পবিত্র ঈদুল আজহার আনন্দ উদযাপনের সময় অসাবধানতাবশত অনেকেরই গলায় বড় টুকরো মাংস আটকে যাওয়ার মতো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে থাকে। সঠিক সময়ে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এটি মুহূর্তের মধ্যে চরম আতঙ্কের কারণ হতে পারে, এমনকি মানুষের মৃত্যু পর্যন্ত ডেকে আনতে পারে। জানা গেছে, চলমান ঈদের দিনও গলায় মাংস আটকে অন্তত দুইজন মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে।
চিকিৎসা বিজ্ঞান অনুযায়ী, মুখের ভেতর জিব, পেশি এবং খাদ্যনালীর সমন্বিত কাজের মাধ্যমে খাবার পাকস্থলীতে পৌঁছায়। কিন্তু ঈদের সময় গল্প করতে করতে খাওয়া, অতিরিক্ত তাড়াহুড়ো করা কিংবা মাংসের টুকরো ঠিকমতো না চিবিয়ে একবারে গিলে ফেলার চেষ্টা করলে এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় বিঘ্ন ঘটে। বিশেষ করে শক্ত বা আঁশযুক্ত মাংসের টুকরো অনেক সময় খাদ্যনালীতে গিয়ে আটকে যায়। আবার কখনো কখনো এটি ভুলবশত শ্বাসনালীর মুখে গিয়ে পড়তে পারে, যা অত্যন্ত বিপজ্জনক। শিশু, বয়স্ক এবং যাদের দাঁতের সমস্যা আছে, তাদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকিটা অনেক বেশি থাকে।
মাংস আটকানোর পর যদি দেখা যায় আক্রান্ত ব্যক্তি কথা বলতে পারছেন এবং তার শ্বাস নিতে কোনো সমস্যা হচ্ছে না, তাহলে বুঝতে হবে মাংসটি খাদ্যনালীতে আটকেছে। এমন অবস্থায় ঘাবড়ে না গিয়ে শান্ত থেকে ৩টি ঘরোয়া উপায় অবলম্বন করা যেতে পারে।
প্রথমত, জোরে জোরে কাশতে হবে, কারণ কাশির বাতাসের ধাক্কায় মাংসের টুকরোটি আলগা হয়ে বেরিয়ে আসতে পারে। দ্বিতীয়ত, বড় চুমুকে কয়েক ঢোক পানি বেশ জোরের সাথে গিলে ফেলতে হবে, যাতে পানির ওজনে মাংসের টুকরোটি নিচে নেমে যায়। তৃতীয়ত, এক টুকরো পাকা কলা না চিবিয়ে একবারে গিলে ফেলা যেতে পারে অথবা এক লোকমা নরম সাদা ভাত কিংবা পানিতে ভেজানো রুটি গোল বলের মতো করে গিলে নেওয়া যেতে পারে।
তবে এমন পরিস্থিতিতে আমরা সাধারণ কিছু মারাত্মক ভুল করি যা করা যাবে না। যেমন গলার ভেতর জোর করে আঙুল বা চিমটা ঢুকিয়ে মাংস বের করার চেষ্টা করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, কারণ এতে মাংসের টুকরোটি আরও ভেতরে চলে গিয়ে শ্বাসনালী পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে পারে। পাশাপাশি শুকনা ভাতের বড় বা শক্ত দলা জোর করে গিলে ফেলাও উচিত নয়, কারণ মাংসের টুকরোটি বড় হলে শক্ত খাবারের চাপে খাদ্যনালী ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সবচেয়ে বিপজ্জনক পরিস্থিতি তখনই তৈরি হয় যখন মাংসের টুকরোটি খাদ্যনালীতে না গিয়ে শ্বাসনালীতে আটকে যায়। তখন মানুষ কথা বলতে পারে না, কাশতে পারে না এবং দম বন্ধ হয়ে মুখ নীল হতে শুরু করে। এটি একটি জীবন-মরণ সমস্যা এবং তখন এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট না করে ‘পিঠে আঘাত’ এবং ‘হেইমলিখ ম্যানুভার’ নামের দুটি জীবনরক্ষাকারী প্রাথমিক চিকিৎসা পদ্ধতি প্রয়োগ করতে হবে।
প্রথম পদ্ধতি অনুযায়ী, আক্রান্ত ব্যক্তিকে সামান্য সামনের দিকে ঝুঁকিয়ে দিয়ে নিজের হাতের তালুর গোড়ালি দিয়ে তার দুই কাঁধের মাঝখানে শক্ত করে পরপর ৫ বার ওপরের দিকে ধাক্কা দিয়ে আঘাত করতে হবে। এতেও মাংস বের না হলে দ্বিতীয় পদ্ধতি বা হেইমলিখ ম্যানুভার প্রয়োগ করতে হবে। এর জন্য আক্রান্ত ব্যক্তির পেছনে দাঁড়িয়ে দুহাত দিয়ে তার কোমর জড়িয়ে ধরতে হবে। এরপর এক হাতের মুষ্টি তৈরি করে অন্য হাত দিয়ে তা চেপে ধরে ব্যক্তির নাভি এবং পাঁজরের ঠিক মাঝখানে স্থাপন করে ভেতরের দিকে এবং ওপরের দিকে জোরালোভাবে ৫ বার ধাক্কা দিতে হবে। মাংস বের না হওয়া পর্যন্ত এই প্রক্রিয়াটি পর্যায়ক্রমে চালাতে হবে।
যদি এই পদ্ধতিগুলোর পরেও মাংস বের না হয়, লালা গিলতে প্রচণ্ড ব্যথা হয়, বুকে ব্যথা শুরু হয় কিংবা ১ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে অস্বস্তি বজায় থাকে— তবে এক মুহূর্ত দেরি না করে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যেতে হবে। চিকিৎসকেরা এন্ডোস্কোপির মাধ্যমে খুব সহজেই এটি বের করতে পারেন। এই জরুরি পদ্ধতিগুলো শুধু মাংসে আটকে গেলে নয়, গলায় যেকোনো শক্ত খাবার আটকে গেলে অনুসরণ করা যাবে বলে চিকিৎসকেরা পরামর্শ দিয়েছেন।
সময়ের আলো/টিএইচ