বিশ্বজুড়ে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার প্রধান হাতিয়ার জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রম এখন গভীর সংকটে। যুক্তরাষ্ট্রসহ শীর্ষ দাতা দেশগুলোর সময়মতো অর্থ পরিশোধ না করার কারণে গত এক বছরে শান্তিরক্ষী মোতায়েন এবং এর বাজেট ২৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন স্তরে নেমে এসেছে। আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী দিবস (২৯ মে) উপলক্ষে সুইডেনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এসআইআরআর) প্রকাশিত এক সর্বশেষ প্রতিবেদনে এই উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।
সিপরির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালের পর থেকে শান্তিরক্ষীর সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে কমলেও, বিগত ২০২৫ সালে এক বছরেই রেকর্ড ১৭ শতাংশ কর্মী হ্রাস পেয়েছে। এই পরিস্থিতিকে বৈশ্বিক দ্বন্দ্ব ব্যবস্থাপনার জন্য একটি ‘ভয়াবহ সংকেত’ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের জুলাই মাস নাগাদ জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা খাতের মোট ৫.৬ বিলিয়ন (৫৬০ কোটি) ডলার বাজেটের প্রায় ৩৫ শতাংশই (২ বিলিয়ন ডলার) অপূর্ণ ছিল। তীব্র অর্থসংকটের কারণে বাধ্য হয়ে বিভিন্ন মিশন থেকে শান্তিরক্ষী ছাঁটাই ও কার্যক্রম সংকুচিত করতে হয়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন শান্তি মিশনে মাত্র ৭৮,৬৩৩ জন আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী নিয়োজিত ছিলেন, যা ২০১৬ সালের তুলনায় প্রায় ৪৯ শতাংশ কম। সিপরি উল্লেখ করেছে, এটি অন্তত ২০০০ সালের পর থেকে শান্তিরক্ষী মোতায়েনের সর্বনিম্ন হার।
এসআইআরআর-এর শান্তি ও সংঘাত ব্যবস্থাপনা কর্মসূচির পরিচালক ড. ইয়ার ভ্যান ডার লাইন বলেন, পরিস্থিতি এভাবে চলতে থাকলে অর্থায়ন, রাজনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক সংকটের এক ‘ভয়াবহ ঝড়ে’ বহুপাক্ষিক দ্বন্দ্ব নিরসন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়বে এবং জাতিসংঘের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো একেবারে প্রান্তিক পর্যায়ে চলে যাবে।
জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা বাজেটের প্রায় অর্ধেকই যৌথভাবে প্রদান করে থাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীন। জিএনআই (স্থূল জাতীয় আয়) এবং ঋণের ওপর ভিত্তি করে এই চাঁদা নির্ধারিত হয়। কিন্তু এর বিপরীতে মাঠপর্যায়ে শান্তিরক্ষী পাঠিয়ে জীবন বাজি রেখে কাজ করে ‘গ্লোবাল সাউথ’ বা তুলনামূলকভাবে দরিদ্র উন্নয়নশীল দেশগুলো। বিশ্বের শীর্ষ ১০টি শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশের তালিকা নিচে তুলে ধরা হলো : উগান্ডা (সর্বোচ্চ ৪,৬৫৭ সেনা); নেপাল; বাংলাদেশ; ভারত; রুয়ান্ডা; ইথিওপিয়া; বুরুন্ডি; কেনিয়া; পাকিস্তান; ইন্দোনেশিয়া;
মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসআইআরআর-এর প্রতিবেদনে এই সংকটের জন্য সরাসরি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে এককভাবে দায়ী না করা হলেও, ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পুনরায় হোয়াইট হাউজের ক্ষমতায় আসার পর থেকে বহুপাক্ষিকতার ওপর যে বড় আঘাত এসেছে, তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা বাজেট থেকে মার্কিন অবদান ২৫ শতাংশ কমানোর জন্য চাপ দিচ্ছে, যেখানে জাতিসংঘ সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ কমাতে রাজি ছিল। বর্তমানে ওয়াশিংটন তাদের বকেয়ার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ আটকে রেখেছে।
শুধু তাই নয়, ট্রাম্প প্রশাসন জাতিসংঘ সনদের অধীনে থাকা প্রথাগত অস্ত্র রেজিস্টার এবং গ্লোবাল কাউন্টার-টেররিজম ফোরামের মতো গুরুত্বপূর্ণ তহবিলও বাতিল করেছে। হোয়াইট হাউজের অভ্যন্তরীণ এক নথিতে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের খরচ কমাতে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনগুলোর অর্থায়ন পুরোপুরি বন্ধ করার প্রস্তাবও আনা হয়েছিল, যা এখনো কংগ্রেসের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে ৩৪টি দেশ বা অঞ্চলে মোট ৫৮টি বহুপাক্ষিক শান্তি মিশন সক্রিয় ছিল। তবে ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও অর্থসংকটের কারণে কঙ্গো, হাইতি, ইরাক এবং আজারবাইজানের নাগর্নো-কারাবাখ অঞ্চলের মিশনগুলো ইতোমধ্যে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি আসতে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যে। মার্কিন ও ইসরাইলি চাপের মুখে আগামী ডিসেম্বর মাসে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে ২০০৬ সাল থেকে লেবাননে নিয়োজিত জাতিসংঘের ঐতিহ্যবাহী শান্তিরক্ষী মিশন ‘ইউনিফিল’। যুক্তরাষ্ট্র চাচ্ছে ইউনিফিলের পরিবর্তে লেবাননের সেনাবাহিনী সেখানে দায়িত্ব নিক, যদিও তাদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জাম নেই এবং ২০২৪ সালের মার্কিন-ইরান যুদ্ধবিরতি চুক্তি অনুযায়ী হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্রীকরণে তারা ব্যর্থ হয়েছে।
/কহু