লেবাননে ইসরায়েলি বাহিনীর উপর্যুপরি বিমান হামলা ও দ্বিপাক্ষিক যুদ্ধবিরতি চুক্তি বারবার লঙ্ঘনের জবাবে এক অভিনব ও বিধ্বংসী পাল্টা হামলা চালিয়ে বড় ধরনের সামরিক সাফল্যের দাবি করেছে দেশটির সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ। সংগঠনটির দাবি, অধিকৃত ভূখণ্ডের গভীরে সুনির্দিষ্ট ড্রোন হামলা চালিয়ে তারা ইসরায়েলের অত্যন্ত সুরক্ষিত ও অত্যাধুনিক একটি ‘আয়রন ডোম’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মূল লঞ্চার সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিয়েছে।
সোমবার (১ জুন) সন্ধ্যায় প্রকাশিত হিজবুল্লাহর সামরিক শাখার এক বিশেষ ভিডিও ফুটেজ ও বিবৃতির বরাতে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম প্রেস টিভি এই সংবাদ নিশ্চিত করেছে।
হিজবুল্লাহর গণমাধ্যম শাখার প্রকাশিত তথ্য ও ভিডিও চিত্র অনুযায়ী, দক্ষিণ লেবাননের সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে ইসরায়েলের সাম্প্রতিক আগ্রাসনের তীব্র প্রতিশোধ হিসেবে এই বিশেষ আকাশ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। অধিকৃত ভূখণ্ডের একেবারে উত্তরে অবস্থিত ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘বিরানিত’ সামরিক ঘাঁটিতে মে মোতায়েন থাকা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে লক্ষ্য করে এই নিখুঁত হামলা চালানো হয়।
সংগঠনটি জানায়, তাদের একটি অত্যাধুনিক বিস্ফোরকবাহী কামিকাজে ড্রোন সীমান্ত পেরিয়ে বিরানিত ঘাঁটির আকাশসীমায় প্রবেশ করে প্রথমে নিখুঁতভাবে লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করে এবং পরবর্তীতে সরাসরি আয়রন ডোমের মূল লঞ্চারে আঘাত হেনে সেটিকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয়।
লেবাননের একাধিক স্থানীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্ত সংলগ্ন এলাকাগুলোতে ইসরায়েলি বাহিনীর আয়রন ডোম ব্যবস্থার ওপর একযোগে হামলা জোরদার করেছে হিজবুল্লাহ। মূলত সম্মুখ সমরে ইসরায়েলকে আকাশপথের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার স্বয়ংক্রিয় সক্ষমতা থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত করাই এখন লেবাননের এই সশস্ত্র প্রতিরোধ যোদ্ধাদের মূল সামরিক লক্ষ্য।
এই রণকৌশলের অংশ হিসেবেই আজ দক্ষিণ লেবাননের দেইবেল এলাকায় ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর দুটি শক্তিশালী সাঁজোয়া যান হিজবুল্লাহর বিশেষ ‘আবাবিল কামিকাজে’ ড্রোনের সুনির্দিষ্ট আঘাতে ধূলিসাৎ হয়ে গেছে বলে লেবানন প্রতিরোধ ফ্রন্টের দাবি।
এর পাশাপাশি দক্ষিণ লেবাননের কাওজাহ এলাকায় অবস্থানরত ইসরায়েলি পদাতিক সেনা দল এবং একটি আবাসিক বাড়িতে অবস্থান নেওয়া দখলদার কমান্ডোদের ওপর আবাবিল ড্রোন ও দূরপাল্লার গাইডেড ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ভয়াবহ হামলা চালানো হয়েছে। অন্যদিকে দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি বাহিনীর স্থল অভিযান সম্প্রসারণ এবং প্রাণঘাতী বিমান হামলার বিপরীতে হিজবুল্লাহর পাল্টা রকেট ও ড্রোন হামলার এমন তীব্রতায় তেল আবিব সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছে।
ইসরায়েলের হিব্রু ভাষার সংবাদমাধ্যম ‘চ্যানেল ১৩’ তাদের এক বিশেষ মূল্যায়নে জানিয়েছে, লিতানি নদীর উত্তরাঞ্চলে ইসরায়েলি বাহিনী অভিযান বাড়ানোর পর হিজবুল্লাহ যে নতুন যুদ্ধকৌশলে এবং যে মাত্রায় প্রতিরোধ গড়ে তুলছে, তা ইসরায়েলি সামরিক কমান্ডারদের চরমভাবে বিস্মিত ও আতঙ্কিত করেছে।
ইসরায়েলি গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন ইহুদি বসতিতে একের পর এক সতর্ক সাইরেন বা সংকেত বাজতে থাকায় এবং রকেট হামলার মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জরুরি নিরাপত্তা বৈঠক ডেকেছেন।
প্রসঙ্গত, গত ২ মার্চ ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের আগ্রাসন, ২০২৪ সালের পূর্ববর্তী যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন এবং দক্ষিণ লেবাননের ভূখণ্ডে অবৈধ দখলদারিত্ব অব্যাহত রাখার প্রতিবাদে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে এই নতুন সামরিক অভিযান শুরু করে হিজবুল্লাহ। পরবর্তীতে ৮ এপ্রিল ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর তেহরান ও ওয়াশিংটনের পরোক্ষ আলোচনায় লেবাননে ইসরায়েলি হামলা স্থায়ীভাবে বন্ধ করার প্রধান শর্তটি সামনে এলে তেল আবিব সাময়িকভাবে যুদ্ধবিরতি মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিল।
লেবানন সরকারের দাপ্তরিক নথিতে দেখা গেছে, প্রাথমিক ১০ দিনের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো হলেও ইসরায়েলি বাহিনী দ্রুত দক্ষিণ লেবাননে আবারও বিমান হামলা শুরু করে এবং কয়েকটি এলাকার বাসিন্দাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে সরে যাওয়ার হুমকি দেয়।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ২ মার্চ থেকে শুরু হওয়া এই ভয়াবহ ইসরায়েলি হামলায় লেবাননে এ পর্যন্ত ৩ হাজার ৩৭১ জনেরও বেশি নিরীহ মানুষ নিহত হয়েছেন। এছাড়া এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের জেরে আহত হয়েছেন ১০ হাজার ১২৯ জনেরও বেশি মানুষ এবং সীমান্ত সংলগ্ন এলাকাগুলো থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে চরম মানবিক সংকটে পড়েছেন প্রায় ১৬ লাখেরও বেশি লেবানিজ নাগরিক।
সূত্র: প্রেস টিভি
সময়ের আলো/টিএইচ