চলতি বছরের শুরুতে মার্কিন-ইসরায়েলি জোটের সাথে ইরানের যে রক্তক্ষয়ী সংঘাত শুরু হয়েছিল, তাতে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) পর্দার আড়ালে থেকে অত্যন্ত আগ্রাসী ও বড় ধরনের সামরিক ভূমিকা পালন করেছে। গত ফেব্রুয়ারি মাসে যুদ্ধ শুরুর প্রথম দিনগুলো থেকে শুরু করে এপ্রিলের যুদ্ধবিরতি পর্যন্ত ইরানজুড়ে ডজন ডজন বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে আবুধাবি, যা আগে প্রকাশ পাওয়া তথ্যের চেয়ে বহুগুণ বেশি। গতকাল শুক্রবার মার্কিন প্রভাবশালী দৈনিক ‘ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’ (ডব্লিউএসজে)-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই বিস্ফোরক তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের তেল পরিবহনের অন্যতম প্রধান রুট হরমুজ প্রণালীর কৌশলগত কিশমি ও আবু মুসা দ্বীপ, বন্দর নগরী বন্দর আব্বাস, লাভান দ্বীপের তেল শোধনাগার এবং আসালুয়েহ পেট্রোকেমিক্যাল কমপ্লেক্সকে লক্ষ্য করে এই ব্যাপক বিমান হামলা চালায় আমিরাত। মার্কিন ও ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এই হামলার লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে অত্যন্ত নিখুঁত ও নিবিড় গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করেছিল।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধ চলাকালীন ইরান কর্তৃক আমিরাতের অভ্যন্তরীণ তেল ও শিল্প অবকাঠামোতে হামলার জবাবেই মূলত আবুধাবি এই পাল্টা ও বিধ্বংসী আক্রমণ শুরু করে। শুধু আমিরাত নয়, ইসরায়েলও ইরানের ‘আসালুয়েহ’ জ্বালানি কেন্দ্রে একযোগে হামলা চালিয়েছিল। তবে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়া এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কায় পরবর্তীতে আমেরিকা নিজেই ইসরায়েলকে ইরানের তেল ও জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা বন্ধের জন্য অনুরোধ করতে বাধ্য হয়।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, ইরানের ভেতরে আমিরাতের এই ব্যাপক ও অনিয়ন্ত্রিত সামরিক তৎপরতা পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের আরব দেশগুলোর মধ্যে, বিশেষ করে সৌদি আরব ও আমিরাতের মধ্যকার সম্পর্কে তীব্র ফাটল ও কূটনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি করে। পুরো অঞ্চলে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়া এবং নিজেদের তেল ক্ষেত্রগুলো ইরানের হামলার শিকার হতে পারে— এই আশঙ্কায় রিয়াদ ওয়াশিংটনের ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করে। সৌদি আরব আমিরাতকে এই আগ্রাসী সামরিক অভিযান বন্ধ করে অবিলম্বে কূটনৈতিক উপায়ে সংকট সমাধানের টেবিলে ফিরে আসার জন্য মার্কিন প্রশাসনকে মধ্যস্থতা করতে বাধ্য করে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু থেকে ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়া পর্যন্ত, ইরান এককভাবে সংযুক্ত আরব আমিরাতকে লক্ষ্য করে প্রায় ৫৫০টি ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ২,২০০টিরও বেশি ড্রোন নিক্ষেপ করেছে। এর ফলে এই যুদ্ধে ইসরায়েলের চেয়েও আমিরাত বেশি আক্রান্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত রাষ্ট্রে পরিণত হয়। এমনকি যুদ্ধবিরতির মধ্যেও সম্প্রতি আমিরাতের একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ড্রোন হামলা চালিয়েছে তেহরান।
তবে ইরানের এই অভিন্ন হুমকি মোকাবিলায় আমিরাত ও ইসরায়েলের মধ্যকার কৌশলগত সম্পর্ক আরও ঘনীভূত হয়েছে। যুদ্ধ চলাকালীন আমিরাতের আকাশসীমা সুরক্ষায় ইসরায়েল তাদের অত্যাধুনিক ‘আয়রন ডোম’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং সেটি পরিচালনার জন্য নিজেদের সেনা দল আবুধাবিতে পাঠায়। সূত্রমতে, যুদ্ধবিরতির পরও ডজন ডজন ইসরায়েলি সেনা এখনো আমিরাতে অবস্থান করছে। এছাড়া যুদ্ধ চলাকালীন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুসহ শীর্ষ সামরিক কর্তারা গোপনে আবুধাবি সফর করেছেন বলে দাবি করা হলেও, আবুধাবি অবশ্য নেতানিয়াহুর সফরের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে অস্বীকার করেছে।
উল্লেখ্য, ২০২০ সালে ঐতিহাসিক ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’ বা আব্রাহাম চুক্তির মাধ্যমে ইরানকে যৌথ শত্রু বিবেচনা করে ইসরায়েল ও সংযুক্ত আরব আমিরাত তাদের কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সম্পর্ক স্থাপন করেছিল।
/কহু