প্রতি বছর লাখ লাখ স্যামন মাছ প্রশান্ত মহাসাগর থেকে ফিরে আসে তাদের জন্মস্থানসংলগ্ন নদী ও স্রোতধারায়। প্রজননের জন্য নদীর উজানে মাছের এই ফিরে আসাকে বলা হয় ‘স্যামন রান’। প্রবল স্রোতের বিপরীতে সাঁতার কেটে, অনেক সময় জলপ্রপাত পেরিয়ে এসব মাছকে শত শত এমনকি হাজার হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়।
প্রশান্ত মহাসাগরের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন নদীতে তখন বিপুলসংখ্যক স্যামন দেখা যায়। রুপালি, গোলাপি ও লালচে রঙের মাছগুলো দল বেঁধে নদীর উজানে ওঠে। এই দৃশ্য দেখতে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার বিভিন্ন এলাকায় প্রতি বছর পর্যটকরা যান।
তবে নদীতে ওঠার সময় স্যামনকে শুধু স্রোতের সঙ্গে লড়াই করতে হয় না। নদীর ধারে অপেক্ষা করে থাকে ভালুক। সুযোগ পেলেই তারা পানির ওপর লাফিয়ে ওঠা স্যামন ধরে খায়। আলাস্কার ব্রুকস ফলস এ ধরনের দৃশ্য দেখার জন্য সবচেয়ে পরিচিত স্থানগুলোর একটি।
উত্তর আমেরিকায় প্রশান্ত মহাসাগরীয় স্যামনের পাঁচটি প্রধান প্রজাতি রয়েছে— চিনুক, কোহো, সকি, চাম ও পিংক। ক্যালিফোর্নিয়া থেকে ব্রিটিশ কলাম্বিয়া হয়ে আলাস্কা পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকায় এসব মাছ পাওয়া যায়।
প্রজাতি ও অঞ্চলভেদে নদীতে ফেরার সময়ও আলাদা। তাই কোনো এলাকায় স্যামনের বড় দল দেখা গেলেও অন্য এলাকায় তখন তাদের যাত্রা শুরু নাও হতে পারে।
জন্ম নদীতে, বড় হয় সাগরে : স্যামনের জীবন শুরু হয় মিঠাপানিতে। নদী ও স্রোতধারায় জন্মের পর ছোট মাছগুলো কিছু দিন সেখানে বেড়ে ওঠে। পরে খাবারের সন্ধানে সমুদ্রে চলে যায়।
সমুদ্রে যাওয়ার আগে তাদের শরীরে পরিবর্তন আসে। ফুলকা এমনভাবে বদলে যায়, যাতে লবণাক্ত পানিতে শরীরের অতিরিক্ত লবণ বের করে দিতে পারে। এই পরিবর্তন না হলে সমুদ্রের পানিতে তারা টিকে থাকতে পারত না।
স্যামন সমুদ্রে যায় মূলত খাবারের জন্য। নদীতে খাবার তুলনামূলক কম থাকায় বড় হওয়ার জন্য সমুদ্র তাদের জন্য বেশি উপযোগী। প্রজাতিভেদে এক থেকে সাত বছর পর্যন্ত সমুদ্রে কাটানোর পর পূর্ণবয়স্ক স্যামন আবার মিঠাপানিতে ফিরে আসে। তখন তাদের লক্ষ্য থাকে প্রজনন করা।
প্রজননের আগে চলে লড়াই : নদীতে ফিরে স্ত্রী স্যামন নদীর তলদেশে নুড়ি ও পাথরের মধ্যে গর্ত তৈরি করে ডিম পাড়ে। এই বাসাকে বলা হয় ‘রেড’। নদীর পরিষ্কার পানি ডিমের ওপর জমে থাকা পলি সরিয়ে দেয় এবং অক্সিজেন সরবরাহ করে। পুরুষ স্যামন স্ত্রী মাছকে আকৃষ্ট করতে শরীর কাঁপিয়ে বিশেষ ভঙ্গিতে সাঁতার কাটে।
আবার অন্য পুরুষের সঙ্গে আধিপত্য নিয়ে লড়াইও করে। এ সময় তারা বড় দাঁত দিয়ে একে অন্যকে কামড়াতে পারে। প্রজননের পর অধিকাংশ প্রশান্ত মহাসাগরীয় স্যামন মারা যায়। তাদের মৃতদেহ পরে নদীর বিভিন্ন প্রাণীর খাবারে পরিণত হয়।
স্যামনের ওপর নির্ভর করে অনেক প্রাণী : সমুদ্র থেকে নদীতে ফেরার সময় স্যামনের শরীরে কার্বন, ফসফরাস ও নাইট্রোজেনের মতো পুষ্টি উপাদান থাকে। মাছ মারা যাওয়ার পর এসব উপাদান নদী ও আশপাশের স্থলভাগে ছড়িয়ে পড়ে। মরা স্যামন খায় ভালুক, কোয়োট, বাল্ড ঈগল, কাক ও নদীর ভোঁদড়সহ বিভিন্ন প্রাণী। ছোট জলজ প্রাণী ও পোকামাকড়ও স্যামনের মৃতদেহ থেকে খাদ্য পায়।
বিশেষ করে ভালুক স্যামনের মৃতদেহ নদী থেকে টেনে স্থলভাগে নিয়ে যায়। এতে সমুদ্র থেকে আসা পুষ্টি মাটিতেও পৌঁছে যায়। গবেষণায় আশপাশের আঙুরক্ষেতেও স্যামন থেকে আসা সামুদ্রিক পুষ্টির উপাদান পাওয়া গেছে।
কোথায় দেখা যায় স্যামন? : স্যামন দেখার জন্য আলাস্কা অন্যতম জনপ্রিয় স্থান। কাটমাই ন্যাশনাল পার্কের ব্রুকস ফলস, কেনাই উপদ্বীপের রাশিয়ান রিভার ফলস এবং অ্যাঙ্কোরেজের কাছে উইলিয়াওয়াহ ক্রিক পরিচিত কয়েকটি জায়গা।
ব্রুকস ফলসে স্যামন ও ভালুক দুটিই দেখা যায়। স্যামন জলপ্রপাত পেরিয়ে ওপরে ওঠার সময় ভালুক তাদের ধরার চেষ্টা করে। অনেক সময় লাফিয়ে ওঠা মাছকে মাঝপথেই ধরে ফেলে ভালুক। বড় নদী ছাড়াও ব্রিটিশ কলাম্বিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব আলাস্কার ছোট ছোট স্রোতধারায় স্যামনের দেখা মেলে।
সেপ্টেম্বরে ওয়াশিংটনের সালমন ক্যাসকেডসে কোহো স্যামন এবং ওরেগনের ক্ল্যাকামাস কাউন্টিতে চিনুক স্যামন দেখা যায়। অক্টোবরে ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার অ্যাডামস নদীতে সকি স্যামনের বড় দল ফিরে আসে।
অ্যাডামস নদীতে সকি স্যামনের বড় ধরনের আগমন সাধারণত চার বছর পরপর দেখা যায়। এ সময় স্থানীয়ভাবে ‘স্যালুট টু দ্য সকি’ নামে উৎসবও হয়।
স্যামনের দীর্ঘ যাত্রার একটি বড় উদাহরণ ইউকন নদী। চিনুক স্যামন সমুদ্র থেকে প্রায় ৩ হাজার কিলোমিটার উজানে সাঁতরে ব্রিটিশ কলাম্বিয়া পর্যন্ত যেতে পারে। আবার কিছু স্যামন সমুদ্র থেকে মাত্র এক কিলোমিটার দূরের নদীতেই প্রজনন করে। অর্থাৎ প্রজাতি ও অবস্থান অনুযায়ী তাদের যাত্রার দূরত্ব অনেকটা ভিন্ন।
যারা সরাসরি এই দৃশ্য দেখতে যেতে পারেন না, তারাও অনলাইনে দেখতে পারেন। বিভিন্ন জায়গা থেকে ‘ঝধষসড়হঈধস’-এর মাধ্যমে স্যামনের চলাচল সরাসরি দেখানো হয়।
কমছে স্যামনের সংখ্যা : স্যামনের এই যাত্রা এখন বিভিন্ন কারণে হুমকির মুখে। দূষণ, অতিরিক্ত মাছ শিকার, নগরায়ণ, বাঁধ নির্মাণ ও খনন কার্যক্রম তাদের আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত করছে। নদীতে বাঁধ নির্মাণ স্যামনের জন্য বড় সমস্যা। কারণ প্রজননের সময় তাদের নদীর উজানে যেতে হয়। বাঁধ থাকলে অনেক মাছ আর ওপরে যেতে পারে না।
তবে কিছু জায়গায় বাঁধ সরিয়ে ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে। ক্যালিফোর্নিয়ার উত্তরাঞ্চল ও দক্ষিণ ওরেগনের ক্লামাথ নদীতে প্রায় ১০০ বছর ধরে স্যামনের চলাচলে বাধা হয়ে থাকা চারটি বড় বাঁধ সরিয়ে ফেলা হয়েছে। শেষ বাঁধটি সরানোর পর প্রায় ১০ হাজার চিনুক স্যামন ওই এলাকা পেরিয়ে নদীর আরও উজানে যেতে পেরেছে।
গবেষকদের মতে, স্যামনের সংখ্যা আবার বাড়ানো সম্ভব। এ জন্য দূষণ কমানো, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখা, মাছের আবাসস্থল রক্ষা এবং অতিরিক্ত মাছ শিকার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
স্যামন শুধু একটি মাছ নয়। নদী ও সমুদ্রের মধ্যে পুষ্টি পরিবহন এবং বিভিন্ন প্রাণীর খাদ্য হিসেবে এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। স্যামনের সংখ্যা কমে গেলে এর প্রভাব নদীর অন্য প্রাণী ও পুরো বাস্তুতন্ত্রের ওপর পড়তে পারে।
তাই স্যামনের প্রজননস্থল ও চলাচলের পথ রক্ষা করা জরুরি। এতে ভবিষ্যতেও নদীতে স্যামনের এই বার্ষিক যাত্রা দেখা সম্ভব হবে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও