ইরানের সাথে চলমান যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা এবার স্পর্শ করেছে ওমানকে। দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত মার্কিন মিত্র ওমানকে সামরিক শক্তি প্রয়োগ ও ‘উড়িয়ে দেওয়ার’ হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মূলত কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ দিয়ে বিশ্বের ২০ শতাংশেরও বেশি তেল পরিবহন করা হয়।
সম্প্রতি মাস্কাট এই প্রণালী দিয়ে নৌচলাচল তদারকির বিষয়ে তেহরানের সাথে একটি সমঝোতা স্মারকের কাছাকাছি পৌঁছানোর খবরের পরই ওয়াশিংটনে মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে ট্রাম্পের এই ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া সামনে আসে। ট্রাম্প এটিকে আন্তর্জাতিক জলসীমা দাবি করে ওমানকে সবার মতো আচরণ করার হুঁশিয়ারি দিলেও, আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন অনুযায়ী হরমুজ প্রণালীর বেশিরভাগ অংশই মূলত ইরান ও ওমানের আঞ্চলিক জলসীমার অন্তর্ভুক্ত।
২৮শে ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ হামলার পর তেহরান এই জলপথটি বন্ধ করে দেয় এবং প্রতিটি জাহাজের ওপর কর আদায়ের মাধ্যমে সার্বভৌমত্ব জাহির করতে শুরু করে। ঠিক এই পরিস্থিতিতে ইরান ও ওমানের মধ্যে যৌথভাবে প্রণালীটি নিয়ন্ত্রণের একটি প্রস্তাবনা তৈরি হয়, যেখানে টোলের পরিবর্তে ‘পরিষেবা ফি’ আদায়ের আইনি চুক্তির কথা বলা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসন এই সমঝোতাকে সম্পূর্ণ মনগড়া বললেও মূলত আরবের সমর্থনে হরমুজের ওপর ইরানের এই নিয়ন্ত্রণের স্বাভাবিকীকরণ রোধ করতেই ওমানকে এই হুমকি দেওয়া হয়েছে। এটি একই সাথে সমগ্র উপসাগরীয় অঞ্চলের জন্য একটি কঠোর বার্তা যে, কেউ যেন ইরানকে কূটনৈতিক বা প্রশাসনিক সুরক্ষা না দেয়।
ট্রাম্পের এই নজিরবিহীন মন্তব্য ওমানকে ভুল করে ‘ইরান’ বলা কি না তা নিয়ে প্রাথমিক জল্পনা থাকলেও, পরবর্তীতে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর ওমানকে উল্লেখ করেই এই বিবৃতির প্রতিলিপি প্রকাশ করে। মানবাধিকার সংস্থা ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা ট্রাম্পের এই হুমকিকে বেপরোয়া ও আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী বলে আখ্যা দিয়েছেন।
লন্ডনের কিংস কলেজের গবেষক সমীর পুরি একে আশ্চর্যজনক উল্লেখ করে বলেছেন, ওমান সবসময় আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে এসেছে, তাই সেখানে হামলার হুমকি ইরানের কৌশলগত হিসাব-নিকাশে কোনো পরিবর্তন আনবে না। এদিকে, ওমানের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে তারা ওমানের পাশে রয়েছে।
এই হুমকি এমন এক সময়ে এলো যখন পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধবিরতির আলোচনা থমকে গেছে। ৮ই এপ্রিলের সাময়িক যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরও সামরিক সংঘাত অব্যাহত রয়েছে, যেখানে সম্প্রতি ওমান সাগরের কাছাকাছি মার্কিন বাহিনী ও আইআরজিসির মধ্যে পাল্টা-পাল্টি হামলার ঘটনা ঘটেছে।
ওমান অতীতে পরমাণু চুক্তিসহ নানা দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে অন্যতম প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করেছে। কিন্তু যুদ্ধকালীন এই বাস্তবতায় ওমানের এই নিরপেক্ষ অবস্থানই এখন ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা বিশ্বজুড়ে মার্কিন সমর্থিত নৌচলাচলের স্বাধীনতার নীতি এবং এই অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে এক গভীর সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
সূত্র : আল জাজিরা
সময়ের আলো/জেডি