মর্গেই থামল ঈদযাত্রা

টাঙ্গাইল প্রতিনিধি

জাতীয়

ঈদের আনন্দে স্বজনদের কাছে ফেরার অপেক্ষায় ছিলেন তারা। কেউ মেয়ের জন্য খেলনা কিনেছিলেন, কেউ স্ত্রী-সন্তানের জন্য নিয়ে যাচ্ছিলেন ঈদের উপহার।

2026-05-26T00:29:25+00:00
2026-05-26T00:29:25+00:00
 
  মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট ২০২৬,
১০ ভাদ্র ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট ২০২৬
জাতীয়
মর্গেই থামল ঈদযাত্রা
টাঙ্গাইল প্রতিনিধি
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৬ মে, ২০২৬, ১২:২৯ এএম 
সংগৃহীত ছবি
ঈদের আনন্দে স্বজনদের কাছে ফেরার অপেক্ষায় ছিলেন তারা। কেউ মেয়ের জন্য খেলনা কিনেছিলেন, কেউ স্ত্রী-সন্তানের জন্য নিয়ে যাচ্ছিলেন ঈদের উপহার। জীবিকার তাগিদে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত ঘুরে ফেরি করে ব্যবসা করা এসব মানুষ কম খরচে বাড়ি ফেরার আশায় রডবোঝাই একটি ট্রাকে উঠেছিলেন। কিন্তু যমুনা সেতুর পূর্ব প্রান্তে ভোরের অন্ধকারে সেই যাত্রাই পরিণত হয় মৃত্যুফাঁদে। ট্রাক উল্টে ঘটনাস্থলেই ঝরে যায় ১৫টি প্রাণ। আহত হন আরও অনেকে। যে মানুষগুলো কয়েক ঘণ্টা পরই পরিবারের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করার স্বপ্ন দেখছিলেন, তাদের অনেকেই এখন মর্গে, হাসপাতালের বেডে কিংবা স্বজনদের কান্নার স্মৃতিতে। সোমবার ভোর সাড়ে ৪টার দিকে সরাতৈল এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে।

নিহতরা পেশায় হকার : টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলায় রডবোঝাই ট্রাক উল্টে নিহত ১৫ জন ছিলেন পেশায় হকার। এলেঙ্গা ফায়ার সার্ভিসের ভারপ্রাপ্ত স্টেশন কর্মকর্তা আতাউর রহমান জানান, সোমবার ভোর ৪টার দিকে ঢাকা-টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু মহাসড়কের সরাতৈল এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। পরে নিহতদের মরদেহ এবং আহত দশজনকে উদ্ধার করে টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়। 

যমুনা সেতু পূর্ব থানার ওসি খন্দকার ফুয়াদ রুহানি বলেন, দুর্ঘটনাকবলিত গাড়িটি উত্তরবঙ্গের দিকে যাচ্ছিল। দুর্ঘটনাকবলিত গাড়িটি সরিয়ে উদ্ধার অভিযান শেষ করা হয়েছে। বর্তমানে মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। কী ঘটেছিল জানতে চাইলে ট্রাকের আরেক যাত্রী বলেন, হঠাৎ করেই ট্রাকটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে যায়। মুহূর্তের মধ্যে চারপাশে চিৎকার ও হাহাকার শুরু হয়।

‘আমার এক শালা মারা গেছে, আমি নিজে ছিলাম গাড়িতে। আমরা ছিলাম ভেতরে, ওপরে পলিথিন ছিল। কীভাবে ঘটনা, কেউ বুঝতে পারে নাই। পালট দিয়ে আমি বাইরে পড়ছি। আমি নিজে পড়ি নাই, আল্লাহ ফেলে দিছে আমাকে বাইরে। দেখছি সব চাপা পড়ে আছে।’ তিনি জানান, তারা ফেনী থেকে প্রায় ১৮ জন একসঙ্গে ট্রাকে ওঠেন। ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থান থেকে আরও কয়েকজন ওঠেন। হতাহতরা সবাই মূলত পেশায় হকার; কসমেটিকসসহ বিভিন্ন পণ্য ফেরি করে বিক্রি করতেন।

আরেক যাত্রী জানান, তার বাড়ি নওগাঁর মান্দা থানায়। ওই এলাকার আরও কয়েকজন ছিলেন ট্রাকে। ‘গাড়ি ব্রেকফেল করেছে কিংবা কোনো একটা সমস্যার কারণেই দুর্ঘটনা হইছে। আমরা ছিলাম ১৮ জন। একই থানার লোকজন মারা গেছে। যখন দুর্ঘটনা ঘটেছে ঘুমাচ্ছিলাম।’ ট্রাকের একাধিক যাত্রীর ভাষ্য, ট্রাকের চালক ‘ঘুমিয়ে পড়েছিলেন’ এবং সে কারণেই এ দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে তাদের ধারণা। দুর্ঘটনার পরপরই চালক ও তার সহকারী পালিয়ে যায়।

শুরুতে আশপাশের লোকজন গিয়ে আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠায়। ঘটনার প্রায় এক ঘণ্টা পর এলেঙ্গা ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা মরদেহ উদ্ধার করেন।

বাবার মরদেহ মর্গে, ছেলে হাসপাতালে, মামা থানায় মরদেহের অপেক্ষায় : তরিকুল ইসলাম চট্টগ্রাম থেকে রডবোঝাই ট্রাকে উঠেছিলেন গত রোববার দুপুরে। সঙ্গে ছিলেন শ্যালক নজরুল ইসলাম ও শ্যালকের ছেলে তুহিন। ঈদ উপলক্ষে কম ভাড়ায় বাড়ি যাওয়ার জন্য তারা ট্রাকের আরোহী হয়েছিলেন। কিন্তু তাদের বাড়ি ফেরা হয়নি। সোমবার ভোরে যমুনা সেতুর পূর্ব প্রান্তের সংযোগ সড়কের সরাতৈলে ট্রাকটি উল্টে যায়।

তরিকুল ইসলাম অক্ষত অবস্থায় বেঁচে যান। ঘটনাস্থলেই নিহত হন নজরুল ইসলাম। আহত হন তুহিন। যমুনা সেতু পূর্ব থানায় কথা হয় তরিকুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘বাড়ির লোকজন আশায় বইসা আছে, আমরা দুপুরের মধ্যেই পৌঁছাইয়া যামু। কিন্তু নজরুল রইছে মর্গে, তুহিন হাসপাতালে আর আমি থানায় আছি। নজরুলের লাশ কহন বুইঝা পামু জানি না। লাশ পাওয়ার পর বাড়ি নিয়া যামু।’ তরিকুল ও তার সহযাত্রীরা সবাই চট্টগ্রামে ‘হরেক মালের’ (হাঁড়িপাতিল ও তৈজসপত্র) ব্যবসা করেন। চট্টগ্রাম থেকে জনপ্রতি পাঁচশ টাকা ভাড়ায় রাজশাহী পর্যন্ত যাওয়ার জন্য ট্রাকে উঠেছিলেন। তাদের বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলায়। চট্টগ্রামের অলংকার মোড় থেকে গতকাল দুপুর ১টায় তারা চারজন ট্রাকে ওঠেন। ট্রাকটি সন্ধ্যায় ফেনী পৌঁছালে সেখান থেকে আরও ১৮ জন আরোহী নেয়। রাত ১টার দিকে তারা ঢাকা শহর পার হন।

টাঙ্গাইল ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন যাত্রী খোরশেদ আলম (২৬) বলেন, ঢাকা শহর পার হওয়ার পর কোথাও যানজটে পড়তে হয়নি। সবাই ট্রাকে বহন করা রডের ওপর ঘুমিয়ে পড়েন। হঠাৎ প্রচণ্ড ঝাঁকুনি দিয়ে ট্রাকটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার পাশে উল্টে যায়। কিছুক্ষণ পর খোরশেদ আলম দেখেন, তিনি ট্রাকের কাছেই পড়ে আছেন। এ সময় অনেকে রডের নিচে চাপা পড়ে কাতরাচ্ছিলেন। পরে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকারী দল এসে তাদের উদ্ধার করে।

নিহত ১৫ জনের ১০ জন নওগাঁর একই ইউনিয়নের : সাইকেলে করে দেশের বিভিন্ন জেলার গ্রামে গ্রামে ঘুরে প্লাস্টিকের পণ্যের বিনিময়ে চুল, ভাঙা মোবাইল ফোনসহ বিভিন্ন জিনিস কিনতেন নওগাঁর মান্দা উপজেলার ভাঁরশো ইউনিয়নের ১০ ব্যক্তি। সবশেষ তারা নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার উত্তর নাজিরপুর এলাকায় ফেরি করে পণ্য কেনাবেচার কাজ করছিলেন। পরিবারের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে রডবোঝাই একটি ট্রাকে করে বাড়ি ফিরছিলেন। কিন্তু বাড়ি ফেরা হলো না তাদের। পথে ট্রাক উল্টে ওই ১০ ফেরিওয়ালাসহ ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে।

সোমবার ভোর সাড়ে ৪টার দিকে টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলায় যমুনা সেতুর পূর্ব প্রান্তের সংযোগ সড়কের সরাতৈল এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত ১৫ জনের মধ্যে ১০ জনই নওগাঁর মান্দা উপজেলার ভাঁরশো ইউনিয়নের বাসিন্দা। তাদের মধ্যে একই গ্রামের সাতজন আছেন। নিহত ব্যক্তিরা হলেন রাজেন্দ্রবাটি গ্রামের তারেক জিয়া (২১), বাদশা মিয়া (৩০), আবদুল বারিক (২০), সোহাগ হোসেন (২১), রবিউল ইসলাম (২৮), মাইনুর ইসলাম (৩০) ও সাগর হোসেন (২০)। এ ছাড়া পাকুড়িয়া গ্রামের সহোদর মাইনুর রহমান (২৫) ও গিয়াস উদ্দিন (২২) এবং মশিদপুর গ্রামের সুজন আলী (৩৫)। দুপুরে রাজেন্দ্রবাটি গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, নিহত ব্যক্তিদের বাড়িতে মানুষের ভিড়। একই গ্রামের সাতজনের মৃত্যুতে শোকে স্তব্ধ এলাকাবাসী।

নিহত বাদশা মিয়ার স্ত্রী সাবিনা ইয়াসমিন স্বামীর মৃত্যুর খবর শুনে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন। বিলাপ করতে করতে বলছিলেন, ‘রাতে দুবার কথা হছে। বেটির (মেয়ে) জন্য খেলনা কিনিছে। সেই খবর শুনি বেটি কত খুশি! বাপে খেলনা নিয়ে আনোছে। এখন হামার ছাওয়ালেক কী জবাব দিমো। হামার ছাওয়াল কাক বাপ বলে ডাকবে? হামার কী হবে?’

নিহত মাইনুর ইসলামের চাচাতো ভাই রবিউল ইসলাম বলেন, ভাইয়ের সঙ্গে রোববার বিকালে ফোনে তার কথা হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, সোমবার রাতে ঈদ করতে ওরা বাড়িতে ফিরবেন। মাইনুর ভাইয়ের অসুস্থ মা-বাবা আছে। তিন বছর বয়সি এক ছেলেসন্তান ও স্ত্রী আছে। পুরো পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন তিনি। এখন তার মৃত্যুতে পুরো পরিবারটা অচল হয়ে যাবে।

মান্দা থানার ওসি খোরশেদ আলম বলেন, বিভিন্ন গণমাধ্যমে মান্দা উপজেলার ১৩ জনের মৃত্যুর কথা বলা হলেও এখন পর্যন্ত ১০ জনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। আরও কেউ আছেন কি না, তার খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। টাঙ্গাইল থেকে মরদেহ আনার বিষয়ে স্বজনদের সহযোগিতা করছে পুলিশ।

আরবিএন 



  বিষয়:   টাঙ্গাইল  মর্গ  ঈদযাত্রা 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: