হতেই হবে পারফেক্ট!

নিবেদিতা দাস

ফিচার

ভোরে ঘুম থেকে উঠে পরিবারের সবার নাশতার ব্যবস্থা করা, সন্তানের স্কুলের প্রস্তুতি, এরপর নিজের অফিসের জন্য তৈরি হওয়া। কর্মক্ষেত্রে ডেডলাইন,

2026-06-03T03:41:59+00:00
2026-06-03T03:41:59+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
ফিচার
হতেই হবে পারফেক্ট!
নিবেদিতা দাস
প্রকাশ: বুধবার, ৩ জুন, ২০২৬, ৩:৪১ এএম 
ছবি : সংগৃহীত
ভোরে ঘুম থেকে উঠে পরিবারের সবার নাশতার ব্যবস্থা করা, সন্তানের স্কুলের প্রস্তুতি, এরপর নিজের অফিসের জন্য তৈরি হওয়া। কর্মক্ষেত্রে ডেডলাইন, মিটিং, প্রেজেন্টেশন কিংবা নানা দায়িত্ব সামলে দিনের শেষে ক্লান্ত শরীরে ঘরে ফেরা। 

কিন্তু সেখানেও শেষ নয়। সংসারের টুকিটাকি কাজ, সন্তানের পড়াশোনা, পরিবারের সদস্যদের প্রয়োজন মেটানো- সবকিছু যেন তারই দায়িত্ব। এই চিত্রটি আমাদের চারপাশের অসংখ্য নারীর প্রতিদিনের বাস্তবতা।

আধুনিক সমাজে নারীর ভূমিকা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক 
বিস্তৃত। একজন নারী আজ একই সঙ্গে পেশাজীবী, মা, স্ত্রী, কন্যা, গৃহপরিচালক এবং সমাজের সক্রিয় সদস্য। কিন্তু এই বহুমাত্রিক পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি অদৃশ্য চাপ- সব ক্ষেত্রে ‘পারফেক্ট’ বা নিখুঁত হওয়ার চাপ। 

কর্মক্ষেত্রে সফল হতে হবে, সন্তানকে সেরা শিক্ষা দিতে হবে, ঘর গোছানো রাখতে হবে, নিজের সৌন্দর্য ও স্বাস্থ্য ধরে রাখতে হবে। সব মিলিয়ে অনেক নারী যেন এক অন্তহীন প্রতিযোগিতার অংশ হয়ে উঠছেন।

পারফেকশনিজম বা সবকিছু নিখুঁতভাবে করার প্রবণতা অনেক সময় আত্মোন্নয়নের পরিবর্তে মানসিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। 

বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে সমাজ ও সংস্কৃতির তৈরি কিছু প্রত্যাশা এই চাপকে আরও বাড়িয়ে দেয়। ছোটবেলা থেকেই অনেক মেয়েকে শেখানো হয়, তাকে সব দায়িত্ব দক্ষতার সঙ্গে সামলাতে হবে এবং ভুল করার সুযোগ খুব কম। 

ফলে বড় হওয়ার পরও অনেক নারী নিজের কাছেই এমন কিছু মানদণ্ড তৈরি করেন, যা বাস্তবে অর্জন করা প্রায় অসম্ভব।

বর্তমান সময়ে এই চাপকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম বা অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে চোখ রাখলেই দেখা যায় সাজানো সংসার, হাসিমুখের পরিবার, নিখুঁত রান্নাঘর কিংবা সফল ক্যারিয়ারের ঝলমলে ছবি। 

এসব দেখে অনেক নারীর মনে হতে পারে, অন্যরা খুব সহজেই সবকিছু সামলে নিচ্ছেন, শুধু তিনিই পিছিয়ে আছেন। অথচ পর্দার আড়ালে থাকা ক্লান্তি, হতাশা, ব্যর্থতা কিংবা সংগ্রামের গল্পগুলো খুব কমই সামনে আসে। ফলে তুলনার প্রবণতা বাড়ে এবং আত্মবিশ্বাস কমতে শুরু করে।

এ ধরনের  প্রবণতাকে ‘সুপারওম্যান সিনড্রোম’ হিসেবে ধরা হয়। সবকিছু একাই নিখুঁতভাবে করার এই মানসিক চাপ নারীদের শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। 

প্রতিনিয়ত দায়িত্ব পালনের চাপে তারা পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিতে পারেন না, নিজের জন্য সময় বের করতে পারেন না। অনেকের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি, উদ্বেগ, হতাশা এবং আত্মদ্বন্দ্ব দেখা দেয়।

আরও একটি বিষয় নারীদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করে- অপরাধবোধ। অফিসে বেশি সময় দিলে মনে হয় পরিবারের প্রতি দায়িত্ব কম পালন করা হচ্ছে, আবার পরিবারকে সময় দিলে মনে হয় ক্যারিয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। 

এই দ্বৈত প্রত্যাশা অনেক নারীকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে। ফলে নিজের অর্জনগুলো উপভোগ করার সুযোগও অনেক সময় হারিয়ে যায়।

চাপটা শুধু কাজ বা দায়িত্বের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়, নারীর বাহ্যিক সৌন্দর্য নিয়েও সমাজের প্রত্যাশা কম নয়। বয়স বাড়লেও বলিরেখা যেন না পড়ে, সন্তান জন্মের পরও শরীরের পরিবর্তন যেন দৃশ্যমান না হয়, সবসময় সুন্দর ও আকর্ষণীয় দেখাতে হবে- এমন অলিখিত সামাজিক চাপও নারীদের বহন করতে হয়।

বিজ্ঞাপন, বিনোদন জগৎ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অনেক সময় এই অবাস্তব সৌন্দর্যের ধারণাকে আরও শক্তিশালী করে।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, পারফেক্ট হওয়ার ধারণাটি আসলে একটি মিথ। কোনো মানুষই জীবনের সবক্ষেত্রে শতভাগ নিখুঁত হতে পারেন না। জীবন স্বাভাবিকভাবেই অসম্পূর্ণ। ভুল, সীমাবদ্ধতা, ব্যর্থতা এবং শেখার মধ্য দিয়েই মানুষের বিকাশ ঘটে। 

একজন কর্মজীবী নারী যদি কোনো সময় পরিবারকে অগ্রাধিকার দেন, সেটি যেমন স্বাভাবিক, তেমনি কোনো সময় নিজের ক্যারিয়ারকে গুরুত্ব দেওয়াও স্বাভাবিক। জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে অগ্রাধিকার বদলাবে, এটাই বাস্তবতা।

এই চাপ থেকে মুক্তির প্রথম ধাপ হলো নিজের সীমাবদ্ধতাকে গ্রহণ করা। সব দায়িত্ব একা বহন করা বা সব কাজ নিখুঁতভাবে সম্পন্ন করা জরুরি নয়। প্রয়োজনে ‘না’ বলতে শেখা এবং সহায়তা চাওয়া দুর্বলতার নয়, বরং সচেতনতার পরিচয়। 

সংসার, সন্তান লালন-পালন কিংবা পারিবারিক দায়িত্ব শুধু নারীর একার নয়; এটি পরিবারের সবার যৌথ দায়িত্ব। নিজের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়াও জরুরি। আমরা অন্যের ভুলকে যেভাবে ক্ষমা করি, নিজের ক্ষেত্রেও সেই একই দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করা প্রয়োজন। 

একটি ভুল বা ব্যর্থতা কখনোই একজন মানুষের সামগ্রিক যোগ্যতার পরিচয় নয়। বরং ভুল থেকে শেখার মধ্যেই এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।

একজন নারীর মূল্য তার নিখুঁত হওয়ার ক্ষমতায় নয়, বরং তার মানবিকতা, দক্ষতা, সংগ্রাম এবং নিজের মতো করে এগিয়ে যাওয়ার শক্তিতে। জীবন কোনো পরীক্ষার খাতা নয়, যেখানে প্রতিটি উত্তরে পূর্ণ নম্বর পেতেই হবে। বরং এটি শেখা, ভুল করা, আবার উঠে দাঁড়ানো এবং নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী এগিয়ে চলার একটি যাত্রা। 

তাই পারফেক্ট হওয়ার অবাস্তব প্রতিযোগিতায় নিজেকে হারিয়ে না ফেলে, সুস্থ, সুখী ও আত্মবিশ্বাসী মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকাই হোক আজকের নারীর সবচেয়ে বড় সাফল্য।

/এসএকে


  বিষয়:   হতেই হবে পারফেক্ট! 


Loading...
Loading...
ফিচার- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: