পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ন্যাশনাল টি কোম্পানি লিমিটেডের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে একাধিক গুরুতর আর্থিক, প্রশাসনিক ও নিয়ন্ত্রক অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে। কোম্পানির নিরীক্ষক প্রতিষ্ঠান আর্টিজান চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস তাদের প্রতিবেদনে কোয়ালিফাইড অপিনিয়ন বা নেতিবাচক করেছে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যতে ব্যবসা অব্যাহত রাখার সক্ষমতা নিয়ে ‘ম্যাটেরিয়াল আনসার্টেইনিটি টু গোয়িং কনসার্ন’ বা গুরুত্বপূর্ণ অনিশ্চয়তার বিষয়টিও উল্লেখ করেছে। নিরীক্ষকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী কোম্পানির আর্থিক অবস্থা, সুশাসনের ঘাটতি, ঋণের চাপ এবং নিয়ন্ত্রক নির্দেশনা পরিপালনে ব্যর্থতা প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় ধরনের উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোম্পানির সম্পদের একটি বড় অংশ চা-বাগানের উৎপাদনশীল গাছ বা ‘বেয়ারার প্লান্টস’-এর মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয়েছে, যার মূল্য ২৩৮ কোটি ৮৪ লাখ টাকার বেশি। কিন্তু আন্তর্জাতিক হিসাবমান আইএএস-১৬ অনুযায়ী এসব সম্পদের যথাযথ মূল্যায়ন ও অবচয় নির্ধারণ করা হয়নি। কোম্পানি অবচয়ের জন্য এককালীন কিছু অর্থ সংরক্ষণ করলেও সম্পদের প্রকৃত আয়ুষ্কাল নির্ধারণ কিংবা পূর্ববর্তী বছরের অবচয় সমন্বয় করা হয়নি। ফলে কোম্পানির সম্পদ, মুনাফা এবং সঞ্চিত আয়ের পরিমাণ প্রকৃত অবস্থার তুলনায় বেশি দেখানো হয়েছে বলে নিরীক্ষকরা মন্তব্য করেছেন। একই সঙ্গে অপরিণত চা-গাছের ব্যয়ও সরাসরি সম্পদ হিসেবে দেখানো হয়েছে, যা হিসাবমানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, কোম্পানির দীর্ঘমেয়াদি ঋণের হিসাব উপস্থাপনে অসংগতি রয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কোম্পানির দীর্ঘমেয়াদি ঋণের পরিমাণ দেখানো হয়েছে ১৭৫ কোটি ১২ লাখ টাকার বেশি। তবে এর বর্তমান অংশ আলাদাভাবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়নি এবং আর্থিক বিবরণীতে ঋণের উপস্থাপনাও পূর্ববর্তী বছরের তথ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এ কারণে ঋণের প্রকৃত অবস্থা এবং প্রয়োজনীয় সমন্বয় নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি বলে নিরীক্ষকরা উল্লেখ করেছেন।
কর্মচারীদের গ্রাচুইটি সুবিধা-সংক্রান্ত হিসাবেও গুরুতর ঘাটতি ধরা পড়েছে। কোম্পানি ৩১ কোটি ২৬ লাখ টাকার বেশি গ্রাচুইটি দায় দেখালেও তা আন্তর্জাতিক হিসাবমান আইএএস-১৯ অনুযায়ী অ্যাকচুয়ারিয়াল মূল্যায়নের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয়নি। পাশাপাশি গ্রাচুইটি তহবিলে কোনো অর্থ জমা না দেওয়ায় পুরো অর্থের সমপরিমাণ ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে।
নিরীক্ষকদের মতে, এটি কোম্পানির ভবিষ্যৎ আর্থিক দায়বদ্ধতা সম্পর্কে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। এছাড়া বিভিন্ন চা-বাগান ও প্রধান কার্যালয়ের মধ্যে লেনদেনের হিসাবেও অসামঞ্জস্য পাওয়া গেছে। নিরীক্ষা চলাকালে প্রায় ৯৫ লাখ টাকার নিট অমিল শনাক্ত হয়েছে, যা যথাযথ সমন্বয় ও সমর্থনকারী নথি ছাড়াই দায় হিসেবে দেখানো হয়েছে। ফলে কোম্পানির দায়ের পরিমাণ প্রকৃত অবস্থার তুলনায় বেশি দেখানো হয়ে থাকতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে কোম্পানির রাইট শেয়ার ইস্যু প্রক্রিয়া। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) অনুমোদন নিয়ে কোম্পানি ২ কোটি ৩৪ লাখ রাইট শেয়ার ইস্যুর উদ্যোগ নেয়। তবে নিরীক্ষায় দেখা যায়, সাবস্ক্রিপশন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই এবং পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন ছাড়াই ৪৪ লাখের বেশি শেয়ার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল।
নিরীক্ষকদের মতে, এটি বিএসইসির অনুমোদনপত্রে উল্লিখিত শর্তের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে প্রতীয়মান হয়। শুধু তাই নয়, রাইট শেয়ারের অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও নিয়ন্ত্রক নির্দেশনা অনুসরণ করা হয়নি। নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণের আগেই কোম্পানি রাইট শেয়ার থেকে প্রাপ্ত অর্থের মধ্যে প্রায় ২৯ কোটি টাকা ব্যাংক ঋণ পরিশোধে ব্যবহার করেছে। পাশাপাশি এ অর্থের ব্যবহার সংক্রান্ত বাধ্যতামূলক ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনও বিএসইসির কাছে জমা দেওয়া হয়নি। বিষয়গুলো নিয়ে বর্তমানে বিএসইসি এবং অন্যান্য সরকারি সংস্থা তদন্ত করছে। তদন্তের ফলাফলের ওপর নির্ভর করে নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা বা আর্থিক জরিমানার মুখে পড়তে পারে কোম্পানি।
করপোরেট সুশাসনের ক্ষেত্রেও কোম্পানির দুর্বলতা স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে। তালিকাভুক্ত কোম্পানি হিসেবে যেসব নিয়মকানুন অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক, তার অনেকই যথাযথভাবে পালন করা হয়নি। বার্ষিক নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন, ত্রৈমাসিক আর্থিক প্রতিবেদন, আয়কর রিটার্ন এবং রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজ অ্যান্ড ফার্মসের কাছে জমা দেওয়ার বাধ্যতামূলক নথিপত্র সময়মতো দাখিল করা হয়নি অথবা জমা দেওয়ার প্রমাণ নিরীক্ষকদের কাছে উপস্থাপন করা যায়নি। এ ছাড়া নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) আয়োজন করা হয়নি।
নিরীক্ষকরা আরও উল্লেখ করেছেন, কোম্পানির কোনো কার্যকর অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা বিভাগ নেই। আর্থিক ব্যবস্থাপনায় পর্যাপ্ত দক্ষ জনবলের অভাব, ব্যবস্থাপনায় ঘনঘন পরিবর্তন, দুর্বল অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং পর্যাপ্ত অনুমোদন ছাড়া বিভিন্ন অর্থ পরিশোধের ঘটনাও শনাক্ত হয়েছে। একই সঙ্গে কোম্পানির কার্যকর বাজেটিং ব্যবস্থা, কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং ব্যবসায়িক লক্ষ্য নির্ধারণের সুস্পষ্ট কাঠামোরও অভাব রয়েছে।
কোম্পানির আর্থিক অবস্থাও উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। ৩০ জুন ২০২৫ পর্যন্ত কোম্পানির মোট লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৩৯ কোটি টাকার বেশি। ২০১৯-২০ অর্থবছর থেকে ধারাবাহিকভাবে লোকসান বেড়েছে এবং পরিচালন কার্যক্রম থেকে ইতিবাচক নগদ প্রবাহ সৃষ্টি করা সম্ভব হয়নি। একই সময়ে দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি ঋণের মোট পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৪৩ কোটি টাকারও বেশি।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, কোম্পানির ইকুইটি ঋণাত্মক ৯৫ কোটি ৬৮ লাখ টাকায় নেমে এসেছে এবং প্রতি শেয়ারে নেট সম্পদ মূল্য (এনএভি) দাঁড়িয়েছে ঋণাত্মক ১৪৪ দশমিক ৯৭ টাকা। অর্থাৎ কোম্পানির মোট দায় তার মোট সম্পদের চেয়ে বেশি। নিরীক্ষকদের মতে, এসব পরিস্থিতি কোম্পানির ভবিষ্যতে কার্যক্রম অব্যাহত রাখার সক্ষমতা নিয়ে গুরুতর অনিশ্চয়তার ইঙ্গিত দেয়।
এ ছাড়া কোম্পানির তিনটি চা-বাগানের জমি নিয়ে বিভিন্ন আদালতে মামলা চলমান রয়েছে। নিরীক্ষকরা এসব মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। পাশাপাশি কোম্পানির প্রধান কার্যালয় ও চা-বাগানগুলোতে আধুনিক ও সমন্বিত হিসাব সফটওয়্যার না থাকায় আর্থিক প্রতিবেদনে ভুল বা অসঙ্গতির ঝুঁকিও বাড়ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সামগ্রিকভাবে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে ন্যাশনাল টি কোম্পানির আর্থিক ব্যবস্থাপনা, করপোরেট সুশাসন, নিয়ন্ত্রক পরিপালন এবং ভবিষ্যৎ আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে, যা কোম্পানির বিনিয়োগকারী ও অংশীজনদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে।
আর্থিক প্রতিবেদনের এসব অসঙ্গতি বিষয়ে জানতে চাইলে কোম্পানি সচিব আবুল কালাম আজাদ সময়ের আলোকে বলেন, আমি এই মূহূর্তে অফিসের বাইরে। যথাযথ তথ্য দিতে পারব না, তবে কোম্পানির অনেক সমস্যা নিয়ে কোয়ালিফাইড অপিনিয়ন আছে এটা সত্য।
সময়ের আলো/আআ