স্তূপ হয় চামড়া, জমে না হাট

কায়সার রহমান রোমেল, গাইবান্ধা

সারাদেশ

মঙ্গলবার বিকেল থেকেই শুরু হয়েছিল আসা-যাওয়া। ঠাকুরগাঁও, রংপুর, দিনাজপুর- উত্তরবঙ্গের নানা প্রান্ত থেকে ভ্যান, ট্রাক আর নসিমনে চড়ে ফড়িয়ারা আসছিলেন

2026-06-03T11:45:08+00:00
2026-06-03T11:57:56+00:00
 
  শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬,
৩ শ্রাবণ ১৪৩৩
শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
স্তূপ হয় চামড়া, জমে না হাট
কায়সার রহমান রোমেল, গাইবান্ধা
প্রকাশ: বুধবার, ৩ জুন, ২০২৬, ১১:৪৫ এএম  আপডেট: ০৩.০৬.২০২৬ ১১:৫৭ এএম
গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার ঐতিহ্যবাহী কালিবাড়ী চামড়া হাটে প্রাথমিক প্রক্রিয়াজাত করা কোরবানির পশুর চামড়ার আমদানি ভালো হলেও দাম ছিলো কম। ছবি : সময়ের আলো
মঙ্গলবার বিকেল থেকেই শুরু হয়েছিল আসা-যাওয়া। ঠাকুরগাঁও, রংপুর, দিনাজপুর- উত্তরবঙ্গের নানা প্রান্ত থেকে ভ্যান, ট্রাক আর নসিমনে চড়ে ফড়িয়ারা আসছিলেন লবণ-মাখানো চামড়া নিয়ে। বুধবার কাকডাকা ভোরে গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার কালিবাড়ী চামড়ার হাটে যখন আনুষ্ঠানিক বেচাকেনা শুরু হলো, তখন হাটের মাঠ ভরে গিয়েছিল চামড়ার স্তূপে। কিন্তু এত চামড়ার মাঝেও হাটে যেন প্রাণ নেই।

ঈদুল আজহার পর উত্তরাঞ্চলের এই সর্ববৃহৎ চামড়ার হাটে প্রতিবছর যে জমজমাট ছবি দেখা যেত, এবার সেটি ছিল না। ঢাকা থেকে একাধিক ট্যানারির প্রতিনিধি এসেছিলেন, কিন্তু তারা কেনার চেয়ে বাজার বোঝার চেষ্টায় বেশি ব্যস্ত ছিলেন। চামড়া এসেছে প্রচুর, কিন্তু দাম নেই- এই পরিস্থিতিতে হাট জুড়ে ছিল হা-হুতাশ আর ক্ষোভ।

পলাশবাড়ীর কালিবাড়ী চামড়ার হাট শুধু গাইবান্ধার নয়, সমগ্র উত্তরবঙ্গের চামড়া ব্যাবসার কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। দশকের পর দশক ধরে রাজধানী ঢাকার ট্যানারি মালিক, আড়তদার, লেদার কোম্পানির প্রতিনিধি থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের ছোট ব্যবসায়ী পর্যন্ত সবাই এই হাটকে ঘিরে তাদের বাণিজ্য পরিচালনা করেন। সপ্তাহের শনি ও বুধবার হাট বসলেও এখন শুধু বুধবার চামড়া কেনা-বেচা হয়। তবে বছরের দুটি ঈদ- বিশেষত কোরবানির ঈদ- হাটটিকে পরিণত করে ক্রেতা-বিক্রেতার এক বিশাল মিলনমেলায়।

ঠাকুরগাঁও থেকে ১৮০টি চামড়া নিয়ে হাটে আসা প্রান্তিক ব্যবসায়ী দবিরউদ্দিনের হিসাব একেবারে সহজ। একটি গরুর চামড়া লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করা থেকে শুরু করে শ্রমিক মজুরি ও পরিবহন খরচ মিলিয়ে তার খরচ হয়েছে ৬০০ থেকে সাড়ে ৬০০ টাকা। অথচ হাটে পাইকাররা দিচ্ছেন মাত্র ৪৫০ টাকা। প্রতিটি চামড়ায় দেড়শো টাকার বেশি লোকসান নিশ্চিত। চামড়া বাড়িতে ফিরিয়ে নিলেও আরও খরচ- তাই বিক্রি না করে উপায় নেই।

সরকার এবার গরুর চামড়ার দর নির্ধারণ করেছিল প্রতি বর্গফুট ৫৭ থেকে ৬২ টাকা এবং ছাগলের চামড়া ২৫ থেকে ৩০ টাকা। কিন্তু হাটের বাস্তবতায় সেই মূল্য কার্যকর হয়নি। পিস হিসেবে গরুর চামড়া বিক্রি হয়েছে ২০০ থেকে সর্বোচ্চ ৯০০ টাকায়, যা গ্রেড ভেদে পাঁচটি পৃথক শ্রেণিতে নির্ধারিত হয়। আর ছাগলের চামড়ার অবস্থা আরও করুণ- প্রতিপিস মাত্র ২ থেকে ২০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৮০ থেকে ৯০টি ছাগলের চামড়া একত্রে মাত্র ১০০ থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে, যা রীতিমতো মূল্যহীনতার নামান্তর।

রংপুরের মীরবাগ থেকে আসা শহিদুল ইসলাম এই হাটে চামড়া বেচাকেনা করছেন দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে। তার কাছে এই হাটের উত্থান-পতনের ইতিহাস জীবন্ত। তিনি জানান, ২০১৯ সালের আগে পর্যন্ত হাটে চামড়ার ন্যায্য দাম পাওয়া যেত, ব্যবসায়ীরা আশা নিয়ে আসতেন। কিন্তু সেই বছর হঠাৎ যে দরপতন শুরু হয়েছিল, তার ধারাবাহিকতা এখনও চলছে। এবারও লাভ হয়েছে যৎসামান্য, কারো কারো ক্ষেত্রে তাও হয়নি।

মৌসুমি ব্যবসায়ীরা যখন হাটে লোকসানের হিসাব মেলাচ্ছেন, পাইকাররাও আছেন গভীর সংকটে। বছরের পর বছর ট্যানারি মালিকদের কাছে টাকা বকেয়া পড়ে থাকায় পুঁজি সংকট এখন তাদের নিত্যসঙ্গী। ধারদেনা করে মৌসুমি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চামড়া কিনে ঢাকায় পাঠানোর পরেও টাকা না পেলে সেই চক্র আরও দুষ্টু হয়। অনেক পাইকার হাটে এলেও চামড়া কিনতে আগ্রহ দেখাননি- কারণ বিক্রি করে টাকা উঠবে কিনা, সে নিশ্চয়তা নেই।

হাট ইজারাদারের পক্ষে শফিকুল ইসলাম জানান, চামড়ার আমদানি ভালো হলেও গত ঈদের তুলনায় এবার হাটে এসেছে অর্ধেকেরও কম চামড়া। অর্থাৎ বাজারের সংকট আঁচ করে অনেক ব্যবসায়ী এবার হাটমুখী হননি। এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে হাটের অস্তিত্বের জন্যও শঙ্কার।

ট্যানারি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চামড়ার বাজার সম্পর্কে মৌসুমি ব্যবসায়ী ও পাইকারদের সঠিক ধারণার অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। কোন মানের চামড়া কত দামে বিক্রি হবে, সংরক্ষণ কতটা সঠিক হলে দাম বেশি পাওয়া যায়- এই বিষয়গুলো না জানায় দরকষাকষিতে পিছিয়ে পড়েন তারা। চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির নেতারাও একমত যে, মৌসুমি ব্যবসায়ী ও ফড়িয়াদের জন্য সংরক্ষণ পদ্ধতি ও বাজারমূল্য নির্ধারণ বিষয়ে প্রশিক্ষণ আরও জোরদার করা এখন অপরিহার্য।

এদিকে, হাটে ক্রেতা-বিক্রেতাদের নিরাপত্তায় সার্বক্ষণিক সাদা পোশাক ও ইউনিফর্মধারী পুলিশের টহল ছিল বলে জানিয়েছেন পলাশবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা।

কোরবানির চামড়া শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। লক্ষাধিক মানুষের জীবিকা এই শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত। ২০১৯ সাল থেকে শুরু হওয়া দরপতনের চক্র যদি না ভাঙে, তাহলে পলাশবাড়ীর মতো ঐতিহ্যবাহী হাটগুলো আস্তে আস্তে হারিয়ে যাবে- সেই আশঙ্কা এখন সংশ্লিষ্ট সবার মনে।

সময়ের আলো/জেডি 



  বিষয়:   চামড়া  হাট  ট্যানারি  মৌসুমি ব্যবসায়ী 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: