ধ্বংসের দ্বারপ্রান্ত থেকে বিশ্বজুড়ে বাড়ছে ম্যানগ্রোভ বনের পরিধি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

উপকূলীয় অঞ্চলের লাখ লাখ মানুষকে সামুদ্রিক ঝড়-ঝঞ্ঝা থেকে রক্ষা করা এবং বায়ুমণ্ডল থেকে বিপুল পরিমাণ ক্ষতিকারক গ্যাস শুষে নেওয়া ম্যানগ্রোভ

2026-06-05T11:57:09+00:00
2026-06-05T11:57:45+00:00
 
  শুক্রবার, ৫ জুন ২০২৬,
২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
শুক্রবার, ৫ জুন ২০২৬
আন্তর্জাতিক
ধ্বংসের দ্বারপ্রান্ত থেকে বিশ্বজুড়ে বাড়ছে ম্যানগ্রোভ বনের পরিধি
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ৫ জুন, ২০২৬, ১১:৫৭ এএম  আপডেট: ০৫.০৬.২০২৬ ১১:৫৭ এএম  (ভিজিট : ১৪)
ছবি : সংগৃহীত
উপকূলীয় অঞ্চলের লাখ লাখ মানুষকে সামুদ্রিক ঝড়-ঝঞ্ঝা থেকে রক্ষা করা এবং বায়ুমণ্ডল থেকে বিপুল পরিমাণ ক্ষতিকারক গ্যাস শুষে নেওয়া ম্যানগ্রোভ বা লোনাপানির বন বিশ্বজুড়ে এক অভূতপূর্ব প্রত্যাবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন, ধ্বংসের দ্বারপ্রান্ত থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে বিশ্বজুড়ে এখন ম্যানগ্রোভ বনের পরিধি ক্রমশ বাড়ছে।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, কয়েক দশক ধরে চিংড়ি চাষ, মাছের ঘের তৈরি এবং আবাসন প্রকল্পের জন্য এই কর্দমাক্ত অঞ্চলের গাছপালা নির্বিচারে উজাড় করা হচ্ছিল। কিন্তু নতুন এই গবেষণা বলছে, ২০১০ সালের পর থেকে বিশ্বে ম্যানগ্রোভ বনের হারানোর চেয়ে তা নতুন করে গড়ে ওঠার হার অনেক বেশি। মূলত আইনি সুরক্ষা জোরদার করা এবং ২০০৪ সালের প্রলয়ঙ্কারী সুনামি ও ২০০৮ সালের সাইক্লোন নার্গিসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর এই বনের গুরুত্ব সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি পাওয়ায় এই ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। গবেষকদের মতে, সবচেয়ে বড় কারণ হলো— মানুষ যখনই এই বন কাটা বন্ধ করেছে, তখনই প্রকৃতির এক অলৌকিক ক্ষমতায় এই বন নিজে নিজেই আবার পুনরুত্থিত হয়েছে।

পরিবেশ রক্ষায় ম্যানগ্রোভ বনকে অন্যতম নেপথ্য নায়ক বলা চলে। এরা স্থলভাগের সাধারণ বনের তুলনায় প্রায় পাঁচ গুণ বেশি কার্বন ডাই অক্সাইড ধরে রাখতে পারে। এছাড়া এদের জটলা পাকানো শিকড় সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ের গতি কমিয়ে দেয়, যা উপকূলের বাসিন্দাদের জলোচ্ছ্বাস ও সুনামি থেকে ঢাল হয়ে রক্ষা করে। একই সাথে এই শিকড়গুলো অসংখ্য প্রজাতির মাছ ও সামুদ্রিক প্রাণীর জন্য একটি নিরাপদ প্রজনন কেন্দ্র এবং অভয়াশ্রম হিসেবে কাজ করে।

গত শতাব্দীতে কৃষিকাজ এবং উপকূলীয় শহরগুলোর লাগামহীন সম্প্রসারণের কারণে এই অনন্য পরিবেশগত ঢালটি চরম হুমকির মুখে পড়েছিল। ১৯৮০ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত এশিয়া, আফ্রিকা ও আমেরিকা জুড়ে প্রায় ১২ হাজার বর্গকিলোমিটার ম্যানগ্রোভ বন সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়, যা আয়তনে একটি মাঝারি দেশের সমান। তবে নতুন গবেষণা বলছে, গত এক দশকে সেই ধ্বংসাত্মক প্রবণতা পুরোপুরি উল্টে গেছে। আশির দশক থেকে শুরু হওয়া বনের মোট প্রকৃত ক্ষতি এখন কমে মাত্র ৮৪৯ বর্গকিলোমিটার এলাকায় এসে ঠেকেছে।

দীর্ঘদিনের কৃত্রিম বনায়ন কর্মসূচি এই পুনরুদ্ধারে কিছুটা সাহায্য করলেও, মূল পরিবর্তনটি এসেছে বন উজাড়ের হার কমে যাওয়ার পর প্রকৃতির নিজস্ব বিস্তারের মাধ্যমে। এর ফলে ইন্দোনেশিয়ার মতো সর্বাধিক ম্যানগ্রোভ সমৃদ্ধ দেশে বনের পরিমাণ স্থিতিশীল হয়েছে এবং মিয়ানমারে এর পরিধি আগের চেয়ে অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টিউল্যান ইউনিভার্সিটির প্রধান গবেষক ড. ঝেন ঝাং জানান, ইন্দোনেশিয়ায় ২০০৪ সালের সুনামির পর মানুষ বুঝতে পেরেছিল যে ম্যানগ্রোভ বেষ্টিত দ্বীপগুলো জলোচ্ছ্বাস থেকে অনেকটাই সুরক্ষিত ছিল। এই উপলব্ধিই তাদের মাছের ঘের তৈরির জন্য গাছ কাটা থেকে বিরত করেছে। ২০১৬ সালে মিয়ানমারে জাতীয়ভাবে গাছ কাটার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারির পর সেখানেও একই সুফল পাওয়া গেছে।

স্যাটেলাইট প্রযুক্তির আধুনিকায়নের কারণেও এই বনের সঠিক হিসাব এখন সামনে আসছে। ল্যান্ডস্যাট স্যাটেলাইটের সূক্ষ্ম ইমেজিং ব্যবস্থার মাধ্যমে দেখা গেছে, পূর্বের গবেষণার তুলনায় বর্তমানে নতুন গাছের সংখ্যা অনেক বেশি। তবে এই আশাব্যাঞ্জক খবরের একটি ভিন্ন দিকও রয়েছে। ব্রাজিলসহ বেশ কিছু দেশে নদীর অববাহিকায় ম্যানগ্রোভের বিস্তার ঘটছে মূলত উজান থেকে ধুয়ে আসা পলি ও পুষ্টি উপাদানের (যেমন নাইট্রোজেন) কারণে। আর উজানের এই পলি আসার কারণ হলো ওপরের দিকের বনাঞ্চল ধ্বংস ও খনি খনন। ফলে নদীর মোহনায় ম্যানগ্রোভের এই বাড়বাড়ন্ত নদীমাতৃক ব্যবস্থার ওপরের অংশের পরিবেশগত বিপর্যয়ের ফসল কি না, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মনে সংশয় রয়েছে।

তাছাড়া বিশ্বজুড়ে এই সাফল্যের চিত্র সব জায়গায় সমান নয়। পশ্চিম ও মধ্য আফ্রিকা বর্তমানে ম্যানগ্রোভ ধ্বংসের প্রধান হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। বিশেষ করে নাইজেরিয়ার নাইজার ডেল্টা অঞ্চলে খনিজ তেলের দূষণ এবং পাইপলাইন স্থাপনের কারণে এই বন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এছাড়া ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড়গুলোও ম্যানগ্রোভের জন্য বড় হুমকি, যার কারণে অস্ট্রেলিয়া থেকে ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে এক বছরেই বিশাল পরিমাণের বন উজাড় হতে দেখা গেছে।

এই সমস্ত চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও বিজ্ঞানীরা একে পরিবেশের জন্য একটি বিরাট সুসংবাদ হিসেবেই দেখছেন। গবেষণায় দেখা গেছে, আশির দশকের তুলনায় বর্তমানে ঘন পাতার বা ‘ক্লোজড ক্যানোপি’ সমৃদ্ধ ম্যানগ্রোভ বনের পরিমাণ প্রায় ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সবচেয়ে বেশি কার্বন শোষণ করতে সক্ষম। 


/কহু


  বিষয়:   ম্যানগ্রোভ  বন 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: