আজকাল মিষ্টিমুখ মানেই কেক। জন্মদিন, বিয়েবার্ষিকী কিংবা যেকোনো উৎসবে কেক ছাড়া যেন উদযাপন অপূর্ণ থেকে যায়। আর এই চাহিদাকে কেন্দ্র করে আমাদের দেশে তৈরি হয়েছে এক নতুন ধারার উদ্যোক্তা গোষ্ঠী, যার বড় একটি অংশজুড়ে আছেন তরুণীরা।
একসময় কেক তৈরি কেবল ঘরোয়া শখের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন তা রূপ নিয়েছে লাভজনক ব্যবসায়। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, যেমন ফেসবুককে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে অসংখ্য অনলাইন ‘হোম বেকারি’। ঘরে বসে নিজের সৃজনশীলতাকে কাজে লাগিয়ে নারীরা হয়ে উঠছেন স্বাবলম্বী।
ওভেনের মিষ্টি সুবাস আর ক্রিমের নিখুঁত ছোঁয়ায় তারা কেবল কেকই বানাচ্ছেন না, বরং তৈরি করছেন নিজেদের অনন্য পরিচিতি। এমনই একজন স্বপ্নবাজ ও সফল তরুণ উদ্যোক্তা তানিশা তাসনুভা স্নেহা। নিজের সাধনা ও ভালোবাসায় যিনি গড়ে তুলেছেন অনলাইন কেক শপ ‘ফুড ফ্লেভার’।
কেক বানানো তানিশার কাছে কেবল চার দেয়ালের মাঝে কিছু উপকরণ মেশানোর কাজ নয়, এটি তার কাছে এক টুকরো ভালোবাসা আর প্যাশনের নাম। আর সেই গভীর ভালোবাসা থেকেই ২০২১ সালে খুব ছোট পরিসরে শুরু হয়েছিল তার এই মিষ্টি পথচলা। তখন পুঁজি বলতে ছিল কেবল অদম্য ইচ্ছা আর মাত্র ২ থেকে ৩ হাজার টাকা। সামান্য সেই পুঁজি নিয়ে নিজের রান্নাঘর থেকেই যাত্রা শুরু করে ফুড ফ্লেভার।
শুরুর দিনগুলো আর দশটা সাধারণ মেয়ের মতোই সহজ ছিল না তানিশার জন্য। নতুন একটা কাজে হাত দিলে সমাজ যেভাবে বাঁকা চোখে তাকায়, তাকেও তা সহ্য করতে হয়েছে।
আশপাশের অনেকেই তখন তার এই কাজকে তেমন একটা গুরুত্ব দিতেন না। ‘ফেসবুকে কেক বিক্রি করে কী হবে’ এমন নেতিবাচক মন্তব্য কিংবা সমর্থনের অভাব, কোনো কিছুই তাকে দমাতে পারেনি। তানিশা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন, সততা, পরিশ্রম আর ধৈর্য থাকলে যেকোনো প্রতিকূলতা জয় করে ভালো কিছু করা সম্ভব।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তানিশার হাতের জাদুতে কেকের স্বাদ ও মান মানুষের মন জয় করতে শুরু করে। বাড়তে থাকে ক্রেতাদের আস্থা। আর এই পুরো জার্নিতে তানিশার জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে পাশে দাঁড়ান তার মা-বাবাসহ পরিবারের সদস্যরা। পরিবারের এই অকুণ্ঠ সমর্থনই তাকে সব বাধা পেরিয়ে সামনে যাওয়ার সাহস জুগিয়েছে।
শুধু কেক তৈরি করেই তানিশা থেমে থাকেননি। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কেক ডেকোরেশন এবং ফন্ড্যান্টের কাজে নিজেকে আরও দক্ষ করে তোলার চেষ্টা চালিয়ে গেছেন প্রতিনিয়ত। প্রতিদিন ইউটিউব বা বিভিন্ন মাধ্যমে নতুন কিছু শেখা, নিজের আগের ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নেওয়া এবং কাজের মান উন্নত করা ছিল তার নিত্যদিনের রুটিন। ফলস্বরূপ আজ তানিশা আগের তুলনায় অনেক বেশি নিখুঁত ও নান্দনিক কাজ করতে পারছেন।
তবে এই সাফল্যের পথটা সহজ ছিল না। একজন শিক্ষার্থী হিসেবে পড়াশোনার পাশাপাশি একটি অনলাইন ব্যবসা পরিচালনা করা ছিল বেশ চ্যালেঞ্জিং। একদিকে পরীক্ষার চাপ, ক্লাস-অ্যাসাইনমেন্ট; অন্যদিকে ক্রেতাদের অর্ডার ম্যানেজ করা, নিখুঁতভাবে কেক তৈরি এবং সঠিক সময়ে তা ডেলিভারি দেওয়াসহ সবকিছু একসঙ্গে সামলাতে গিয়ে বহু রাত তাকে ঘুমানো বাদ দিতে হয়েছে।
কিন্তু কোনো এক জাদুমন্ত্রে তানিশা হাল ছাড়েননি। প্রতিটি বাধাকে তিনি রূপ দিয়েছেন নতুন সম্ভাবনায়। আজ ফুড ফ্লেভার যে অবস্থানে পৌঁছেছে, তার পেছনে রয়েছে ক্রেতাদের অকৃত্রিম বিশ্বাস আর ভালোবাসা। প্রতিটি কেকের মাধ্যমে মানুষের জীবনের বিশেষ মুহূর্তগুলোকে আরও একটু রঙিন ও সুন্দর করে তোলাই তানিশার মূল লক্ষ্য।
ফুড ফ্লেভারকে নিয়ে তানিশা তাসনুভা স্নেহার স্বপ্ন এখন আকাশছোঁয়া। আপাতত ফেসবুক পেজের মাধ্যমে অনলাইনভিত্তিক কার্যক্রম চললেও তানিশার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হলো ভবিষ্যতে ফুড ফ্লেভারের একটি নিজস্ব ফিজিক্যাল আউটলেট প্রতিষ্ঠা করা। যেখানে এসে মানুষ সরাসরি তার তৈরি ফ্রেশ হাইজেনিক কেক ও পেস্ট্রির স্বাদ নিতে পারবেন।
ছোট্ট একটি স্বপ্ন থেকে শুরু হওয়া ফুড ফ্লেভার যেন একদিন বাংলাদেশের প্রতিটি প্রান্তে মানুষের আস্থার প্রতীক হয়ে ওঠে, সেই লক্ষ্য নিয়েই প্রতিদিন ওভেনের আগুন আর ক্রিমের রঙে নতুন নতুন স্বপ্নের নকশা বুনে চলেছেন তানিশা।
/এসএকে