পবিত্র ঈদুল আজহার পরের দিন সকাল থেকেই চট্টগ্রাম মহানগরীর বিভিন্ন প্রধান সড়কের পাশে শত শত কাঁচা গরুর চামড়া পরিত্যক্ত অবস্থায় স্তূপ হয়ে পড়ে থাকতে দেখা গেছে। কোরবানির পশুর চামড়ার কাঙ্ক্ষিত ও ন্যায্য মূল্য না পেয়ে চরম ক্ষোভ ও হতাশায় মৌসুমি ব্যবসায়ীরা গভীর রাতে এসব চামড়া রাস্তায় ফেলে চলে গেছেন বলে জানা গেছে।
কোনো ধরনের লবণ না দেওয়ায় সড়কের পাশে এবং ড্রেনের মুখে ফেলে রাখা এই বিপুল পরিমাণ চামড়া ইতিমধ্যে পচতে শুরু করেছে এবং তীব্র দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ায় গোটা এলাকায় মারাত্মক জনস্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
শুক্রবার (২৯ মে) সকাল থেকে চট্টগ্রাম নগরের ঐতিহ্যবাহী আতুরার ডিপো ও মুরাদপুর এলাকার বিভিন্ন সড়ক ঘুরে দেখা যায়, রাস্তার পাশে শত শত কাঁচা চামড়া স্তূপাকার করে রাখা হয়েছে এবং সেগুলোতে মাছি ভনভন করছে।
স্থানীয় বাসিন্দা আমিনুল ইসলাম তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, গভীর রাত পর্যন্ত আড়তগুলোতে চামড়া বিক্রির আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছিলেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। কিন্তু সিন্ডিকেটের কারণে প্রত্যাশিত দাম না পেয়ে শেষ পর্যন্ত নিরুপায় হয়ে অনেকেই চামড়া মাঝরাস্তায় ফেলে রেখে চলে যান।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা কর্মী আসমা বেগম জানান, আতুরার ডিপোর কয়েকটি আড়তের সামনে অন্তত ৩০ থেকে ৩৫টি বড় চামড়ার স্তূপ রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখেছেন তিনি, যার মধ্যে অনেকগুলো বেশ ভালো মানের চামড়া ছিল। সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে এই ফেলে যাওয়া চামড়াগুলো দ্রুত অপসারণের কাজ শুরু হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, আড়তদারদের একটি বড় অংশ সমন্বিতভাবে চামড়ার অস্বাভাবিক কম দাম বলায় বাজারে কার্যত এক ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হয়। হাটহাজারী থেকে আতুরার ডিপো এলাকায় আসা মৌসুমি ব্যবসায়ী এনামুল হক জানান, তিনি প্রায় ২৩০টির মতো গরুর চামড়া সংগ্রহ করেছিলেন এবং প্রতিটি চামড়ার পেছনে ক্রয় ও যাতায়াত বাবদ গড়ে প্রায় ৩০০ টাকা খরচ হয়েছিল।
কিন্তু আড়তদারেরা প্রতিটি চামড়ার দাম সর্বোচ্চ ৫০ থেকে ১০০ টাকা বলতে থাকায় গাড়িভাড়ার টাকা তুলতে না পেরে বাধ্য হয়ে তিনি চামড়া রাস্তায় ফেলে গেছেন। একইভাবে মোহাম্মদ রহিম মিয়া নামের আরেক বড় ব্যবসায়ী জানান, তিনি ৬০০টির বেশি চামড়া সংগ্রহ করে মাত্র ২৫৫টি চামড়া ১০০ টাকা দরে লোকসানে বিক্রি করতে পেরেছেন এবং বাকি চামড়াগুলোর কোনো ক্রেতা না পাওয়ায় তা সড়কের পাশেই ফেলে যাচ্ছেন।
সার্বিক বাজারের এই বিপর্যস্ত পরিস্থিতি নিয়ে চট্টগ্রাম বৃহত্তর কাঁচা চামড়া আড়তদার ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি মো. মুসলিম উদ্দিন জানান, চট্টগ্রামে একসময় দুই ডজন ট্যানারি সচল থাকলেও বর্তমানে মাত্র একটি ট্যানারি কোনোমতে চালু আছে, যারা বছরে বড়জোর এক থেকে দুই লাখ চামড়া কিনতে পারে। ফলে চট্টগ্রামের আড়তদারদের সম্পূর্ণভাবে ঢাকার ট্যানারি মালিকদের ওপর নির্ভর করতে হয়।
ঢাকার ট্যানারি মালিকরা সব সময় বাকিতে চামড়া কেনায় স্থানীয় আড়তদারদের হাতে পর্যাপ্ত নগদ টাকা থাকে না। তিনি আরও দাবি করেন, অনেক আড়তদার ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা দামেও ভালো চামড়া কিনেছেন, তবে মৌসুমি ব্যবসায়ীদের ফেলে যাওয়া চামড়াগুলোর বেশিরভাগই ত্রুটিযুক্ত, কাটা এবং নিম্নমানের ছিল।
উল্লেখ্য, চলতি বছর সরকারের পক্ষ থেকে ঢাকার বাইরে প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম ৫৭ থেকে ৬২ টাকা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছিল। তবে মাঠপর্যায়ে সরকারের এই বেঁধে দেওয়া দামের কোনো প্রতিফলন বা প্রভাব দেখা যায়নি বলে সাধারণ ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের দাবি, ট্যানারি মালিক ও বড় আড়তদারদের পারস্পরিক সিন্ডিকেট এবং কৃত্রিমভাবে কম দাম নির্ধারণের অভ অভ্যাসের কারণে মাঠপর্যায়ের পুরো চামড়া বাজার-ব্যবস্থাই এবার সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে।
সময়ের আলো/টিএইচ