পূর্বঘোষিত দ্বিপাক্ষিক যুদ্ধবিরতি চুক্তি সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে লেবাননের রাজধানী বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলে নতুন করে তীব্র বিমান ও বোমা হামলার নির্দেশ দিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। গত ১৭ এপ্রিল উভয় পক্ষের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর থেকে এটিকে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধি হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা।
সোমবার (১ জুন) ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ এক যৌথ আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলীয় হিজবুল্লাহর বিভিন্ন সামরিক অবকাঠামো ও সন্ত্রাসী লক্ষ্যবস্তুতে এই বিমান হামলার সবুজ সংকেত দেওয়ার কথা জানান।
ইসরায়েলি প্রশাসনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর ক্রমাগত ও উসকানিমূলক যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের জবাবেই বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলে নতুন করে এই কঠোর সামরিক অভিযানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যদিও এপ্রিলের ঐতিহাসিক চুক্তির পর থেকে দুই দেশের সীমান্তে পূর্ণমাত্রায় সংঘাত কখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি, তবুও লেবাননের মূল রাজধানী বৈরুত শহরকে সরাসরি যেকোনো ধরনের হামলার বাইরে রাখা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছিল। তবে নেতানিয়াহুর সাম্প্রতিক এই আকস্মিক ও বিতর্কিত সিদ্ধান্ত সেই আন্তর্জাতিক ধারণাকে চরম প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
নেতানিয়াহুর এই যুদ্ধংদেহী ঘোষণার পরপরই বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চল থেকে সাধারণ বাসিন্দাদের ব্যাপকভাবে নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ স্থানে পালিয়ে যেতে দেখা যায়। স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই বৈরুতের প্রধান প্রধান সড়কগুলো হাজার হাজার যানবাহন ও বাস্তুচ্যুত মানুষের ভিড়ে স্থবির হয়ে পড়ে। গত কয়েক মাসে একাধিকবার গৃহহীন হওয়া স্থানীয় লেবানিজ নাগরিকদের জন্য এই আতঙ্কজনক পরিস্থিতি নতুন কোনো অভিজ্ঞতা নয়। ইসরায়েলি বাহিনীর ক্রমাগত বিমান ও স্থল হামলার কারণে লেবাননে এ পর্যন্ত ১০ লাখের বেশি মানুষ স্থায়ীভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
দক্ষিণ লেবানন ও বেকা উপত্যকায় নিয়মিত প্রাণঘাতী বিমান হামলার পাশাপাশি লেবাননের বহু শহর ও গ্রামে সাধারণ মানুষকে দ্রুত ঘরবাড়ি সরিয়ে নেওয়ার জন্য চূড়ান্ত আলটিমেটাম জারি করেছে ইসরায়েলি ডিফেন্স ফোর্সেস। এর আগে গত রোববার দক্ষিণ লেবাননের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ‘বিউফোর্ট দুর্গ’ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয় ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। ২০০০ সালে দক্ষিণ লেবানন থেকে দখলদার ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের পর দীর্ঘ দুই দশকে এটিই লেবাননের ভূখণ্ডের ভেতরে দেশটির সবচেয়ে গভীর স্থল অগ্রগতি বলে আন্তর্জাতিক সামরিক নথিতে দাবি করা হচ্ছে।

ঐতিহাসিক বিউফোর্ট দুর্গটি পুরোপুরি দখলে নেওয়ার পর এক দাম্ভিক বিবৃতিতে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু বলেন, দক্ষিণ লেবাননের হিজবুল্লাহ নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে আমাদের সামরিক উপস্থিতি আরও গভীর ও বিস্তৃত করার জন্য আমি মাঠপর্যায়ের কমান্ডারদের স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছি এবং আমরা আগের চেয়ে আরও বেশি ঐক্যবদ্ধ, দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ও শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছি। অন্যদিকে হিজবুল্লাহর সামরিক উইং জানিয়েছে, তারা বিউফোর্ট দুর্গের আশপাশে অবস্থানরত ইসরায়েলি পদাতিক সেনাদের লক্ষ্য করে কামিকাজে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে সফল প্রতিরোধ অভিযান পরিচালনা করেছে।
এই চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যে হিজবুল্লাহর ঘনিষ্ঠ লেবাননি আইনপ্রণেতা হাসান ফাদলাল্লাহ উদ্ভূত পরিস্থিতির জন্য সরাসরি লেবানন সরকারকে দায়ী করে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যস্থতায় ইসরায়েলের সাথে সরাসরি আলোচনার পথ সম্পূর্ণ ব্যর্থ প্রমাণিত হয়েছে। এদিকে লেবাননে ইসরায়েলের এই নতুন ও আগ্রাসী সামরিক অভিযানের তীব্র সমালোচনা করেছে ইউরোপের কয়েকটি প্রভাবশালী দেশ। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ দক্ষিণ লেবাননে চলমান সামরিক উত্তেজনা অবিলম্বে বন্ধের আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, এই মাত্রার আন্তর্জাতিক সামরিক বিস্তারের কোনো যৌক্তিকতা নেই।
ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জঁ-নোয়েল বারো লেবানন পরিস্থিতি নিয়ে একটি জরুরি বৈঠক আহ্বানের জন্য জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের কাছে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানিয়েছেন। একই সঙ্গে যুক্তরাজ্য ও জার্মানিও আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের দায়ে ইসরায়েলের এই নতুন অভিযানের কঠোর সমালোচনা করেছে। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, লেবাননে ইসরায়েলের সাম্প্রতিক এই আগ্রাসন মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সম্ভাব্য পরমাণু সমঝোতা প্রচেষ্টাকেও চরম জটিল করে তুলবে। তেহরান ইতিমধ্যেই ওয়াশিংটনকে সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, লেবাননে ইসরায়েলি হামলা স্থায়ীভাবে বন্ধ না হলে মধ্যপ্রাচ্যে বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধবিরতি বা নতুন কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তি সম্ভব নয়।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
সময়ের আলো/টিএইচ