চলতি বছরের মার্চ মাসে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে অংশ নেওয়ার সময় বিশ্বের বৃহত্তম বিমানবাহী রণতরী ‘ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড’-এ সংঘটিত অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাটি মার্কিন নৌবাহিনী যতটা সাধারণ হিসেবে প্রচার করেছিল, বাস্তবে তা ছিল অনেক বেশি ভয়াবহ ও বিধ্বংসী। মার্কিন টেলিভিশন নেটওয়ার্ক সিএনএন-এর হাতে আসা রণতরীর ভেতরের নতুন কিছু ভিডিও ফুটেজে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
ওই সময় মার্কিন নৌবাহিনীর সংক্ষিপ্ত বিবৃতিতে বলা হয়েছিল— আগুন দ্রুত ‘নিয়ন্ত্রণে’ আনা হয়েছে, দুই জন নাবিক ‘সামান্য’ আহত হয়েছেন এবং রণতরীটি ‘পুরোপুরি সচল’ রয়েছে। তবে সিএনএনের ভিডিওতে দেখা গেছে, রণতরীর ভেতরে নাবিকদের ঘুমানোর বাঙ্ক বা বিছানাগুলো আগুনে পুড়ে সম্পূর্ণ কয়লা ও দুমড়েমুচড়ে যাওয়া ধাতব স্তূপে পরিণত হয়েছে। ছাদের সিলিং ধসে পড়েছে, চারদিকে ঝুলছে পোড়া তার এবং মেঝেতে জমে আছে পুরু ছাইয়ের স্তূপ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রণতরীর এক নাবিক সিএনএনকে সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, আমি সত্যি ভেবেছিলাম আমরা হয়তো পুরো জাহাজটিকেই হারাতে বসেছি। তখন আমাদের সামনে কেবল দুটি পথ খোলা ছিল— হয় আগুনের বিরুদ্ধে লড়াই করো, না হয় মরো। পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল রণতরীর স্বয়ংক্রিয় ‘ফায়ার-সাপ্রেসোন সিস্টেম’ বা আগুন নেভানোর আধুনিক ব্যবস্থার সম্পূর্ণ ব্যর্থতা। সিস্টেমটি কাজ না করায় নাবিকদের ম্যানুয়ালি বালতি ও পাইপ দিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আগুন নেভাতে হয়েছিল। আগুন সম্পূর্ণ নেভাতে, চারপাশ পরিষ্কার করতে এবং পুনরায় আগুন জ্বলা প্রতিরোধ করতে ক্রুদের টানা ৩০ ঘণ্টা লড়াই করতে হয়েছিল এবং প্রায় ৬০০ নাবিক তাঁদের থাকার জায়গা হারিয়েছিলেন।
নৌবাহিনীর এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সিএনএনকে নিশ্চিত করেছেন, লোহিত সাগরে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে রণতরীটির প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি ও সক্ষমতার ঘাটতি আড়াল করতেই নৌবাহিনী বিষয়টিকে হালকা করে প্রচার করেছিল। মার্কিন নৌবাহিনীর চিফ অব নেভাল অপারেশনস অ্যাডমিরাল ড্যারিল কডল এপ্রিলে স্বীকার করেন, অগ্নিকাণ্ডের পর ফোর্ড টানা দুই দিন কোনো যুদ্ধবিমান উড্ডয়ন (সর্টি) করতে পারেনি এবং অস্থায়ী মেরামতের জন্য গ্রিসের একটি বন্দরে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিল।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৩ বিলিয়ন (১৩০০ কোটি) ডলার মূল্যের এই পারমাণবিক চালিত অত্যাধুনিক রণতরীটি ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন বিমান হামলার মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল। তবে ফোর্ড শুধু আক্রমণই করেনি, লোহিত সাগরে অবস্থানকালে এটি ক্রমাগত ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র এবং কামিকাজে ড্রোন হামলার তীব্র ঝুঁকির মধ্যে ছিল। নাবিকদের তথ্যমতে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে চলে এলেই জাহাজে অনবরত সাইরেন বাজিয়ে সবাইকে সম্ভাব্য আঘাতের জন্য প্রস্তুত থাকার ও ড্যামেজ কন্ট্রোল পজিশন নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হতো।
অগ্নিকাণ্ড ছাড়াও দীর্ঘ ১১ মাসের এই রেকর্ড সৃষ্টিকারী মোতায়েনকালীন সময়ে রণতরীটিতে স্যানিটেশন ব্যবস্থার চরম বিপর্যয় ঘটেছিল। সিএনএন-এর প্রাপ্ত আরেকটি ভিডিওতে দেখা গেছে, জাহাজের টয়লেটগুলো উপর্যুপরি বন্ধ হয়ে মলমূত্রে ভেসে যাচ্ছিল, যার ফলে নাবিকদের জাহাজের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে হেঁটে যেতে হতো একটি সচল টয়লেটের খোঁজে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২০১৭ সালে কমিশন হওয়া ‘জেরাল্ড আর ফোর্ড’ হলো মার্কিন নৌবাহিনীর ১১টি পারমাণবিক রণতরীর মধ্যে সবচেয়ে নতুন এবং প্রযুক্তির দিক থেকে সবচেয়ে উন্নত, যা মার্কিন নৌ-শক্তির প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর দীর্ঘতম এই ঐতিহাসিক মোতায়েন শেষে গত মে মাসে রণতরীটি যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ার নরফোক হোম-পোর্টে ফিরে এসেছে। দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রা এবং অগ্নিকাণ্ডের ধকল কাটিয়ে উঠতে ফোর্ডকে এখন দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, রণতরীটি পুনরায় সাগরে ভাসার উপযোগী হতে অন্তত আরও এক বছর সময় লাগতে পারে, যা মার্কিন নৌবাহিনীর বৈশ্বিক কার্যক্রমে একটি বড় শূন্যতা তৈরি করবে।
/কহু