ধূমপান ও তামাকজাত পণ্যের মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব শুধু ফুসফুস কিংবা হৃদযন্ত্রের কার্যকারিতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি মানুষের হাড় ও মেরুদণ্ডের স্বাস্থ্যের ওপরও অত্যন্ত গুরুতর এবং দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিশেষজ্ঞরা।
চিকিৎসকদের মতে, তামাকের মধ্যে থাকা ক্ষতিকর নিকোটিন মানুষের শরীরের স্বাভাবিক রক্তপ্রবাহকে অনেকাংশে কমিয়ে দেয়, যা হাড়ের স্বাভাবিক বৃদ্ধি, গঠন এবং ক্ষতিগ্রস্ত অংশ মেরামতের প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ ব্যাহত করে।
হিন্দুস্তান টাইমসের বরাতে প্রতিবেদনে জানানো হয়, চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী মানুষের হাড় মূলত একটি অত্যন্ত সক্রিয় টিস্যু, যা নিয়মিত নিজস্ব পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়। কিন্তু দীর্ঘদিন ধূমপানের অভ্যাসের কারণে হাড়ে প্রয়োজনীয় রক্ত ও পুষ্টি সরবরাহ মারাত্মকভাবে কমে যায়।
এর ফলে কোনো কারণে শরীরের হাড় ভেঙে গেলে তা প্রাকৃতিকভাবে সেরে উঠতে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি সময় লাগে এবং অনেক ক্ষেত্রে হাড় আর কোনোদিনই ঠিকমতো জোড়া লাগতে পারে না। চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় হাড় জোড়া না লাগার এই জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থাকে ‘নন-ইউনিয়ন’ বলা হয়ে থাকে।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা সতর্ক করে জানিয়েছেন যে তামাকের এই বিষাক্ত প্রভাব মানুষের মেরুদণ্ডেও সমানভাবে পড়ে। মানুষের মেরুদণ্ডের ডিস্কগুলো মূলত শরীরের সামগ্রিক ভারসাম্য বজায় রাখা এবং যেকোনো বাহ্যিক আঘাতের চাপ কমাতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
দীর্ঘদিন ধরে তামাক সেবন বা ধূমপান করলে মেরুদণ্ডের এই ডিস্কগুলো খুব দ্রুত ক্ষয়প্রাপ্ত হতে শুরু করে, যার সরাসরি ফলে তীব্র কোমর ব্যথা, ডিস্ক স্লিপ এবং মেরুদণ্ডের সংবেদনশীল স্নায়ুর ওপর অতিরিক্ত চাপজনিত নানা ধরনের জটিল শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়।
এ ছাড়া নিয়মিত ধূমপান মানুষের শরীরে ‘অস্টিওপোরোসিস’ নামক একটি জটিল রোগের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এই রোগে আক্রান্ত হলে মানুষের হাড় ভেতরে অত্যন্ত দুর্বল ও ভঙ্গুর হয়ে পড়ে এবং সামান্য আঘাতেই তা ভেঙে যাওয়ার সম্ভাবনা মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পায়। সাধারণত বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই রোগের ঝুঁকি বাড়লেও দীর্ঘদিন ধরে যাঁরা তামাক ব্যবহার করছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত কম বয়সেই এই হাড় ক্ষয়ের সমস্যা দেখা দিতে পারে।
চিকিৎসকদের মতে, শুধু সিগারেট বা ধূমপানই নয়, জর্দা, গুটখা বা চিবিয়ে খাওয়া তামাকও মানুষের শরীরের জন্য সমানভাবে ক্ষতিকর, কারণ নিকোটিন যেকোনো উপায়ে শরীরে প্রবেশ করলেই তা হাড়ের স্বাভাবিক কার্যক্রমকে ধ্বংস করে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা আরও পরামর্শ দিয়েছেন যে হাড় ভাঙা বা হাড়ের যেকোনো বড় অস্ত্রোপচারের আগে ও পরে রোগীরা যদি ধূমপানের অভ্যাস সম্পূর্ণ বন্ধ করতে পারেন, তবে তাঁদের দ্রুত সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বাড়ে এবং অস্ত্রোপচার-পরবর্তী জটিলতার ঝুঁকিও হ্রাস পায়।
তাই দীর্ঘস্থায়ী কোমর ব্যথা কিংবা বারবার হাড় ভাঙার মতো জটিল সমস্যার ক্ষেত্রে ধূমপান ও তামাকের ক্ষতিকর অভ্যাসকে অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচনা করে তা অবিলম্বে বর্জন করার জোরালো পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকেরা।
সূত্র: হিন্দুস্তান টাইমস