দেশের প্রান্তিক ও ভূমিহীন কৃষকদের জন্য স্বল্প খরচে ব্যাংকিং সুবিধা এবং সহজ শর্তে ঋণপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে নতুন নির্দেশনা জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
মঙ্গলবার (২ জুন) বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইনক্লুশন ডিপার্টমেন্ট (এফআইডি) এ সংক্রান্ত একটি নির্দেশনা জারি করে দেশের সব তফসিলি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের কাছে পাঠিয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক মো. ইকবাল মহসীনের সই করা এই নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ১০ বা ৫০ বা ১০০ টাকার হিসাবধারী প্রান্তিক ও ভূমিহীন কৃষক, নিম্নআয়ের পেশাজীবী, স্কুল ব্যাংকিং হিসাবধারী এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য গঠিত পুনঃঅর্থায়ন স্কিম’-এর আওতায় ঋণ বিতরণ কার্যক্রম আরও কার্যকর করতে নতুন কিছু অগ্রাধিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ সরকার সম্প্রতি কৃষকদের একটি সমন্বিত তথ্যভাণ্ডারের আওতায় আনার উদ্যোগ হিসেবে ‘কৃষক স্মার্ট কার্ড নীতিমালা-২০২৫’ প্রণয়ন করেছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের এই উদ্যোগের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে, কৃষক স্মার্ট কার্ডধারী প্রান্তিক ও ভূমিহীন কৃষকদের জন্য ১০ টাকার ব্যাংক হিসাব খোলা এবং পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের আওতায় ঋণ বিতরণে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক একইসঙ্গে স্পষ্ট করেছে যে, শুধুমাত্র স্মার্ট কার্ডধারীরাই সুবিধা পাবেন-এমন কোনো পরিস্থিতি তৈরি করা যাবে না। কার্ড না থাকলেও প্রকৃত প্রান্তিক ও ভূমিহীন কৃষকরা যেন ঋণ সুবিধা থেকে বঞ্চিত না হন, সে বিষয়েও ব্যাংকগুলোকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, কৃষক স্মার্ট কার্ডকে ব্যাংকিং ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার মাধ্যমে কৃষি ভর্তুকি, ঋণ বিতরণ, কৃষি প্রণোদনা এবং সরকারি সহায়তা কার্যক্রম আরও স্বচ্ছ ও তথ্যভিত্তিক হবে। একই সঙ্গে প্রকৃত কৃষকদের শনাক্ত করা সহজ হবে এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তির আওতা আরও বিস্তৃত হবে।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অস্বাভাবিক গ্রীষ্মকালীন অতিবৃষ্টির কারণে কৃষি খাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বিশেষ করে হাওরাঞ্চলের পাকা ধানসহ বিভিন্ন ফসল নষ্ট হওয়ায় হাজার হাজার কৃষক আর্থিক সংকটে পড়েছেন।
এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে, অতিবৃষ্টিজনিত ফসলহানিতে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে বিশেষ অগ্রাধিকার দিতে হবে।
নির্দেশনায় সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোণা ও ময়মনসিংহের হাওরাঞ্চলের কৃষকদের বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। একইসঙ্গে দেশের অন্যান্য জেলার ক্ষতিগ্রস্ত প্রান্তিক ও ভূমিহীন কৃষকরাও এই অগ্রাধিকার সুবিধার আওতায় থাকবেন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দ্রুত পুনর্বাসন এবং পরবর্তী মৌসুমে চাষাবাদ অব্যাহত রাখতে সহজ শর্তে ঋণপ্রবাহ নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এই পুনঃঅর্থায়ন স্কিম মূলত এমন জনগোষ্ঠীর জন্য গঠন করা হয়েছে, যারা দীর্ঘদিন ধরে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংকিং সেবার বাইরে ছিল। ১০, ৫০ ও ১০০ টাকার বিশেষ হিসাবের মাধ্যমে প্রান্তিক কৃষক, নিম্নআয়ের পেশাজীবী, স্কুল শিক্ষার্থী এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ব্যাংকিং ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে।
এই স্কিমের আওতায় ব্যাংকগুলো স্বল্প সুদে ঋণ বিতরণ করে এবং পরে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে পুনঃঅর্থায়নের সুবিধা পায়। ফলে ঝুঁকিপূর্ণ বা স্বল্প আয়ের গ্রাহকদের ঋণ দিতে ব্যাংকগুলোর আগ্রহ বাড়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষক স্মার্ট কার্ডধারীদের ব্যাংকিং সেবার সঙ্গে যুক্ত করা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দ্রুত ঋণ সহায়তা দেওয়া বাংলাদেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি কর্মসূচির একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে একদিকে যেমন কৃষক পর্যায়ে আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং সেবার বিস্তার ঘটবে, অন্যদিকে দুর্যোগ-পরবর্তী কৃষি পুনরুদ্ধারেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে কৃষি খাতে উৎপাদনশীলতা বজায় রাখা, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখার ক্ষেত্রেও এই নির্দেশনা কার্যকর অবদান রাখতে পারে।
সময়ের আলো/আআ