সকালের এক কাপ ধোঁয়া ওঠা গরম কফি শুধু যে মানুষের অলস ঘুম তাড়ায় তা নয়, এটি দৈনন্দিন কর্মক্ষমতা ও মনোযোগ বৃদ্ধিতেও দারুণ সাহায্য করে। তবে কফি সত্যিই মানসিক চাপ কমাতে পারে কি না, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের জিজ্ঞাসার অন্ত নেই। আন্তর্জাতিক স্তরের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, কফি পানের অভ্যাসের সঙ্গে মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের একটি অত্যন্ত গভীর ও ইতিবাচক যোগসূত্র রয়েছে। তবে এর প্রকৃত সুফল পেতে হলে জানতে হবে ঠিক কতটুকু কফি আপনার শরীরের জন্য আদর্শ।
বিশ্বখ্যাত চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী ‘জার্নাল অফ অ্যাফেক্টিভ ডিজঅর্ডারস’-এ প্রকাশিত একটি নতুন গবেষণায় বলা হয়েছে, নিয়মিত পরিমিত পরিমাণ কফি পান করলে মানসিক চাপ এবং মেজাজ বা মুড সংক্রান্ত নানা জটিলতা অনেকটাই কমে আসে। চিকিৎসা গবেষকদের মতে, দৈনিক ২ থেকে ৩ কাপ কফি পান করা হলো মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে আদর্শ পরিমাপ বা ‘সুইট স্পট’। এই সুনির্দিষ্ট পরিমাণ কফি পানে শরীরে বিষণ্নতা, অবসাদ ও উদ্বেগের মতো মানসিক সমস্যার ঝুঁকি সবচেয়ে কম থাকে।
অনেকেই মনে করেন বেশি কফি পান করলেই হয়তো বেশি সতেজতা পাওয়া সম্ভব, তবে গবেষণায় দেখা গেছে যে দৈনিক ৩ কাপের বেশি কফি পান করলে এর সুফল আর পাওয়া যায় না, বরং তা উল্টো শরীরের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। অতিরিক্ত কফি পানে রাতের ঘুমের স্বাভাবিক ব্যাঘাত ঘটে, শারীরিক অস্থিরতা বৃদ্ধি পায় এবং উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তা আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে। গবেষকেরা একে একটি ‘জে-শেপড’ বা ইংরেজি ‘J-shaped’ সম্পর্কের সাথে তুলনা করেছেন, যার অর্থ হলো কফি পানের পরিমাণ একটি নির্দিষ্ট স্বাস্থ্যকর সীমা পার হয়ে গেলেই তার উপকারিতা দ্রুত কমতে শুরু করে।
মজার ব্যাপার হলো, ক্যাফিনমুক্ত বা ‘ডিক্যাফ’ কফি পানের ক্ষেত্রেও মানুষের মানসিক প্রশান্তির একই ধরনের ইতিবাচক ফলাফল লক্ষ্য করা গেছে। এর থেকে পুষ্টিবিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন যে, কফির এই বিশেষ গুণটি কেবল ক্যাফিনের একক উপস্থিতির জন্য নয়, বরং এতে থাকা শক্তিশালী অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট বা অন্যান্য প্রাকৃতিক জৈব উপাদানের কারণেও হতে পারে।
পুষ্টিবিদদের মতে, কফি পান করার যে একটি নির্দিষ্ট সুন্দর সামাজিক প্রেক্ষাপট বা নিয়ম থাকে, সেটিও মানুষের মন ভালো রাখতে পরোক্ষ ভূমিকা রাখে। যেমন বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে দিতে কিংবা একঘেয়ে কাজের ফাঁকে একটু বিরতি নিয়ে কফি পান করা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে একটি চমৎকার শৃঙ্খলা ও মানসিক প্রশান্তি এনে দেয়।
কফি মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখতে অনন্য সাহায্য করলেও এটি কিন্তু কোনো গুরুতর মানসিক রোগের বিকল্প আসল চিকিৎসা নয়। তাই চিকিৎসকদের মতে, তীব্র বিষণ্নতা বা উদ্বেগের চিকিৎসার জন্য শুধু কফির ওপর অন্ধভাবে নির্ভর করা উচিত হবে না। এর পাশাপাশি প্রত্যেকের শরীরের ক্যাফিন সহ্য করার ব্যক্তিগত ক্ষমতাও সম্পূর্ণ আলাদা হয়, যেখানে কারো জন্য ২ কাপ কফি খুব ভালো কাজ করে, আবার কারো জন্য সেই একই পরিমাণ কফি বুকধড়ফড়ানি বা অস্থিরতার কারণ হতে পারে।
সর্বোপরি মনে রাখা জরুরি যে, কফি আপনার প্রাত্যহিক জীবনযাত্রার একটি স্বাস্থ্যকর অংশ হতে পারে, তবে এটিই সুস্থতার শেষ কথা নয়। বাস্তব জীবনে মানসিক চাপ কমাতে কফি পানের পাশাপাশি দৈনিক পর্যাপ্ত ঘুম, সুষম খাদ্যতালিকা অনুসরণ এবং নিয়মিত শরীরচর্চার গুরুত্ব অপরিসীম।
একই সঙ্গে কফিতে অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত চিনি বা ক্রিম ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সচেতন হওয়া প্রয়োজন, কারণ এই উপাদানগুলো মূল গবেষণার অন্তর্ভুক্ত ছিল না। তাই সারাদিন চনমনে থাকতে এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে নিয়ম মেনে দৈনিক ২ থেকে ৩ কাপ কফিতেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখার চেষ্টা করুন।
সময়ের আলো/টিএইচ