এই আধুনিক যুগে দ্রুততম সময়ের ভেতর কোনোকিছু জানার জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের বিকল্প নেই। এআই এখন বেশিরভাগ মানুষের জীবনে নিত্যদিনের অনুসঙ্গ হয়ে গেছে। কিন্তু, এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পরিবেশের জন্য চ্যালেঞ্জ, নাকি এটি প্রযুক্তির অনিবার্য বিপ্লব?
চিকিৎসা, শিক্ষা, গবেষণা- সব ক্ষেত্রেই এআই এখন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তবে, আমরা অনেকেই জানি না, এই প্রযুক্তির পেছনে বিশাল পরিবেশগত খরচ রয়েছে। এআই কি সত্যিই পরিবেশবান্ধব ভবিষ্যৎ গড়তে সাহায্য করছে, নাকি এটি নিজেই পরিবেশের জন্য নতুন চাপ তৈরি করছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই আমাদের আজকের আলোচনা।
এআইকে আমরা দেখি একটি সফটওয়্যার হিসেবে। কিন্তু বাস্তবে এর পেছনে কাজ করে হাজার হাজার শক্তিশালী কম্পিউটার, যেগুলো বিশাল ডেটা সেন্টারে দিনরাত চালু থাকে। এসব ডেটা সেন্টার পরিচালনার জন্য প্রয়োজন হয় বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ। একটি বড় এআই মডেলকে প্রশিক্ষণ দিতে যে পরিমাণ কম্পিউটিং শক্তি লাগে, তা অনেক সময় কয়েকশ থেকে কয়েক হাজার পরিবারের মাসিক বিদ্যুৎ ব্যবহারের সমান হতে পারে। শুধু প্রশিক্ষণই নয়, প্রতিদিন কোটি কোটি মানুষের প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়েও এই সিস্টেমগুলো ক্রমাগত বিদ্যুৎ ব্যবহার করে। ফলে এআই যত জনপ্রিয় হচ্ছে, ততই বাড়ছে বিদ্যুতের চাহিদা। সেই বিদ্যুৎ যদি জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে আসে, তাহলে কার্বন নিঃসরণও বাড়বে, যা পরিবেশের জন্য হুমকি!
অনেকেই জানেন না, এআই পরিচালনার জন্য শুধু বিদ্যুৎ নয়, প্রয়োজন হয় বিপুল পরিমাণ পানিরও। ডেটা সেন্টারের কম্পিউটারগুলো প্রচণ্ড তাপ উৎপন্ন করে। সেই তাপ নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যবহৃত হয় উন্নত কুলিং ব্যবস্থা, যার জন্য দরকার হয় প্রচুর পানি। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ডেটা সেন্টারের পানির ব্যবহার নিয়ে ইতোমধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, বিশেষ করে যেখানে পানির সংকট বিদ্যমান।
অর্থাৎ, আমরা যখন একটি প্রশ্নের উত্তর পেতে এআই ব্যবহার করছি, তখন অদৃশ্যভাবে বিদ্যুৎ ও পানিরও ব্যবহার হচ্ছে!
তবে, পরিবেশ ওপর এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ইতিবাচক প্রভাবও রয়েছে। পরিবেশ সুরক্ষায় এআই ইতোমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে বন উজাড় শনাক্ত করা, বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস দেওয়া, কৃষিতে পানির অপচয় কমানো, ফসলের রোগ শনাক্তকরণ, স্মার্ট গ্রিড ব্যবস্থাপনা, নবায়নযোগ্য শক্তির দক্ষ ব্যবহার, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি সাশ্রয়ী রুট পরিকল্পনা, বায়ুদূষণের মাত্রা পর্যবেক্ষণ- এমন অনেক ক্ষেত্রে এআই নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে। অনেক দেশে এআই ব্যবহার করে অবৈধ বন নিধন ও বন্যপ্রাণী শিকার শনাক্ত করা হচ্ছে। আবার কৃষকেরা এআইভিত্তিক তথ্য ব্যবহার করে কখন সেচ দিতে হবে বা কী পরিমাণ সার ব্যবহার করতে হবে, সেই সিদ্ধান্তও নিচ্ছেন। এতে উৎপাদন বাড়ার পাশাপাশি পরিবেশের ক্ষতিও কমছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এআই ব্যবহার করে আবহাওয়ার পূর্বাভাস আরও নির্ভুল করা, কৃষকদের সময়োপযোগী তথ্য দেওয়া কিংবা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা সম্ভব। তবে, একই সঙ্গে প্রযুক্তির অবকাঠামো গড়ে তোলার সময় পরিবেশগত প্রভাবের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা এখন 'গ্রিন এআই' বা 'পরিবেশবান্ধব এআইয়ের' ধারণা নিয়ে কাজ করছেন। নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার, শক্তি-সাশ্রয়ী ডেটা সেন্টার নির্মাণ এবং কম কম্পিউটিং শক্তিতে কাজ করতে সক্ষম অ্যালগরিদম তৈরির মাধ্যমে এআইকে আরও টেকসই করা সম্ভব।
২০১৯ সালে গবেষকরা এই ধারণাটি জনপ্রিয় করেন। এর মূল উদ্দেশ্য হলো, কম শক্তি ব্যবহার করে এআই মডেল তৈরি করা, কম্পিউটেশনাল খরচ হ্রাস করা, কার্বন ফুটপ্রিন্ট কমানো, পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো ব্যবহার করা, এআইয়ের দক্ষতা ও স্থায়িত্ব বৃদ্ধি করা। অর্থাৎ, শুধু এআই কতটা নির্ভুল সেটি নয়, বরং কত কম শক্তি ও সম্পদ ব্যবহার করে সেই ফলাফল পাওয়া যায়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
তবে, গ্রিন এআই বাস্তবায়নে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ছোট ও শক্তি-সাশ্রয়ী মডেলের কর্মক্ষমতা বড় মডেলের তুলনায় কম হতে পারে। একটি এআই মডেল কত শক্তি ব্যবহার করেছে বা কত কার্বন নিঃসরণ ঘটিয়েছে, তা সঠিকভাবে নির্ণয় করা কঠিন। এ ছাড়া নতুন এআই প্রযুক্তির সঙ্গে পরিবেশগত মানদণ্ড বজায় রাখা চ্যালেঞ্জিং।
এআই নিঃসন্দেহে মানবসভ্যতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত অগ্রগতি। তবে, একদিকে এআই জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় শক্তিশালী হাতিয়ার হতে পারে, অন্যদিকে অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার পরিবেশের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এআইয়ের ব্যবহার বাদ দেওয়া হয়ত সম্ভব নয়। তাই এমন এআই তৈরি করা অতি জরুরি, যা প্রযুক্তিগত উন্নয়নের পাশাপাশি পরিবেশকেও সুরক্ষিত রাখবে। গ্রিন এআই বাস্তবায়ন সম্ভব হলে, তা প্রযুক্তিকে আরও দায়িত্বশীল ও মানবকল্যাণমুখী করে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
সময়ের আলো/টিএইচ