অফিসে দীর্ঘক্ষণ কম্পিউটার স্ক্রিনের সামনে বসে থাকার পর মাঝেমধ্যে হঠাৎ ঘাড়ে বা পিঠে তীব্র ব্যথা অনুভূত হয়। কখনো কখনো সকালে ঘুম থেকে উঠতেই কোমরে তীব্র টনটনে ব্যথা অনুভূতি হয়। আমরা অনেকেই খুব সহজে ধরে নিই, ‘আরে, পেশিতে টান লেগেছে’ বা ‘রগে টান লেগেছে’।
এরপর শুরু হয় ব্যথানাশক ওষুধ খাওয়া, গরম সেঁক দেওয়া কিংবা বাম মালিশ করা। কিন্তু কয়েক দিন যাওয়ার পরও যখন ব্যথা কমে না বরং আরও ছড়িয়ে পড়ে, তখন চিকিৎসকের কাছে গিয়ে জানা যায়- সমস্যাটি আসলে পেশির নয়, ছিল স্নায়ু বা নার্ভের।
ডা. মোহাম্মদ মামুনুর রশিদ বলেন, আমাদের চেম্বারে প্রতিদিন এমন অসংখ্য রোগী আসেন, যারা স্নায়ুর ব্যথাকে পেশির টান ভেবে দীর্ঘদিন ভুল চিকিৎসা করেছেন। এই সাধারণ ভুলটিই পরবর্তীতে রোগীকে এক দীর্ঘমেয়াদি এবং জটিল কষ্টের দিকে ঠেলে দেয়।
লক্ষণ চেনার উপায় : পেশির টান এবং স্নায়ুর ব্যথার ধরন সম্পূর্ণ আলাদা। একটু সচেতন হলেই এদের মধ্যকার পার্থক্য ধরা সম্ভব।
পেশির টান বা ব্যথার লক্ষণ : পেশির ব্যথা সাধারণত নির্দিষ্ট একটি জায়গাতেই সীমাবদ্ধ থাকে। আক্রান্ত স্থানটি ফুলে যেতে পারে বা স্পর্শ করলে শক্ত ও কালশিটে অনুভুত হতে পারে। কোনো ভারী জিনিস তোলা, হঠাৎ ভুল অঙ্গভঙ্গিতে নড়াচড়া করা বা অতিরিক্ত ব্যায়ামের কারণে এটি হয়। বিশ্রামে থাকলে বা সাধারণ সেঁক দিলে এই ব্যথা সাধারণত কয়েক দিনের মধ্যে কমে আসে।
স্নায়ুর ব্যথার লক্ষণ : স্নায়ুর ব্যথা কোনো নির্দিষ্ট জায়গায় আটকে থাকে না, এটি ছড়িয়ে পড়ে। যেমন- কোমরের স্নায়ু চেপে গেলে সেই ব্যথা পায়ের পাতা পর্যন্ত নেমে আসে। এই ব্যথার অনুভূতি তীব্র ও ভিন্ন রকমের হয়। ডা. মোহাম্মদ মামুনুর রশিদ আরও বলেন, রোগীরা বলে মনে হচ্ছে কারেন্টের শক খাচ্ছি, সুঁই ফুটছে কিংবা জ্বালা ও অবশ ভাব হচ্ছে। বিশ্রামে থাকলেও এই ব্যথা কমে না বরং রাতের দিকে বা নির্দিষ্ট কোনো অবস্থানে এর তীব্রতা আরও বেড়ে যায়।
ভুল চিকিৎসার বড় মাশুল : পেশির টানের জন্য আমরা সাধারণত যে ধরনের ব্যথানাশক ওষুধ খেয়ে থাকি, তা স্নায়ুর ব্যথায় তেমন কোনো কাজই করে না। উল্টো দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ব্যথানাশক খাওয়ার ফলে কিডনি বিকল হওয়া, গ্যাস্ট্রিক আলসার বা লিভারের ক্ষতি হওয়ার ঝুঁকি মারাত্মকভাবে বেড়ে যায়।
অন্যদিকে স্নায়ুর সমস্যা অবহেলা করলে বা ভুল ম্যাসাজ (মালিশ) করালে স্নায়ুর ওপর চাপ আরও বাড়ে। এর ফলে স্নায়ু স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, মাংসপেশি শুকিয়ে যেতে পারে এবং একপর্যায়ে আক্রান্ত অঙ্গটি কার্যক্ষমতা বা অনুভূতি হারাতে পারে।
ডাক্তারের পরামর্শ :
লক্ষণ পর্যবেক্ষণ করুন : ব্যথা যদি সুঁই ফোটার মতো, অবশ করা বা বিদ্যুতের চমকের মতো হয় এবং তা ২-৩ দিনের বেশি স্থায়ী হয়, তবে সেটিকে পেশির টান ভাবার ভুল করবেন না।
ব্যথানাশককে ‘না’ বলুন : চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়া ফার্মেসি থেকে নিজে নিজে ব্যথানাশক ওষুধ কিনে খাওয়া বন্ধ করুন। স্নায়ুর ব্যথার জন্য সুনির্দিষ্ট কিছু নিউরোট্রপিক ওষুধ রয়েছে, যা কেবল একজন রেজিস্টার্ড চিকিৎসকই নির্ধারণ করতে পারেন।
সঠিক রোগ নির্ণয় : ঘাড় বা কোমরের স্নায়ু মেরুদণ্ডের হাড়ের ক্ষয়ের কারণে চেপে যাচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনে এক্স-রে বা এমআরআই (গজও) করাতে হবে।
ফিজিওথেরাপি ও জীবনযাত্রা : স্নায়ুর চিকিৎসায় ওষুধপত্রের পাশাপাশি সঠিক ফিজিওথেরাপি এবং লাইফস্টাইল পরিবর্তন (যেমন- সোজা হয়ে বসা, ভারী জিনিস সঠিক নিয়মে তোলা) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ব্যথা শরীরের একটি সতর্কবার্তা। একে অবহেলা করে বা ভুল ভেবে নিজের শরীরে স্থায়ী ক্ষতি ডেকে আনবেন না। সচেতন হোন, সুস্থ থাকুন।
/এসএকে