ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অনেকেরই বুকে এক ধরনের চাপ ভাব তৈরি হয়, সিঁড়ি দিয়ে উঠতে গেলে বুক ধড়ফড় করে, শ্বাস নিতে কষ্ট হয় কিংবা সামান্য হাঁটাহাঁটিতেই বুক ভার লাগা- এসব উপসর্গ দেখলে অনেকেই ধরে নেন এটি হাঁপানি বা অ্যাজমা। তবে এর পেছনে থাকতে পারে হৃদরোগ, ফুসফুসের সংক্রমণ, অ্যালার্জি, রক্তস্বল্পতা, এমনকি মানসিক চাপও।
আমাদের সমাজে সাধারণ একটি ধারণা প্রচলিত রয়েছে যে, শ্বাসকষ্ট মানেই সেটি হাঁপানি বা অ্যাজমা। শ্বাসকষ্ট মূলত কোনো নির্দিষ্ট রোগ নয় বরং শরীরে অন্য কোনো সমস্যার উপসর্গ। হাঁপানি ছাড়াও ফুসফুসের একাধিক জটিলতার কারণে এই সমস্যা হতে পারে।
এর মধ্যে অন্যতম প্রধান একটি কারণ হলো সিওপিডি বা ক্রনিক অবস্ট্রাক্টিভ পালমোনারি ডিজিজ। সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি ধূমপান বা অতিরিক্ত বায়ুদূষণের কারণে এই রোগটি হয়, যেখানে ফুসফুসের শ্বাসনালিগুলো স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও সংকীর্ণ হয়ে পড়ে। হাঁপানির সঙ্গে এর বড় পার্থক্য হলো, সঠিক চিকিৎসায় হাঁপানি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হলেও সিওপিডির ক্ষতি অনেকটাই স্থায়ী হয়।
সিওপিডি ছাড়াও ফুসফুসের বেশ কিছু দীর্ঘস্থায়ী রোগ শ্বাসকষ্টের জন্য দায়ী হতে পারে।
ইন্টারস্টেশিয়াল লাং ডিজিজ : এই রোগে ফুসফুসের টিস্যুগুলো শক্ত বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যায়, ফলে ফুসফুস পর্যাপ্ত পরিমাণে অক্সিজেন রক্তে সরবরাহ করতে পারে না। একটু পরিশ্রম করলেই তখন তীব্র শ্বাসকষ্ট শুরু হয়।
ফুসফুসে পানি জমা : ফুসফুসের চারপাশে যে পর্দা থাকে, সেখানে অতিরিক্ত তরল জমা হলে ফুসফুস স্বাভাবিকভাবে সংকুচিত ও প্রসারিত হতে পারে না।
নিউমোনিয়া বা ব্রঙ্কাইটিস : ফুসফুসের তীব্র ইনফেকশন বা ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণের ফলেও হঠাৎ করে তীব্র শ্বাসকষ্ট দেখা দিতে পারে, যার সঙ্গে প্রায়ই জ্বর ও কফ থাকে।
সবসময় যে ফুসফুসের সমস্যার কারণেই মানুষ দম আটকে যাওয়ার অনুভূতিতে ভুগবেন, তা কিন্তু নয়। অনেক সময় হৃৎপিণ্ডের দুর্বলতার কারণেও শ্বাসকষ্ট হয়, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘কার্ডিয়াক অ্যাজমা’ বলা হয়ে থাকে। হার্ট ফেইলিউর বা হৃৎপিণ্ডের রক্ত পাম্প করার ক্ষমতা কমে গেলে ফুসফুসে রক্ত ও তরল জমে যায়।
এর ফলে বিশেষ করে রাতে শুয়ে থাকার সময় তীব্র শ্বাসকষ্ট শুরু হয়, যা রোগীকে উঠে বসতে বাধ্য করে। এ ছাড়া রক্তস্বল্পতা বা অ্যানিমিয়া এবং তীব্র মানসিক দুশ্চিন্তা বা প্যানিক অ্যাটাকের কারণেও সাময়িকভাবে দম আটকে আসার মতো অনুভূতি হতে পারে।
হৃদরোগেও হতে পারে শ্বাসকষ্ট : অনেক সময় হৃদযন্ত্র দুর্বল হয়ে গেলে শরীরে পর্যাপ্ত অক্সিজেন পৌঁছায় না। তখন রোগী হাঁটতে গেলে বা শুয়ে থাকলে শ্বাস নিতে কষ্ট অনুভব করেন। বিশেষ করে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস বা হৃদরোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এটি বেশি দেখা যায়।
কার্ডিওলজিস্ট ডা. মো. আবু তাহার মতে, হৃদরোগজনিত শ্বাসকষ্টের সঙ্গে পা ফুলে যাওয়া, বুক ধড়ফড় করা বা অতিরিক্ত ক্লান্তি থাকতে পারে। তাই এ ধরনের লক্ষণ থাকলে দ্রুত পরীক্ষা করানো প্রয়োজন।
ফুসফুসের সংক্রমণ ও অ্যালার্জি : নিউমোনিয়া, ব্রংকাইটিস বা দীর্ঘদিনের ধূমপানের কারণেও শ্বাসকষ্ট হতে পারে। ফুসফুসে সংক্রমণ হলে সাধারণত জ্বর, কাশি ও কফের সঙ্গে শ্বাস নিতে সমস্যা দেখা দেয়।
এ ছাড়া ধুলাবালি, ধোঁয়া, ফুলের রেণু বা পোষা প্রাণীর লোমে অ্যালার্জি থাকলেও সাময়িক শ্বাসকষ্ট হতে পারে। অনেক সময় এটি মৌসুমি সমস্যা হিসেবেও দেখা দেয়।
রক্তস্বল্পতা ও মানসিক কারণ : শরীরে রক্তস্বল্পতা থাকলে পর্যাপ্ত অক্সিজেন পরিবহন ব্যাহত হয়। ফলে রোগী দুর্বলতা ও শ্বাসকষ্ট অনুভব করতে পারেন। বিশেষ করে নারীদের মধ্যে আয়রনের ঘাটতির কারণে এ সমস্যা বেশি দেখা যায়।
অন্যদিকে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা, উদ্বেগ বা প্যানিক অ্যাটাকের সময়ও হঠাৎ শ্বাস বন্ধ হয়ে আসার মতো অনুভূতি হতে পারে। তখন অনেকেই ভয় পেয়ে হাঁপানি ভেবে বসেন।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, মানসিক চাপের কারণে হওয়া শ্বাসকষ্টে সাধারণত বুক ধড়ফড়, হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাওয়া এবং অস্থিরতা থাকে।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন : যদি বারবার শ্বাসকষ্ট হয়, রাতে ঘুম ভেঙে যায়, বুকব্যথা থাকে বা ঠোঁট নীলচে হয়ে যায়, তা হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। কারণ কিছু ক্ষেত্রে শ্বাসকষ্ট জীবনঝুঁকির ইঙ্গিতও হতে পারে।
শ্বাসকষ্টের কারণ নির্ণয়ে চিকিৎসকরা সাধারণত বুকের এক্স-রে, রক্ত পরীক্ষা, স্পাইরোমেট্রি, ইসিজি বা ইকোসহ বিভিন্ন পরীক্ষা করতে দেন।
প্রতিরোধে যা করবেন :
ধূমপান এড়িয়ে চলুনধুলাবালি ও দূষিত পরিবেশে মাস্ক ব্যবহার করুননিয়মিত ব্যায়াম ও ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুনপর্যাপ্ত পানি পান ও পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করুনডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখুনদীর্ঘদিন শ্বাসকষ্ট থাকলে নিজে থেকে ইনহেলার ব্যবহার না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন
শ্বাসকষ্টকে শুধুই হাঁপানি ভেবে অবহেলা করলে অনেক সময় জটিল রোগ শনাক্তে দেরি হয়ে যায়। তাই উপসর্গের প্রকৃত কারণ জানতে সচেতন হওয়া এবং সময়মতো চিকিৎসা নেওয়াই হতে পারে সুস্থ থাকার সবচেয়ে বড় উপায়।