পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে ঝালকাঠির বিভিন্ন এলাকায় জমে উঠছে কুরবানির পশুর হাট। জেলার সদর উপজেলা, নলছিটি, রাজাপুর ও কাঁঠালিয়ায় এবছর অর্ধশতাধিক স্থানে বসেছে কোরবানির পশুরহাট। গত কয়েকদিন তেমন বেচা-কেনা না হলেও রোববার (২৪ মে) থেকে হাটে অনেক ক্রেতার উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে।
সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত পশু কেনাবেচায় ব্যস্ত সময় পার করছেন ব্যবসায়ী ও খামারিরা। ঈদ যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে হাটের প্রাণচাঞ্চল্য। জেলার সব চেয়ে বড় পশুরহাট বসেছে ঝালকাঠির সুগন্দিয়া, জেলা শহরের গুরুদাম, বিকনা, গাবখান, বাউকাঠি, নলছিটির চায়না মাঠ ও রাজাপুরের বাঘরি এলাকায়। এসব হাটে পর্যাপ্ত গরু, ছাগল ও মহিষ নিয়ে উঠছে বিক্রেতারা। কয়েকদিন বেচাকেনা খুবই কম থাকলেও রোববার থেকে পুরোদমে জমে উঠেছে কুরবানির পশু বিক্রির হাট।
বাজারগুলোতে স্থানীয় খামারের বিষমুক্ত গরুর সমাহার। বিক্রেতাদের দাবী, প্রাকৃতিক উপায়ে ভাতের মার, খৈল, ভুষি, খড়-কুটো, কাঁচা ঘাস খাইয়ে মোটাতাজা করা হয়েছে। দেশীয় গরুর এসব হাট ঘুরে দেখা গেছে, ছোট ও মাঝারি আকারের গরুর প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ সবচেয়ে বেশি। অনেকেই আগেভাগেই পশু কিনে রাখছেন, যাতে শেষ মুহূর্তের ভিড় ও অতিরিক্ত দামের চাপ এড়ানো যায়। বিশেষ করে দেশীয় জাতের গরুর চাহিদা এবার তুলনামূলক বেশি দেখা যাচ্ছে।
স্থানীয় খামারিরা কয়েক মাস ধরে গরু মোটাতাজাকরণ ও পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করেছেন। এখন সেই পশু বিক্রি করে লাভের আশায় রয়েছেন তারা। ঝালকাঠি পৌর এলাকার এক হাটে কথা হয় খামারি মো. বাদশা হাওলাদারের সঙ্গে। তিনি জানান, গত কয়েক মাস ধরে গরু পালন করতে অনেক খরচ হয়েছে। গো-খাদ্য, ভুসি, খৈল ও ওষুধের দাম বেড়ে যাওয়ায় খরচ আগের তুলনায় অনেক বেশি। তাই একটু বেশি দামে বিক্রি না করলে লাভ থাকবে না।
অন্যদিকে ক্রেতাদের অভিযোগ, গত বছরের তুলনায় এবার পশুর দাম অনেকটাই বেশি। বিশেষ করে মাঝারি আকারের গরুতেও চড়া দাম হাঁকা হচ্ছে। সদর উপজেলার বাসিন্দা শওকত হোসেন বলেন, একটি ভালো মানের গরু কিনতে গিয়ে বিপাকে পড়তে হচ্ছে। বিক্রেতারা অনেক বেশি দাম চাইছেন। তারপরও ধর্মীয় দায়িত্ব পালনের জন্য কিনতেই হবে।
এদিকে পশুর হাটকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বাড়ানো হয়েছে নজরদারি। হাট এলাকায় পুলিশ ও আনসার সদস্যদের টহল জোরদার করা হয়েছে। জাল টাকা শনাক্তকরণ, চুরি-ছিনতাই প্রতিরোধ এবং যানজট নিরসনে কাজ করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্যমতে, এ বছর জেলায় কোরবানির পশুর চাহিদা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩০ হাজার ২৩৪টি। বিপরীতে খামারিদের কাছে প্রস্তুত রয়েছে ৩০ হাজার ৫৮৮টি পশু। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় ৩৫৪টি পশু বেশি রয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জেলায় মোট খামারের সংখ্যা ১হাজার ৫৩৫টি। এর মধ্যে ১৬৩টি নিবন্ধিত এবং ১হাজার ৩৭২টি অনিবন্ধিত।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. নীরোদ বরণ জয়ধর বলেন, ‘ঝালকাঠিতে দেশি গরু পালনে নীরব বিপ্লব ঘটেছে। খামারিরা বৈজ্ঞানিক ও প্রাকৃতিক উপায়ে পশু হৃষ্টপুষ্ট করছেন। জেলার ১ হাজার ৫৩৫টি খামার নিয়মিত পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। কোরবানি উপলক্ষে পশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম মাঠে কাজ করছে।’
জেলায় প্রস্তুত থাকা ৩০ হাজার ৫৮৮টি পশুর মধ্যে রয়েছে ৯ হাজার ৮০৮টি ষাঁড়, ৮ হাজার ৮৭০টি বলদ, ১ হাজার ৭৭৪টি গাভি, ১৩৯টি মহিষ, ৯ হাজার ৯৬৫টি ছাগল এবং ৩২টি ভেড়া। শেষ তিন দিনে কেনা-বেচা কয়েকগুণ বেড়ে যাবে বলে মনে করছেন খামারী ও ব্যবসায়ীরা।
অপরদিকে, ঝালকাঠি সদর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী সুগন্ধিয়া বাজারে কুরবানির পশু বেচা-কেনা শেষে গলাকাটা ইজারা মূল্য রাখা হচ্ছে বলে ক্রেতাদের অভিযোগ রয়েছে। এটিকে ক্রেতারা ইতিহাসের সবচেয়ে নজিরবিহীন চাঁদাবাজি বলেও আখ্যায়িত করেছেন।
ক্ষুব্ধ ক্রেতারা জানান, সরকার প্রতিটি গরু প্রতি একশ’ টাকা নির্ধারণ করা হলেও হাট ইজারাদাররা নিচ্ছে পাঁচশ’ টাকা। খামারী ও ব্যবসায়ীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, বাড়তি টোল আদায়সহ গরু বাঁধার আড়াইল প্রতি নেওয়া হচ্ছে পাঁচহাজার থেকে থেকে সাতহাজার টাকা পর্যন্ত। যা বাঁশের দাম ও লেবারের টাকা হিসেবে নিচ্ছেন ইজারাদার। এমনকি ভিতরের বাগানের গাছের সাথে কেউ গরু বাঁধলেও তার কাছ থেকেও নেওয়া হচ্ছে টাকা। দূর দূরান্ত থেকে গরু নিয়ে এসে বিক্রেতারা পড়ছে মহাবিপদে।
এনিয়ে সাধারণ গরু বিক্রেতাদের মাঝে প্রতিক্রিয়া বিরাজ করছে। এমন গলাকাটা ফি আদায় সুগন্ধিয়া বাজারের ইতিহাসে কখনো ঘটেনি বলেও জানান স্থানীয়রা।
এ বিষয়ে ইজারাদার শাহাদাত হোসেন অপু’র সাথে কথা বলতে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তার কাছ থেকে নেয়া মোবাইল নম্বরে কল দিলে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়।
সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সেগুফতা মেহনাজ বলেন, আমাদের কাছে কেউ লিখিত অভিযোগ দেয়নি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।
সময়ের আলো/জেডি