পশ্চিমবঙ্গে সম্প্রতি ক্ষমতাসীন হওয়া বিজেপি সরকারের কঠোর ‘পশু জবাই-নীতি’ ও অবৈধ পশুর হাট বন্ধের সিদ্ধান্তের কারণে আসন্ন ঈদুল আজহার মুখে রাজ্যজুড়ে এক বিশাল অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় সংকট তৈরি হয়েছে।
নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ১৯৫০ সালের প্রাচীন প্রাণিসম্পদ আইন কঠোরভাবে মেনে চলার নির্দেশ দেওয়ায় রাজ্যটিতে কোরবানির গরু বেচাকেনায় বড় ধরনের ধস নেমেছে। এই আইনের কারণে ১৪ বছরের কম বয়সী সুস্থ গবাদি পশু জবাই নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যা শরিয়তের সুস্থ ও নিখুঁত পশু কোরবানির বিধানের সাথে সাংঘর্ষিক।
নতুন এই সরকারি নির্দেশিকার ফলে পশ্চিমবঙ্গের গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক বড় ধাক্কা লেগেছে। রাজ্যে প্রায় ৩০ শতাংশ মুসলিম জনসংখ্যা থাকায় প্রতিবছর কোরবানিকে কেন্দ্র করে প্রায় দুই থেকে চার হাজার কোটি রুপির বিশাল বাণিজ্য গড়ে উঠত। তবে সবচেয়ে বড় বিপদে পড়েছেন রাজ্যের সংখ্যাগুরু হিন্দু ঘোষ বা গোপালক সম্প্রদায়ের লাখ লাখ খামারি ও দুধ ব্যবসায়ী।
তারা ব্যাংক বা সোনা বন্ধক রেখে ঋণ নিয়ে সারা বছর কম দামে গরু কিনে কোরবানির হাটে বেশি দামে বিক্রির উদ্দেশ্যে লালন-পালন করতেন। এখন মুসলিম ক্রেতারা আইনি জটিলতা ও প্রশাসনের হয়রানির ভয়ে গরু কেনা বন্ধ করে দেওয়ায় এবং অগ্রিম নেওয়া টাকা ফেরত চাওয়ায় চরম দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছেন এই হিন্দু ব্যবসায়ীরা।
পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করায় এবং সরকারের সাথে অপ্রীতিকর ঝামেলা এড়াতে পশ্চিমবঙ্গের শীর্ষ মুসলিম ধর্মীয় নেতারা এবার মুসলমানদের গরু কোরবানি না করার পরামর্শ দিচ্ছেন। কলকাতার ঐতিহাসিক নাখোদা মসজিদের ইমাম মোহাম্মদ শফিক কাসেমি এক ভিডিও বার্তায় মুসলিমদের এবার গরুর মাংস না খাওয়ার ও কোরবানি না দেওয়ার অনুরোধ করেছেন।
হুগলি ফুরফুরা শরিফের পীরজাদা ত্বহা সিদ্দিকীও মুসলিমদের গরু কোরবানি থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের মতে, মুসলিমরা গরু কেনা বন্ধ করলে আখেরে হিন্দু খামারিরাই সবচেয়ে বেশি অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন, যা সরকারকে এই আত্মঘাতী নীতি পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করবে।
আইন অনুসারে, কেবল ১৪ বছরের বেশি বয়সী বা প্রজননে অক্ষম এবং বিকলাঙ্গ পশু স্থানীয় প্রশাসনের লিখিত অনুমতি নিয়ে নির্দিষ্ট সরকারি কসাইখানায় জবাই করা যাবে। খোলা জায়গায় কোনো পশু জবাই করা যাবে না। এর প্রতিবাদে কলকাতার মুসলিম-অধ্যুষিত মেটিয়াবুরুজ এলাকায় ‘কোরবানিতে গরু কাটা বয়কট, আইন সবার ঊর্ধ্বে’ ব্যানার নিয়ে মিছিল হয়েছে।
তবে এর বিপরীতে আম-জনতা উন্নয়ন পার্টির প্রধান ও বিধায়ক হুমায়ুন কবীর সরকারকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন যে রাজ্যে গরু-ছাগল কোরবানি হবেই। অন্যদিকে ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্টের (আইএসএফ) প্রধান নওশাদ সিদ্দিকী শুভেন্দু সরকারকে বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন।
এই নতুন সরকারি নীতির ফলে শুধু গরু ব্যবসাই নয়, বরং পশুর খাদ্য, চামড়া শিল্প এবং ছুরি-বটি তৈরির সাথে যুক্ত আরও কয়েক লাখ দরিদ্র পরিবারের রুটি-রুজি এখন গভীর সংকটে পড়েছে।
সাধারণ মানুষ ও সংবাদ বিশ্লেষকেরা এই আইন নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও কটাক্ষ প্রকাশ করে বলছেন, বিজেপি সরকার মূলত মুসলমানদের ‘টাইট’ দিতে গিয়ে নিজেদের ভোটব্যাংক তথা হিন্দু খামারিদেরই চরম বিপদে ফেলে দিয়েছে। বিশ্ববাজারে গরুর মাংস রপ্তানিতে ভারতের অবস্থান দ্বিতীয় হলেও, নিজস্ব রাজ্যে সাধারণ মানুষকে এভাবে অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় প্রতিবন্ধকতার মুখে ফেলায় ক্ষোভ দিন দিন বাড়ছে।
সূত্র: আনন্দবাজার
সময়ের আলো/টিএইচ