মনে করো আমি নেই...

শাহনেওয়াজ

আনন্দ সময়

লেখার শিরোনামটি গানের একটি কলি- যে গানটি গেয়েছিলেন ভারতের কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী সুমন কল্যাণপুর। তিনি আজ পৃথিবীতে নেই। কিন্তু তিনি আছেন

2026-06-04T03:01:26+00:00
2026-06-04T03:01:26+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬,
২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬
আনন্দ সময়
মনে করো আমি নেই...
শাহনেওয়াজ
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬, ৩:০১ এএম   (ভিজিট : ৬)
সুমন কল্যাণপুর। ছবি : সংগৃহীত
লেখার শিরোনামটি গানের একটি কলি- যে গানটি গেয়েছিলেন ভারতের কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী সুমন কল্যাণপুর। তিনি আজ পৃথিবীতে নেই। কিন্তু তিনি আছেন তার সুললিত কণ্ঠের গানে। তাকে দেওয়া হয়েছিল লতাকণ্ঠী উপাধি। অথচ তার কণ্ঠ সে সময়ে খ্যাতনামা শিল্পীদের সিংহাসন বেশ কিছুটা দুলিয়ে দিয়েছিল। যে কারণে চক্রান্তের শিকার হয়ে একসময় ছাড়তে বাধ্য হন গান। কিন্তু তারপরও সুমন কল্যাণপুরের মিষ্টি সুললিত কণ্ঠ আজও শ্রোতাদের মনে দোলা দিয়ে যায়।

১৯৩৭ সালে ২৮ জানুয়ারি অবিভক্ত বাংলার ঢাকায় জন্ম সুমন কল্যাণপুরের। ১৯৪৩ সালে বাবা শঙ্কর রাও হেমাডি পুরো পরিবারকে নিয়ে আসেন মুম্বাই শহরে। সেখানেই বেড়ে ওঠা শুরু শিল্পী সুমন কল্যাণপুরের। গান গেয়ে শিল্পী হবেন এমন ইচ্ছে ছিল না। ছোটবেলা থেকেই তার ভালোলাগার বিষয় হয়ে ওঠে ছবি আঁকা। পাশাপাশি সেলাই করা ও বাগান করা। তবে ছবি আঁকা শিখতে তিনি ভর্তি হন এক আর্ট স্কুলে।

ছোটবেলা থেকেই গানের সুর মনের অলিন্দে বসবাস শুরু করে। যে কারণে মন দিয়ে গান শুনতেন কণ্ঠশিল্পী জোহরা বাই, নূরজাহানের। বাড়ির আশপাশে কোনো অনুষ্ঠান হলে সুমন কল্যাণপুর গান গাইতেন। এ ধরনের এক অনুষ্ঠানে প্রখ্যাত মারাঠি সংগীত পরিচালক কেশবরাও ভোলে আবিষ্কার করেন সুমন কল্যাণপুরকে। তিনি মনে করতেন, সুমন কল্যাণপুরের কণ্ঠ লাইট মিউজিকের জন্য আদর্শ। আর তার পরামর্শে গানে মনোনিবেশ করেন।

১৯৫২ সালে আকাশবাণীতে নিজের গাওয়া প্রথম গানেই সুমন কল্যাণপুর চমকে দেন সবাইকে। তার কণ্ঠের চমক এতটাই ছিল যে কিংবদন্তি শিল্পী লতা মঙ্গেশকর কান পেতে শুনলেন তার গান। সাড়া পড়ে গেল চলচ্চিত্রে। পরের বছর অর্থাৎ ১৯৫৩ সালে মারাঠি ছবিতে গান গাওয়ার প্রস্তাব পেলেন। ছবিটির নাম ‘শুকরচি চাঁদনি’। এরপরই হিন্দি ছবির জন্য প্রস্তাব এলো। পরের বছর অর্থাৎ ১৯৫৪ সালে হিন্দি ছবি ‘মাঙ্গু’ ছবিতে প্রথম প্লেব্যাক যেন আশীর্বাদ হয়ে ধরা দিল তার সংগীত জীবনে। সেই থেকে যাত্রা শুরু। শঙ্কর জয়কিষণ, রোশন, মদনমোহন, শচিন দেব বর্মণ, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, ওপি নায়ার, নওশাদ সুরকার ও সংগীত পরিচালকরা যেন নতুনভাবে আবিষ্কার করলেন সুমন কল্যাণপুরকে।

লতা মঙ্গেশকরের পারিশ্রমিক যখন অনেক সংগীত পরিচালকের হাতের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে, তখনই যেন বিকল্প হিসেবে হাতে এলো সুমন কল্যাণপুর। আবার সে সময় লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে মুহম্মদ রফির রয়্যালটি নিয়ে চলছিল মতবিরোধ। সেই মতবিরোধের জের ধরে বেশ কয়েক বছর লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে মুহম্মদ রফির দ্বৈতকণ্ঠে গান গাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। এই সময়ে সুমন কল্যাণপুরের সঙ্গে মুহম্মদ রফির দ্বৈতকণ্ঠে গানের বহর বাড়তে থাকে। তাদের দুজনের দ্বৈতকণ্ঠের গানের সংখ্যা ১৪০টি। যা কি না সুমনকে জনপ্রিয়তার শিখরে পৌঁছে দেয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় ‘আজকাল তেরে মেরে প্যায়ার কে চার্চে, না না কর কে পেয়ার’।

সুমন কল্যাণপুর মুহম্মদ রফি ছাড়াও মান্না দে, তালাত মাহমুদ, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে দ্বৈতকণ্ঠে গান গেয়েছেন। একের পর এক সুপারহিট গান উপহার দিয়েছেন সুমন কল্যাণপুর। বিখ্যাত ছবির মধ্যে রয়েছে- বাত এক রাত কি, দিল এক মন্দির, নূরজাহান, দিল হি তো হ্যায়, জাহান আরা, পাকিজা।

লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে সুমন কল্যাণপুরের কণ্ঠে এক অদ্ভুত মিল ছিল। অনেকবার লতার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। আবার এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে যে, সুমন কল্যাণপুরের গান লতা মঙ্গেশকরের গান হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। এক সাক্ষাৎকারে এ ধরনের প্রশ্নে সুমন কল্যাণপুর নিজেই বলেছিলেন ‘কিংবদন্তি শিল্পী লতা তার প্রিয় শিল্পী। কিন্তু তিনি কোনো দিনও তাকে ইচ্ছাকৃতভাবে অনুকরণ করেননি।’ 

আরেক সাক্ষাৎকারে একই ধরনের প্রশ্নের উত্তরে সুমন কল্যাণপুর বলেছিলেন, ‘এ ধরনের ভাবনাকে প্রাধান্য দিতে আমি একেবারেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি না। অনেকেই বলেন, আমার কণ্ঠস্বর নাকি লতা মঙ্গেশকরের মতো তবে মন দিয়ে শুনলে একজন প্রকৃত সংগীতবিশেষজ্ঞ সহজেই দুজনের কণ্ঠ আলাদা করতে পারবেন। আমি প্রতিটি গান আমার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা দিয়ে পরিবেশন করার চেষ্টা রাখি। মানুষ যে তুলনাই করুক না কেন, আমি সেগুলো নিয়ে কখনো ভাবি না। আমি কখনো কাউকে অনুকরণ করিনি। কারণ সবসময়ে নিজের গায়কির স্বতন্ত্র ধরন বজায় রাখতে চেষ্টা করি।’

তিনি লতা সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘লতা দিদির সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হয়েছিল মাঙ্গু ছবির একটি গানের রেকর্ডিংয়ের সময়। আমার বিশ্বাস তিনি আগেই আমার গান শুনেছিলেন। রেকর্ডিং রুমের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বলেছিলেন, আমার কণ্ঠস্বর বেশ ভালো।’ প্রসঙ্গত, ২০০৯ সালে মহারাষ্ট্র সরকার সুমন কল্যাণপুরকে সম্মানিত করে লতা মঙ্গেশকর পুরস্কারে। আর ২০২৩ সালে ভারত সরকার পদ্মভূষণ সম্মানে সম্মানিত করে।

বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী সুমন কল্যাণপুরের গান শুনে লতা মঙ্গেশকর কয়েক রাত ঘুমাতে পারেননি। অত্যন্ত ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন। তারপর পরিকল্পনা করেছিলেন, সুমন কল্যাণপুর যেন মুম্বাই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে সহজে প্রবেশ করতে না পারে। এরপর অনেক সংগীত পরিচালক সহজে সুমন কল্যাণপুরকে কাজ দিতে চাইতেন না। এখানে একটা ঘটনা উল্লেখ করা যায়- একবার এক ক্যাসেট কোম্পানি বেশ কয়েকজন বিখ্যাত শিল্পীর গান রেকর্ডিং করে। ক্যাসেটের মোড়কে সবার ছবি থাকলেও তার কোনো ছবি ছিল না বা রাখা হয়নি। কারণ সে ক্যাসেটে লতা মঙ্গেশকরের গান ছিল। সুমন কল্যাণপুর এই ঘটনায় খুবই মর্মাহত হয়েছিলেন। 

যাই হোক এসব বাধা বেশি দিন থাকেনি। তার কণ্ঠের জাদুতে প্লেব্যাক সিঙ্গার হিসেবে এক অনন্য স্থান তৈরি করে নেন। রাগপ্রধান ধ্রুপদী গান থেকে শুরু করে রোমান্টিক বা ভক্তিমূলক গানে যেন ছিল তার অবাধ যাতায়াত। তিনি প্রায় ৯০০ ছবিতে গান গেয়েছেন। তবে তার গানে যে লিপসিং করেছেন তা তিনি কখনো সন্ধান করেননি। এক সাক্ষাৎকারে তিনি অনায়াসে বলেছেন, আমার গানে কে লিপসিং করবেন তা আমার দেখার বিষয় নয়। তবে যিনি লিপসিং করবেন তার যেন কোনো ধরনের আবহ তৈরিতে অসুবিধা না হয় তা সবসময় মনে রাখতাম।

সুমন কল্যাণপুর পেশাদারিত্বের সঙ্গে ওস্তাদ খান আবদুর রহমান খান, পণ্ডিত কেশবরাও ভোলেজিসহ আরও অনেকের কাছে উচ্চাঙ্গসংগীতে তালিম নিয়েছেন। তিনি বিভিন্ন ভাষায় গান গেয়েছেন। তবে বাংলা গান গেয়ে বেশ তৃপ্তিবোধ করতেন বলে এক সাক্ষাৎকারে অকপটে স্বীকার করেছেন। তার বাংলা গানের মধ্যে রয়েছে- ‘মনে করো আমি নেই, শুধু স্বপ্ন নিয়ে খেলা চলেছে, কাঁদে কেন মন আজ কেউ জানে না, দুরাশার বালুচরে একা একা গান গেয়ে যাই, আমার স্বপ্ন দেখার দুটি নয়ন, বাদলে মাদল বাজে গুরু গুরু, আকাশ অজানা তবু খাঁচা ভেঙে উড়ে যায়’।

গত ১ জুন সব অভিমান, অর্জন পেছনে ফেলে এই  কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী পাড়ি জমিয়েছেন অন্যলোকে। তার এই অন্তিম যাত্রায় রইল শ্রদ্ধাঞ্জলি।

সময়ের আলো/আআ


  বিষয়:   গান  শিল্প  সংস্কৃতি  ‍সুমন কল্যাণপুর  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
আনন্দ সময়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: