যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কয়েকটি মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশকে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার জন্য আব্রাহাম চুক্তিতে যোগ দিতে আহ্বান জানান। এর জবাবে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা মোহাম্মদ আসিফ জানিয়েছেন, পাকিস্তান এমন কোনো চুক্তিতে যোগ দেবে না যা তাদের মৌলিক আদর্শের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
আব্রাহাম চুক্তি ২০২০ সালে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে শুরু হয়, যার মাধ্যমে ইসরায়েল সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনসহ কয়েকটি আরব দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে। পরে মরক্কো ও সুদানও এই কাঠামোয় যোগ দেয়। যুক্তরাষ্ট্র এই চুক্তিকে মধ্যপ্রাচ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার একটি বড় উদ্যোগ হিসেবে দেখে।
পাকিস্তান এখনো ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয় না এবং দুই দেশের মধ্যে কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। দেশটি দীর্ঘদিন ধরে ফিলিস্তিনের পক্ষে অবস্থান নিয়ে ১৯৬৭ সালের পূর্ব সীমার ভিত্তিতে পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের সমর্থন জানিয়ে আসছে। এই অবস্থান পাকিস্তানের ভেতরে রাজনৈতিক ও জনসমর্থনও পেয়েছে ।
ট্রাম্প সম্প্রতি বলেন, সৌদি আরব, কাতার, তুরস্ক, পাকিস্তানসহ কয়েকটি দেশকে আব্রাহাম চুক্তির সম্প্রসারিত কাঠামোয় যুক্ত হওয়া উচিত। তিনি এটিকে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান কূটনৈতিক আলোচনার অংশ হিসেবে উল্লেখ করেন।
এর জবাবে একটি টিভি সাক্ষাৎকারে খাজা আসিফ বলেন, পাকিস্তানের অবস্থান পরিষ্কার—এ ধরনের কোনো চুক্তি তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি আরও বলেন, পাকিস্তান কখনোই এমন কোনো উদ্যোগে অংশ নেয়নি এবং ভবিষ্যতেও তাদের অবস্থান পরিবর্তনের কোনো পরিকল্পনা নেই।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, পাকিস্তান এমনকি তাদের পাসপোর্টেও ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয় না।
এই বিষয়ে এখন পর্যন্ত ওয়াশিংটন ও ইসলামাবাদের মধ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ হয়নি বলেও তিনি জানান।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ইরান সংকট নিয়ে যেসব দেশ আলোচনা করছে, তাদের উচিত একসাথে আব্রাহাম চুক্তিতে যোগ দেওয়া। তিনি এই চুক্তিকে মধ্যপ্রাচ্যে আরও ঐক্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার একটি পথ হিসেবে বর্ণনা করেন।
ট্রাম্প আরও বলেন, এই প্রক্রিয়া শুরু হওয়া উচিত সৌদি আরব ও কাতারের দ্রুত স্বাক্ষরের মাধ্যমে এবং এরপর অন্য দেশগুলোকেও এতে যুক্ত হওয়া উচিত।
এদিকে আঞ্চলিক কূটনীতির একটি সংবেদনশীল সময়ে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে এই বিষয়ে মন্তব্য আসে।
রিপোর্ট অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে ইরান ইস্যু ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের উত্তেজনা বাড়ার পর উপসাগরীয় দেশগুলো, চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সমন্বিত কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চলছে। এই পরিস্থিতিতে পাকিস্তানও ধীরে ধীরে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কিছু ভূমিকা রাখছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি সম্প্রতি তেহরান সফর করেছেন। সেখানে তারা এমন আলোচনায় অংশ নেন, যা পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের মতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি সম্ভাব্য চূড়ান্ত সমঝোতার দিকে এগোচ্ছে।
এই কূটনৈতিক তৎপরতা এমন সময় ঘটছে, যখন আফগানিস্তান থেকে ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা প্রত্যাহারের পর পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক কিছুটা টানাপোড়েনের মধ্যে ছিল, তবে সাম্প্রতিক সময়ে সম্পর্ক আবার উন্নতির দিকে যাচ্ছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বাড়লেও পাকিস্তান বারবার স্পষ্ট করেছে যে ইসরায়েল ইস্যুতে তাদের অবস্থান অপরিবর্তিত। পাকিস্তান এখনো ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে অবস্থান বজায় রেখেছে।
পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, গাজায় যুদ্ধবিরতি বারবার ভঙ্গ হচ্ছে এবং ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত রয়েছে। তার মতে, এমন পরিস্থিতিতে যেসব পক্ষকে বিশ্বাস করা কঠিন, তাদের সঙ্গে আলোচনায় বসা জটিল।
পাকিস্তানে জনমতও সাধারণত ফিলিস্তিনিদের পক্ষেই থাকে। গাজার পরিস্থিতির বিরুদ্ধে দেশটিতে নিয়মিত বড় বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া ধর্মীয় ও রাজনৈতিক দলগুলো দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক স্থাপনের বিরোধিতা করে আসছে, যতক্ষণ না একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হয়।
/ইউএমএইচ