্গে এক টেবিলে বসে খাওয়া- সব মিলিয়ে ঈদের অনুভূতিটাই আলাদা।
বিশেষ করে কুরবানির ঈদে খাবারের আয়োজন যেন আরও বেশি জমে ওঠে। গরুর মাংসের ভুনা, কোরমা, রেজালা, কাবাব, কালাভুনা, বিরিয়ানি প্রতিটি খাবারের সঙ্গেই জড়িয়ে থাকে পরিবার, স্মৃতি আর আনন্দ।
আর সত্যি বলতে, এই কয়েকটা দিনে ‘ডায়েট’ বা ‘ক্যালরি’ শব্দগুলো অনেকেই ভুলে যেতে চান। এটিও খুব স্বাভাবিক। কারণ উৎসব মানেই তো একটু বিশেষ খাবার, একটু বাড়তি আনন্দ।
কিন্তু একজন পুষ্টিবিদ হিসেবে আমি প্রায়ই একটা বিষয় লক্ষ্য করি- ঈদের ২-৩ দিন পর থেকেই অনেকের কিছু সাধারণ অভিযোগ শুরু হয়। কেউ বলেন পেট ভার লাগছে, কারও গ্যাস হচ্ছে, কেউ বলছেন মাথা ধরছে, শরীর অস্বস্তি লাগছে, আবার কেউ হঠাৎ ওজন বেড়ে যাওয়া নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ছেন।
এর কারণ কিন্তু খুব অস্বাভাবিক কিছু না। আমাদের শরীর প্রতিদিন যে ধরনের খাবারে অভ্যস্ত, ঈদের সময় হঠাৎ করে তার চেয়ে অনেক বেশি তৈলাক্ত, ঝাল, চর্বি ও অতিরিক্ত ক্যালরি যুক্ত খাবার খাওয়া হয়ে যায়। সঙ্গে অনিয়মিত ঘুম, পানি কম খাওয়া, শারীরিক পরিশ্রম কমে যাওয়া সব মিলিয়ে শরীরের ওপর একটা অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়।
তার মানে কি ঈদের খাবার খাওয়া যাবে না? অবশ্যই যাবে। ঈদের আনন্দ উপভোগ করতেই হবে। তবে একটু ব্যালেন্স রেখে খেলে শরীরও ভালো থাকবে। আবার খাবারের আনন্দও কমবে না। কারণ স্বাস্থ্যকর খাবার মানে নিজেকে বঞ্চিত করা নয়, বরং সচেতনভাবে উপভোগ করা।
অতিরিক্ত প্রোটিন ও ক্যালরিযুক্ত খাবার শরীরে কী ধরনের সমস্যা তৈরি করতে পারে- হজমের সমস্যা : একসঙ্গে অনেক বেশি মাংস, তেল-মসলা ও ভারী খাবার খেলে পাকস্থলীর ওপর চাপ বেড়ে যায়। ফলে গ্যাস, পেট ফাঁপা, বদহজম, অস্বস্তি, বমিভাব এ রকম সমস্যা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে দীর্ঘ সময় না খেয়ে হঠাৎ অতিরিক্ত খাবার খেলে সমস্যা আরও বেশি হয়।
গ্যাসের সমস্যা : খুব বেশি মসলাদার খাবার গ্যাসের সমস্যা বাড়িয়ে দেয়। ফলে বুক জ্বালাপোড়া, টক ঢেঁকুর, অ্যাসিডিটি, গ্যাস্ট্রিকের ব্যথা দেখা দিতে পারে।
শরীরে অতিরিক্ত ক্লান্তি ও অস্বস্তি : অনেকেই ভাবেন বেশি খেলে শরীরে শক্তি বাড়বে। কিন্তু বাস্তবে অতিরিক্ত ভারী খাবার শরীরকে দুর্বল করে দিতে পারে। কারণ হজমের জন্য শরীরকে অনেক বেশি কাজ করতে হয়। ফলে ঘুম ঘুম ভাব, শরীর ভার লাগা, অলসতা, ক্লান্তি অনুভূত হতে পারে।
ওজন বৃদ্ধি : ঈদের সময় বিরিয়ানি, কোরমা, কোল্ড ড্রিংকস, মিষ্টি, চর্বিযুক্ত মাংস- এসব খাবার খুব সহজেই ক্যালরি গ্রহণ বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু শারীরিক কার্যকলাপ কমে গেলে সেই অতিরিক্ত ক্যালরি শরীরে চর্বি হিসেবে জমা হতে শুরু করে।
কোলেস্টেরল ও হার্টের ওপর চাপ
অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত মাংস দীর্ঘ সময় খেলে- কোলেস্টেরল বাড়তে পারে, রক্তচাপ বেড়ে যেতে পারে, হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। বিশেষ করে যাদের ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা স্থূলতা আছে, তাদের আরও সচেতন থাকা জরুরি।
পানিশূন্যতা
ঈদের ব্যস্ততায় অনেকেই পানি কম খান। কিন্তু লবণাক্ত ও প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার বেশি খাওয়ার কারণে শরীরের পানির চাহিদা বেড়ে যায়। ফলে মাথা ব্যথা, দুর্বলতা, পানিশূন্যতা, কোষ্ঠকাঠিন্য হতে পারে। তা হলে কীভাবে খাবারকে ব্যালেন্স করা যায়?
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
সব খাবার খেতে হবে, কিন্তু একবারে অতিরিক্ত না। একটু একটু করে, ধীরে ধীরে খেলে- হজম ভালো হয়, অতিরিক্ত খাওয়া কম হয় এবং শরীরও আরামদায়ক থাকে।
প্লেটে ব্যালেন্স রাখুন
শুধু মাংস দিয়ে প্লেট ভর্তি না করে সঙ্গে রাখুন- সালাদ, শাকসবজি, ডাল, আঁশসমৃদ্ধ খাবার, এগুলো হজম ভালো রাখতে সাহায্য করে।
চর্বি কম খান
মাংসের চর্বি ও অতিরিক্ত তেল যতটা সম্ভব কমিয়ে খাওয়ার চেষ্টা করুন। বিশেষ করে ঝোলের ওপরের তেল, অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত অংশ এড়িয়ে চলা ভালো।
পানি বেশি পান করুন
দিনে অন্তত ৮-১০ গ্লাস পানি খাওয়ার চেষ্টা করুন। কোল্ড ড্রিংক্সের পরিবর্তে লেবুর শরবত, ডাবের পানি, ঘরে তৈরি শরবত ভালো।
হাঁটাহাঁটি করুন
খাওয়ার পর সারা দিন শুয়ে না থেকে হালকা হাঁটলে হজম ভালো হয়।
সকালের খাবার বাদ দেবেন না
অনেকেই সকালে না খেয়ে দুপুরে বেশি খাবার খান। এতে শরীরের ওপর চাপ বেড়ে যায়। তাই দিনের শুরুতে ডিম, ফল, ওটস, হালকা খাবার রাখা ভালো। ঈদের আনন্দ কখনোই খাবার ছাড়া পূর্ণ হয় না। তাই প্রিয় খাবার খাওয়া নিয়েও অপরাধবোধের কিছু নেই।
তবে শরীরেরও একটা সীমা আছে- সেটি বুঝে খাওয়াটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। মনে রাখতে হবে, উৎসবের আসল সৌন্দর্য শুধু বেশি খাওয়ায় নয়, বরং সুস্থ থেকে প্রিয় মানুষদের সঙ্গে সময় উপভোগ করার মধ্যে। তাই ঈদে খাবার উপভোগ করুন, কিন্তু নিজের শরীরের প্রতিও একটু যত্নশীল হোন।
লেখক : পুষ্টিবিদ
/এসএকে