জেন-জি আন্দোলনের রেশ কাটতে না কাটতেই ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে রাস্তায় নামছে নতুন প্রজন্ম— জেন আলফা। গত কয়েক সপ্তাহে দেশটির অন্তত ১০টি রাজ্যের স্কুলশিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষ বর্জন, বিক্ষোভ ও মানববন্ধনের মতো কর্মসূচি পালন করেছে।
শিক্ষকদের স্বল্পতা, জরাজীর্ণ স্কুল ভবন, বিশুদ্ধ পানির অভাব, বিদ্যুৎ ও বেঞ্চের সংকট এবং নিম্নমানের মধ্যাহ্নভোজসহ নানা সমস্যা নিয়ে এসব আন্দোলন করছে শিশুরা। তাদের এই প্রতিবাদ অনেকটাই সাম্প্রতিক জেন-জি আন্দোলনের ধারাবাহিকতা বলে মনে করা হচ্ছে।
উত্তর প্রদেশের সামুহি ভাটপুরওয়া গ্রামের একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গত ২২ আগস্ট এমনই এক ব্যতিক্রমী প্রতিবাদ করে ১২২ শিক্ষার্থী। ছয় বছর বয়সী শিশুরাও ছিল তাদের মধ্যে। নতুন স্কুল ভবন নির্মাণের নিশ্চয়তা না পাওয়া পর্যন্ত তারা শ্রেণিকক্ষে ঢুকতে অস্বীকৃতি জানায়।
স্কুলটির বর্তমান ভবনটি জরাজীর্ণ। ২০২৩ সালে একটি দেয়াল ধসে এক ছাত্রী গুরুতর আহত হওয়ার পর ভবনের একটি অংশ এখনো ধ্বংসস্তূপ হয়ে পড়ে আছে। এরপর থেকেই নতুন ভবনের দাবি জানিয়ে আসছিল শিক্ষার্থীরা।
আন্দোলনের খবর পেয়ে শিক্ষা বিভাগের এক কর্মকর্তা স্কুলে গিয়ে দ্রুত নতুন ভবন নির্মাণের আশ্বাস দেন। এরপর শিক্ষার্থীরা বাড়ি ফিরে যায়।
আট বছর বয়সী এক ছাত্রী প্রিয়া জানায়, স্কুল ভবনের দুরবস্থা নিয়ে তারা সবসময় আতঙ্কে থাকে। সেই ভয় তাদের পড়াশোনায় মনোযোগ দিতেও বাধা দেয়। তাই সবাই মিলে প্রতিবাদে নেমেছিল।
শুধু উত্তর প্রদেশ নয়, মহারাষ্ট্র, বিহার, রাজস্থান, ঝাড়খণ্ড ও মধ্যপ্রদেশসহ অন্তত ১০টি রাজ্যে একই ধরনের বিক্ষোভ হয়েছে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকার সরকারি স্কুলগুলোতে অবকাঠামোগত সংকট ও অবহেলার চিত্র বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
চলতি বছরের জুনের শুরুতে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে হাজারো জেন-জি তরুণেরা বিক্ষোভ শুরু করেন। পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনিয়মের বিরুদ্ধে জবাবদিহির দাবিই ছিল তাদের অন্যতম প্রধান দাবি। পরবর্তীতে আন্দোলনের পরিধি বাড়তে থাকে। ভারতের ব্যাপক বেকারত্ব ও কর্মসংস্থানের সংকটও আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে ওঠে।
এই আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিল ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি নামের একটি ব্যঙ্গাত্মক সংগঠন। মে মাসে গঠিত সংগঠনটি বেকারত্ব ও শিক্ষাব্যবস্থার নানা অনিয়মের প্রতিবাদে আন্দোলন শুরু করেছিল। আন্দোলনকারীদের ওপর নিরাপত্তা বাহিনীর দমন-পীড়নের অভিযোগে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পরে চাপের মুখে পদত্যাগ করেন ভারতের তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান।
এরপর স্কুলগুলোর দুরবস্থার দিকে নজর দেয় সিজেপি। ১৫ আগস্ট ভারতের স্বাধীনতা দিবসে সংগঠনটি ‘স্কুল ঠিক করো’ নামে একটি তৃণমূল উদ্যোগ শুরু করে। সিজেপির আইনবিষয়ক প্রধান রত্না সিং বলেন, দেশের বিভিন্ন স্কুলে শিক্ষার্থীদের চলমান আন্দোলনের প্রতি তাদের পূর্ণ সমর্থন রয়েছে। তার মতে, শিক্ষাব্যবস্থার উন্নতির জন্য স্কুলের অবকাঠামো, শিক্ষকসংকট ও শিক্ষার্থীদের স্কুলে যাওয়ার পথের মতো মৌলিক বিষয়গুলোর সমাধান জরুরি।
ভারতে প্রায় ১৫ লাখ স্কুলে ২৪ কোটি ৭০ লাখ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে। এর প্রায় ৭০ শতাংশ স্কুল পরিচালনা করে কেন্দ্রীয়, রাজ্য বা স্থানীয় সরকার। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, শিক্ষার সুযোগ ও শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাতের ক্ষেত্রে কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তবে বাস্তব চিত্র অনেক ক্ষেত্রেই ভিন্ন। কোথাও স্কুল ভবন এতটাই জরাজীর্ণ যে সেখানে গবাদিপশুও পালন করা হয়। আবার অনেক স্কুলে নেই পর্যাপ্ত শিক্ষক, বেঞ্চ, বিদ্যুৎ, পানি কিংবা শৌচাগার।
শিক্ষার অধিকার আইনে ছয় থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের শিক্ষাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। আইনে স্কুলে নিরাপদ ভবন, পানি ও স্যানিটেশনসহ বিভিন্ন অবকাঠামোগত সুবিধার কথা বলা হয়েছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাতও সর্বোচ্চ ১:৩০ নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ভারতে এখনো ১ লাখ ৮৪ হাজারের বেশি স্কুলে মাত্র একজন শিক্ষক রয়েছেন— এমন স্কুলও রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রায় ২৯ লাখ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে। বিপরীতে, ৫ হাজারের বেশি স্কুলে কোনো শিক্ষার্থীই নেই।
মধ্যাহ্নভোজের নিম্নমানও শিক্ষার্থীদের ক্ষোভের অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে। বিহারের সিমুয়াড়া গ্রামের একটি স্কুলে গত ২৮ জুলাই প্রায় ৫০ শিক্ষার্থী চার কিলোমিটার হেঁটে এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার কাছে যায়। তাদের অভিযোগ ছিল, স্কুলের মধ্যাহ্নভোজে নিম্নমানের চাল, ডাল ও সবজি দেওয়া হচ্ছে। পাইপের পানির ব্যবস্থা না থাকায় রান্নার আগে কাঁচা উপকরণও ঠিকমতো পরিষ্কার করা হয় না বলে অভিযোগ করে তারা।
শিক্ষা অধিকারকর্মীদের মতে, শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন শুধু স্কুলের অবকাঠামোগত সমস্যা নয়, দীর্ঘদিনের অবহেলা ও বৈষম্যের প্রতিফলন।
শিক্ষাবিদ স্বর্ণা রাজগোপালনের মতে, ভারতের শিক্ষাব্যবস্থায় কাঠামোগত পরিবর্তন প্রয়োজন। সব স্কুলে সমমানের অবকাঠামো নিশ্চিত করা, পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ ও তাদের সক্ষম করে তোলা এবং পরিবারগুলোকে সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে উৎসাহিত করার মতো বিষয়গুলোতে গুরুত্ব দিতে হবে।
এই আন্দোলনের রাজনৈতিক প্রভাবও পড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। ভারতের মোট জনসংখ্যার ৩০ শতাংশের বেশি ১৮ বছরের নিচে। এখন যারা স্কুলশিক্ষার্থী হিসেবে আন্দোলন করছে, তাদের অনেকেই ২০২৯ সালের জাতীয় নির্বাচনের সময় ভোটার হবে।
পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষা অধিকারকর্মী আকাশ সরকার বলেন, এই শিশুরাই ভারতের ভবিষ্যৎ। উপযুক্ত পরিবেশে তারা শিক্ষা না পেলে দেশের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে। ভবিষ্যতে তারা ভোট দেওয়ার সময়ও শিক্ষাব্যবস্থার বিষয়টি বিবেচনায় রাখবে।
বেঙ্গালুরু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সুজাতা গৌড়ার বলেন, জেন জেডের পর জেন আলফার আন্দোলনে নামা অপ্রত্যাশিত নয়। দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ জমে ছিল। কর্তৃপক্ষ তাদের দাবি না শুনলে ভবিষ্যতে আরও বড় আন্দোলন হতে পারে।
সূত্র : আলজাজিরা
সময়ের আলো/কেএইচ