দক্ষিণ এশিয়ার দুই প্রতিবেশী দেশ ভারত ও পাকিস্তানে চলমান দীর্ঘস্থায়ী ও তীব্র তাপপ্রবাহ ভয়াবহ মানবিক ও পরিবেশগত সংকট সৃষ্টি করেছে। ‘দ্য কনভারসেশন’-এর এক বিশ্লেষণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের এই তাপপ্রবাহ অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে নতুন মাত্রা পেয়েছে।
সাধারণত জুন মাসে মৌসুমি বায়ু প্রবেশের আগে মে মাসে এই অঞ্চলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলেও এবার পরিস্থিতি ছিল ব্যতিক্রমী। এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে শুরু হওয়া তাপপ্রবাহ মে মাসের শেষ পর্যন্ত অব্যাহত রয়েছে। বহু এলাকায় তাপমাত্রা ৪৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়েছে, যা স্বাভাবিকের তুলনায় ৫ থেকে ৮ ডিগ্রি বেশি।
এই তীব্র গরমের কারণে ভারতে বিদ্যুতের চাহিদা রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে ভারত ও পাকিস্তানের প্রায় ১০ লাখ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে চলমান খরা পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ইতোমধ্যে ভারতে অন্তত ৩৭ জন এবং পাকিস্তানে ১০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে, যদিও প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ বছরের তাপপ্রবাহের অন্যতম প্রধান কারণ হলো দীর্ঘস্থায়ী উচ্চ-চাপ বলয় (Persistent High-Pressure System)। এই বলয় মেঘ গঠন ও বৃষ্টিপাত বাধাগ্রস্ত করে, ফলে গরম বাতাস আটকে গিয়ে দিনের পর দিন তাপমাত্রা বাড়তে থাকে।
বৃষ্টির অভাবে মাটির আর্দ্রতাও দ্রুত শুকিয়ে যায়। এতে সূর্যের তাপ বাষ্পীভবনের কাজে ব্যয় না হয়ে সরাসরি ভূমিকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে। শহরাঞ্চলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে ওঠে ‘আরবান হিট আইল্যান্ড’ প্রভাবের কারণে। কংক্রিট ও পিচঢালা রাস্তা দিনে তাপ শোষণ করে এবং রাতে ধীরে ধীরে তা ছেড়ে দেয়, ফলে রাতেও তাপমাত্রা কমে না।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই চরম আবহাওয়ার পেছনে দীর্ঘমেয়াদি প্রধান কারণ হলো বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন। ‘ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশন’-এর হিসাব অনুযায়ী, এপ্রিলের তাপপ্রবাহ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রায় তিন গুণ বেশি সম্ভাব্য এবং প্রায় ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি উষ্ণ হয়েছে।
বর্তমানে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা প্রাক-শিল্প যুগের তুলনায় প্রায় ১.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে শতাব্দীর শেষে বৈশ্বিক উষ্ণতা ২.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাতে পারে। তখন দক্ষিণ এশিয়ায় এমন তাপপ্রবাহ প্রতি দুই থেকে তিন বছর পরপর দেখা দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু তাপমাত্রা নয়, উচ্চ আর্দ্রতাই পরিস্থিতিকে সবচেয়ে বেশি প্রাণঘাতী করে তুলছে। মানুষের শরীর ঘামের মাধ্যমে নিজেকে ঠান্ডা রাখে। কিন্তু বাতাসে আর্দ্রতা বেশি থাকলে ঘাম সহজে বাষ্পীভূত হতে পারে না। ফলে শরীরের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা ক্রমশ বাড়তে থাকে এবং হিটস্ট্রোকের ঝুঁকি তৈরি হয়।
এই পরিস্থিতিকে বিজ্ঞানীরা ‘লেথাল হিউমিডিটি’ বা প্রাণঘাতী আর্দ্রতা হিসেবে অভিহিত করেন। শরীরের তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হয়ে গেলে মস্তিষ্ক ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং দ্রুত চিকিৎসা না পেলে মৃত্যুও ঘটতে পারে।
তাপপ্রবাহের প্রভাব সমাজের সব শ্রেণির মানুষের ওপর সমানভাবে পড়ে না। এসি বা উন্নত শীতলীকরণ সুবিধা থাকা মানুষ তুলনামূলক নিরাপদ থাকলেও দরিদ্র জনগোষ্ঠী, বস্তিবাসী, কৃষক, নির্মাণ শ্রমিক, ডেলিভারি কর্মী এবং অন্যান্য বহিরাঙ্গন শ্রমজীবীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন।
রাতের তাপমাত্রা বেশি থাকাও বড় সমস্যা হয়ে উঠেছে। কারণ শরীর দিনের গরম থেকে পুনরুদ্ধারের জন্য রাতের শীতল পরিবেশের ওপর নির্ভর করে। কিন্তু শহরাঞ্চলে সেই সুযোগ ক্রমেই কমে যাচ্ছে।
আবহাওয়াবিদদের মতে, দক্ষিণ ভারতে জুনের শুরুতে এবং পাকিস্তানে জুলাইয়ের শুরুতে মৌসুমি বায়ু প্রবেশ করলে বৃষ্টিপাতের মাধ্যমে তাপমাত্রা কিছুটা কমতে পারে। তবে আর্দ্রতা তখনও বেশি থাকবে।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা, এটি কোনো সাময়িক সংকট নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে দক্ষিণ এশিয়াকে আরও ঘন ঘন, আরও দীর্ঘস্থায়ী এবং আরও প্রাণঘাতী তাপপ্রবাহের মুখোমুখি হতে হবে। ফলে জনস্বাস্থ্য, কৃষি, অর্থনীতি এবং জীবনযাত্রার ওপর এর প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী।
/এসএকে