১৭ বছর পেরিয়ে গেছে। তবু মে মাস এলেই সাতক্ষীরার উপকূলজুড়ে ফিরে আসে এক বিভীষিকাময় স্মৃতি। ২০০৯ সালের ২৫ মে আজও যেন তাড়া করে বেড়ায় শ্যামনগরের গাবুরা, পদ্মপুকুর, আটুলিয়া ও মুন্সিগঞ্জের মানুষকে। ক্যালেন্ডারের পাতায় সময় বদলেছে, দেশের উন্নয়নের গল্পও অনেক দূর এগিয়েছে, কিন্তু উপকূলের হাজারো পরিবারের জীবনে ঘূর্ণিঝড় আইলার ক্ষত এখনও রয়ে গেছে তাজা।
প্রলয়ংকরী জলোচ্ছ্বাসে এক দিনে তছনছ হয়ে গিয়েছিল পুরো জনপদ। নদীর বাঁধ ভেঙে লোনা পানিতে ডুবে যায় ঘরবাড়ি, আবাদি জমি, মাছের ঘের আর মানুষের স্বপ্ন। কেউ হারিয়েছেন স্বজন, কেউ ভিটেমাটি, কেউবা জীবনের সব সঞ্চয়। অনেক পরিবার আজও বেড়িবাঁধের ওপর কিংবা অন্যের জমিতে আশ্রয় নিয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে।
হয়নি টেকসই বেড়িবাঁধ : আইলার পর টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের দাবি ছিল উপকূলবাসীর প্রধান দাবি। বর্তমানে গাবুরা ইউনিয়নে প্রায় এক হাজার কোটি টাকার প্রকল্পের আওতায় আধুনিক ব্লক দিয়ে নতুন টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণকাজ চলছে। তবে কাজের ধীরগতি নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে স্থানীয়দের মধ্যে।
গাবুরার স্থানীয় বাসিন্দা মিজানুর রহমান জানান, আইলার পর ঘূর্ণিঝড় আম্ফান, বুলবুল, ইয়াসসহ একাধিক দুর্যোগে দুর্বল বেড়িবাঁধ ভেঙে বারবার লোকালয়ে লবণপানি প্রবেশ করেছে। আমাদের এই ১ হাজার কোটি টাকার বাঁধের কাজ এত ধীরগতিতে চলছে যে, কাজ শেষ হওয়ার আগেই যদি বড় কোনো দুর্যোগ আসে, তবে এই বাঁধ আবার ভেসে যাবে। আমরা চাই কাজটা দ্রুত শেষ হোক।
গাবুরার সোরা গ্রামের বাসিন্দা ফারুক হোসেন জানান, বাঁধের টেকসই কাজ যেটুকু হচ্ছে তা ভালো, কিন্তু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গাফিলতি আর ধীরগতির কারণে বর্ষা এলেই আমরা আতঙ্কে থাকি। জোয়ারের জল একটু বাড়লেই মনে হয় এই বুঝি মাটি ধসে লোকালয় প্লাবিত হলো। আমাদের স্থায়ী নিরাপত্তা না পাওয়া পর্যন্ত এই আতঙ্ক কাটবে না।
গাবুরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাসুদুল আলম জানান, নতুন নির্মিত টেকসই বাঁধের কারণে মানুষ কিছুটা নিরাপত্তা অনুভব করছে। তবে কাজ দ্রুত শেষ করা জরুরি। কারণ উপকূলের মানুষ এখনও আতঙ্ক নিয়েই বসবাস করে। অন্যদিকে পদ্মপুকুর, আটুলিয়া ও মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের অনেক স্থানে এখনও দুর্বল ও ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধ রয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, এসব এলাকার জন্য নতুন প্রকল্প প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে।
পাশের পদ্মপুকুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আমজাদ হোসেন আক্ষেপ করে বলেন, গাবুরায় কাজ শুরু হলেও আমাদের ইউনিয়নে কোথাও এখনও স্থায়ী বাঁধ নির্মাণকাজ শুরুই হয়নি। কপোতাক্ষ ও খোলপেটুয়া নদীর চরের ভাঙনে পদ্মপুকুরের বহু এলাকা এখন জরাজীর্ণ। বর্ষার আগে যদি এই ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধগুলো সংস্কার বা স্থায়ী ব্লক দিয়ে করা না হয়, তবে আইলার চেয়েও বড় বিপর্যয় আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে।
সাতক্ষীরার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) বিষ্ণুপদ পাল বলেন, আইলার পর থেকে সরকার উপকূলীয় মানুষের পুনর্বাসন ও অবকাঠামো উন্নয়নে কাজ করছে। আশ্রয়ণ প্রকল্প, সুপেয় পানির ব্যবস্থা এবং ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধ সংস্কারে বিভিন্ন কার্যক্রম চলমান রয়েছে। গাবুরায় টেকসই বাঁধ নির্মাণকাজ চলমান আছে। আগামীতে নতুন প্রকল্পের মাধ্যমে বাকি এলাকাগুলোতে টেকসই বাঁধ নির্মাণ করা হবে।
২০০৯ সালের ২৫ মে দুপুরের পর থেকেই উত্তাল হয়ে ওঠে উপকূল। প্রবল ঘূর্ণিঝড়ের সঙ্গে ১০ থেকে ১২ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস আছড়ে পড়ে সাতক্ষীরা উপকূলে। মুহূর্তেই ভেঙে যায় কপোতাক্ষ ও খোলপেটুয়া নদীর দুর্বল বেড়িবাঁধ। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় শ্যামনগরের গাবুরা ও পদ্মপুকুর ইউনিয়ন। চারদিক নদীবেষ্টিত হওয়ায় কয়েক মিনিটের মধ্যেই ইউনিয়ন দুটি লোনা পানিতে তলিয়ে যায়।
খাদ্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী আইলায় ১৯০ জন মানুষের মৃত্যু হয়। এর মধ্যে শ্যামনগর উপজেলায় মারা যান ৫৭ জন। সরকারি হিসাবে গাবুরায় ২৪ ও পদ্মপুকুরে ১৪ জনের মৃত্যুর তথ্য রয়েছে। তবে স্থানীয়দের দাবি, প্রকৃত নিহতের সংখ্যা আরও অনেক বেশি। বিশেষ করে সুন্দরবনে মাছ ও কাঁকড়া ধরতে যাওয়া বহু বনজীবী ও জেলের কোনো সঠিক হিসাব আজও মেলেনি।
উত্তাল সেই দিনের স্মৃতিচারণ করে গাবুরা ইউনিয়নের গাইনবাড়ি গ্রামের রবিউল ইসলাম বলেন, ‘সেদিন চোখের পলকে কপোতাক্ষ নদীর বাঁধ ভেঙে হু হু করে লোনা জল ঢুকতে শুরু করে। আমার ঘরের ছাদ পর্যন্ত জল উঠে গিয়েছিল। পরিবার-পরিজন নিয়ে কোনোমতে বাঁধের ওপর আশ্রয় নিয়েছিলাম। ১৭ বছর হয়ে গেল, কিন্তু মে মাস এলেই আকাশে মেঘ দেখে বুকটা কেঁপে ওঠে, মনে হয় আবার বুঝি আইলা আসছে।’
একই এলাকার সাইফুল ইসলাম সেই দিনের বর্ণনা দিয়ে বলেন, ‘চারদিকে শুধু মানুষের চিৎকার আর অবলা গবাদিপশুর ভেসে যাওয়ার দৃশ্য। ঘরের চাল, গাছপালা সব লোনা জলের তোড়ে ভেসে যাচ্ছিল। আমরা শুধু জীবনটা হাতে নিয়ে বেঁচে গিয়েছিলাম। কিন্তু আমাদের চেনা চারণভূমি, সাজানো সংসার সেদিন এক নিমিষেই শেষ হয়ে গিয়েছিল।’
আইলার পর সবচেয়ে বড় মানবিক বিপর্যয় তৈরি হয়েছে ভূমিহীনতা নিয়ে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও বেসরকারি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, শুধু গাবুরা ও পদ্মপুকুর ইউনিয়নের প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ মানুষ সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ভূমিহীন হয়ে পড়েছেন। সংখ্যার হিসাবে যা প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার পরিবার।
পরিবেশবিদ ও স্থানীয় উন্নয়ন কর্মীরা বলছেন, আইলার প্রভাব শুধু ঘরবাড়ি ধ্বংসেই সীমাবদ্ধ ছিল না। অতিরিক্ত লবণাক্ততা কৃষিজমি, গাছপালা ও সুপেয় পানির উৎস ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
গাবুরা ইউনিয়নে উপকূলীয় পরিবেশ নিয়ে কাজ করা উন্নয়নকর্মী মনিরুজ্জামান বলেন, ১৭ বছর পরও মাটি ও পানির লবণাক্ততা পুরোপুরি কমেনি। সুপেয় পানির সংকট এখনও তীব্র। অনেক দেশীয় গাছপালা হারিয়ে গেছে। টেকসই কর্মসংস্থানের অভাব ও ভিটেমাটি হারিয়ে হাজার হাজার মানুষ এলাকা ছেড়ে বিভিন্ন শহরে চলে গেছেন। স্থানীয়দের ভাষায়, তারা এখন ‘জলবায়ু উদ্বাস্তু’।
আরবিএন